কুরবানীর তাৎপর্য : ফাযায়েল ও মাসায়েল

দারুত তাসনীফ, মা’হাদুল বুহুসিল ইসলামিয়া


কুরবানীর অর্থ

‘কুরবান’ এটি আরবী ভাষার মূলক্রিয়া। অর্থ সান্নিধ্য হওয়া, ঘনিষ্ট হওয়া। শব্দটি আরবী ভাষায় বিশেষ্য হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। তখন এর অর্থ হয়, এমন বিষয় যার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জিত হয়, রাষ্ট্রপ্রধানের সহচর, বিশেষ লোক। আরবী ‘কুরবান’ শব্দের অন্তে ‘ইয়া’ বর্ণ যুক্ত হয়ে সম্বন্ধ বিশেষণ হয়ে ‘কুরবানী’ হয়েছে। অর্থ জবাই, ঈদুল আযহার পশু, আল্লাহর রাস্তায় জবাইকৃত হালাল পশু। হযরত আদম আ. এর দু’পুত্রের ঘটনা বর্ণনার ক্ষেত্রে আল্লাহ তা‘আলা ‘কুরবান’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। ইরশাদ হচ্ছে,

إِذْ قَرَّبَا قُرْبَانًا فَتُقُبِّلَ

অর্থ : তাদেরকে আদমের দুই পুত্রের বাস্তব অবস্থা পাঠ করে শোনান। যখন তারা উভয়েই কিছু উৎসর্গ নিবেদন করেছিল, তখন তাদের একজনের উৎসর্গ গৃহীত হয়েছিল এবং অপরজনের গৃহীত হয়নি। সে বলল, আমি অবশ্যই তোমাকে হত্যা করব। সে বলল, আল্লাহ্ ধর্মভীরুদের পক্ষ থেকেই তো গ্রহণ করেন।(সূরা মাইদা- ২৭)

তবে কুরআন-হাদীসে কুরবানী বুঝানোর জন্য اضحية (উযহিয়্যাহ) এবং ‘নুসুক’ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। ‘নুসুক’ শব্দটির অর্থ হল, ইবাদত করা, আনুগত্য করা, প্রত্যেক ঐ বস্তু যার মাধ্যমে আল্লাহর সান্নিধ্য অর্জিত হয়। (লিসানুল আরব ১০/৪৯৮, আততাহবীর ওয়াততানবীর; পৃষ্ঠা ৩৫২)

সূরা আন‘আমের ১৬২ নং আয়াতে কুরবানী অর্থে নুসুক শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। কুরবানীর যে দু‘আটি আমরা পাঠ করে থাকি তাতেও ‘নুসুক’ শব্দটি রয়েছে।

শরিয়তের পরিভাষায় কুরবানী বলা হয় ঈদুল আজহার দিনগুলোতে নির্দিষ্ট প্রকারের গৃহপালিত পশু আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের জন্য জবাই করা।

কুরবানীর তাৎপর্য

কুরবানী একটি মহান ইবাদত। বিসর্জনের মহিমাস্নাত শর্তহীন আনুগত্য। আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টি হাসিলের সর্বকালীন আয়োজন। হযরত আদম আ. এর যুগ থেকেই কুরবানী বিদ্যমান। তবে সকল নবী আ. এর শরীয়তে কুরবানী পদ্ধতি অভিন্ন ছিল না। ইসলামী শরীয়তে হযরত ইবরাহীম আ. এর কুরবানীপদ্ধতি অনুসৃত। পিতা পুত্রের অকুণ্ঠ সমর্পণের দীপ্ত স্মারক আমাদের এই কুরবানী। হযরত ইবরাহীম আ. যেমন আল্লাহ তা‘আলার আদেশ পেয়ে তাঁর সন্তুষ্টির আশায় আপন কলিজার টুকরো সন্তানের গলায় ছুরি চালিয়েছিলেন। কি অন্যায় করেছি আমি? কি অপরাধ করেছে আমার নিষ্পাপ শিশুটি? এ জাতীয় কোন প্রশ্ন খলীলুল্লাহর হৃদয়ে ঠাঁই পায়নি। শিশু ইসমাঈল আ. যেভাবে আল্লাহ তা‘আলার নির্দেশে শাণিত ছুরির নিচে শির সঁপে দিতে কোন দ্বিধা করেননি। নিঃশঙ্ক চিত্তে ঘোষণা করেছেন, হে প্রিয় পিতা! আপনি যা আদিষ্ট হয়েছেন তা পালন করুন, ইনশাআল্লাহ আমাকে সবরকারীদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন। (সূরা সাফ্ফাত- ১০২)

ঠিক তেমনিভাবে আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টি লাভের আশায় কুরবানী করার মাধ্যমে শর্তহীন আনুগত্য পেশ করাই কুরবানীর মূল উদ্দেশ্য। নির্দিষ্ট দিনগুলোতে নির্দিষ্ট পশু জবাই করার মাধ্যমে আল্লাহর নির্দেশ পালন করে তাঁর মহব্বতের নজরানা পেশ করাই কুরবানীর তাৎপর্য। তিনি আদেশ করেছেন তাঁর নামে কুরবানী করতে, ব্যস্ আমরা তাঁকে খুশি করার জন্য কুরবানী করবো। নিরাপরাধ পশুগুলোকে হত্যা করে কি লাভ? কোটি কোটি টাকার পশু হত্যা না করে এ টাকাগুলো জনকল্যাণে ব্যয় করলেই ভালো হত ইত্যাদী ঈমান বিরোধী ভাবনা যেন আমাদেরকে স্পর্শ না করে। কুরবানী করলে গোশতের প্রয়োজন পূরণ হবে, আমার পরিবার গোশত খেতে পারবে ইত্যাদি স্বার্থচিন্তা যেন আমাদের মাথায় না আসে। সৃষ্টির বাহবা কুড়ানো বা প্রতিবেশীর ঈর্ষাকাতর দৃষ্টির সুখটুকু লাভ করা কিংবা পত্রিকার শিরোনাম হওয়ার লক্ষ্যে দামি পশু ক্রয় করার মানসিকতা যেন আমাদের হৃদয়ে ঠাঁই না পায়। ‘পশু নয় পশুত্বের কুরবানী চাই’, ‘অবোধ পশুকে নয় মনের পশুকে করো জবাই’ ইত্যকার শব্দচাতুর্যে কুরআন বিরোধী শ্লোগান যেন আমাদের অন্তরে এই ‘ইবাদাতে মাকসূদা’ (কুরবানী) সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণা সৃষ্টি করতে না পারে।

মহান রব্বুল আলামীন আমাদেরকে পশু কুরবানী করতে আদেশ করেছেন, আবার সেই পশুর গোশত কুরবানী দাতার জন্য হালাল করেছেন, এমনকি যিলহজ্জ মাসের দশ তারিখ থেকে মোট চার দিন রোজা রাখা নিষিদ্ধ করে আল্লাহ তা‘আলার মেহমানদারী কবুল করার নির্দেশ দিয়েছেন, এটা আমাদের উপর আল্লাহ তা‘আলার অপার মেহেরবানী। পশুত্বের কুরবানী কিংবা মনের পশুকে জবাই করার মাধ্যমে কি এতগুলো নির্দেশ পালন হয়ে যাবে?। এর বিপরীতে সকল স্বার্থচিন্তা ও বস্তুবাদী ভাবনা ঝেড়ে ফেলে ইখলাসের সাথে কুরবানী করলে পশুর সাথে সাথে ইনশা-আল্লাহ পশুত্বের কুরবানীও হয়ে যাবে।

কুরআনের আলোকে কুরবানী

ইসলামি শরীয়তে এটি ইবাদত হিসেবে সিদ্ধ, যা কুরআন, হাদিস ও মুসলিম উম্মাহর ঐকমত্য দ্বারা প্রমাণিত। কুরআন মজীদে যেমন এসেছে,

فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ

তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশে নামায আদায় কর ও পশু কুরবানী কর। (সূরা কাউসার- ২)

قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ . لَا شَرِيكَ لَهُ وَبِذَلِكَ أُمِرْتُ وَأَنَا أَوَّلُ الْمُسْلِمِينَ

অর্থ : বল, আমার নামায, আমার কুরবানী, আমার জীবন ও আমার মরণ জগৎসমূহের প্রতিপালক আল্লাহরই উদ্দেশ্যে। তাঁর কোনো শরিক নেই এবং আমি এর জন্য আদিষ্ট হয়েছি এবং আমিই প্রথম মুসলিম। (সূরা আনআম- ১৬২, ১৬৩)

এছাড়াও মৌলিকভাবে কুরবানীর বিধান সূরা ২৭, ৩৭ নং আয়াত, সূরা বাকারা ১৯৬ নং আয়াত এবং সূরা সফসহ বিভিন্ন সূরায় রয়েছে।

কুরবানীর ফযীলত

ক. কুরবানী দাতা সাইয়িদুনা হযরত ইবরাহিম আ. ও মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আদর্শ বাস্তবায়ন করে থাকেন।

খ. পশুর রক্ত প্রবাহিত করার মাধ্যমে কুরবানী দাতা আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের নৈকট্য অর্জন করেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

لَنْ يَنَالَ اللَّهَ لُحُومُهَا وَلَا دِمَاؤُهَا وَلَكِنْ يَنَالُهُ التَّقْوَى مِنْكُمْ كَذَلِكَ سَخَّرَهَا لَكُمْ لِتُكَبِّرُوا اللَّهَ عَلَى مَا هَدَاكُمْ وَبَشِّرِ الْمُحْسِنِينَ

অর্থ : আল্লাহর নিকট পৌঁছায় না তাদের গোশত এবং রক্ত, বরং পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া। এভাবে তিনি এগুলোকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন যাতে তোমরা আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা কর এজন্য যে, তিনি তোমাদের পথ-প্রদর্শন করেছেন; সুতরাং আপনি সুসংবাদ দিন সৎকর্মপরায়ণ-দেরকে। (সূরা হজ্জ- ৩৭)

হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত ফাতেমা রাযি. কে তার কুরবানীর নিকট উপস্থিত থাকতে বলেন এবং ইরশাদ করেন, এই কুরবানীর প্রথম রক্তবিন্দু প্রবাহিত হওয়ার সাথে সাথে আল্লাহ তা‘আলা তোমার গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দিবেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এটা কি শুধু আহলে বাইতের জন্য, না কি সকল মুসলিমের জন্য? তিনি উত্তরে বললেন, এই ফযীলত সকল মুসলিমের জন্য। (মুসতাদরাকে হাকেম; হা.নং ৭৫২৫, আততারগীব ওয়াততারহীব ২/১৬৪)

অন্যত্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, কুরবানীর দিন আদম সন্তান যত কর্ম করে তন্মধ্যে আল্লাহর নিকট প্রিয়তম কর্ম হল, রক্ত প্রবাহিত করা। কুরবানীর পশু কিয়ামতের দিনে তার শিং, খুর ও পশমসহ উপস্থিত হবে। আর কুরবানীর রক্ত মাটিতে পড়ার আগেই আল্লাহর নিকট মর্যাদার স্থানে স্থিত হয়। সুতরাং তোমরা আনন্দ চিত্তে কুরবানী প্রদান কর। (সুনানে তিরমিযী; হা.নং ১৪৯৩)

কুরবানীর বিধান

কুরবানী করা ওয়াজিব। ইমাম আওযায়ী, ইমাম লাইস, ইমাম আবু হানীফা ইমাম মালেক ইমাম আহমদ ও ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহ. প্রমুখের মত এটাই। (কিতাবুল আসার ২/৭৫৯, মুহাম্মদ বিন উসাইমিন কৃত আহকামুল উযহিয়্যা; পৃষ্ঠা ২৬)

আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন,

فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ

অর্থ : তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে নামায আদায় কর ও পশু কুরবানী কর। (সূরা কাউসার- ২)

হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. হতে বর্ণিত, রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

من وجد سعة ولم يضح، فلا يقربن مصلانا

অর্থ : যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কুরবানী করে না সে যেন আমাদের ঈদগাহের ধারে না আসে। (মুসনাদে আহমদ; হা.নং ৮২৫৬)

রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

يا أيها الناس: إن على كل أهل بيت في كل عام أضحية

অর্থ : হে মানব সকল! প্রত্যেক পরিবারের দায়িত্ব হলো প্রতিবছর কুরবানী দেয়া। (সুনানে ইবনে মাজাহ; হা.নং ৩১২৫)

এই আয়াত ও হাদীস দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, কুরবানী করা ওয়াজিব।

কুরবানী যাদের উপর ওয়াজিব

যার উপর সদকা ফিতর (ফিতরা) আদায় করা ওয়াজিব, তার উপর কুরবানী করাও ওয়াজিব। অর্থাৎ কুরবানীর তিন দিনের মধ্যে (১০ যিলহজ্জ ফজর থেকে ১২ই যিলহজ্জ সন্ধ্যা পর্যন্ত) যদি কোন মুসলমান আকেল, বালেগ ও মুকীম ব্যক্তির নিকট প্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্য, পোশাক-পরিচ্ছদ, ঘর-বাড়ি ও আসবাবপত্রের অতিরিক্ত সাড়ে সাত তোলা স্বর্ণ অথবা সাড়ে বায়ান্ন তোলা রৌপ্য, কিংবা সমমূল্যের টাকা বা যে কোনো সম্পদ থাকে, তবে তার উপর কুরবানী ওয়াজিব। কুরবানী ওয়াজিব হওয়ার জন্য এ মাল-সম্পদ এক বৎসর কাল স্থায়ী হওয়া শর্ত নয়। এ পরিমাণ মাল-ধন কুরবানীর দিনসমূহে থাকলেই কুরবানী ওয়াজিব হয়ে যাবে। তবে যাদের উপর কুরবানী ওয়াজিব নয়, তারা যদি (সঙ্গতি থাকলে) কুরবানী করে, তারাও অনেক সওয়াবের অধিকারী হবে। (সুনানে ইবনে মাজাহ; হা.নং ৩১২৩, আদ্দুররুল মুখতার ২/২৩১, ৯/৪৫৭, হিদায়া ১/২৩২)

কুরবানীর পশু

গরু, মহিষ, উট, ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা দ্বারা কুরবানী করা যায়। ছাগল, ভেড়া, দুম্বা এক বছরের। গরু, মহিষ দুই বছরের এবং উট পাঁচ বছরের হওয়া উচিত। কিন্তু ভেড়া ও দুম্বা যদি এমন হৃষ্ট পুষ্ট হয় যে, ছয় মাসেরটা দেখতে এক বছরের দেখায়, তবে এতেও কুরবানী হয়ে যাবে। (সূরা হজ্জ- ৩৪, সহীহ মুসলিম; হা.নং ৫১৯৪, ৫১৯৭, সুনানে তিরমিযী; হা.নং ১৪৯৯, ফাতাওয়া আলমগীরী ৫/২৯৭, ফাতাওয়া শামী ৯/৪৬৫-৪৬৬)

মাসআলা: কুরবানীর পশু মোটা-তাজা, হৃষ্ট-পুষ্ট, সুদর্শন ও দোষমুক্ত হওয়া বাঞ্ছনীয়। খাসীকৃত পশুর কুরবানী উত্তম। ভেড়া থেকে দুম্বা কুরবানী উত্তম। খাসী থেকে বকরীর কুরবানী উত্তম। এরূপ উট থেকে উটনী এবং ষাঁড় থেকে গাভী কুরবানী উত্তম। (মুসনাদে আহমদ; হা.নং ৯৭৩৯, ২৩৯১১, আদ্দুররুল মুখতার ৯/৪৬৬-৪৬৭)

মাসআলা: কুরবানীর পশু গর্ভবতী বলে জানা গেলেও তার দ্বারা কুরবানী জায়েয। তবে গর্ভে বাচ্চা জীবিত পেলে সেটাকেও আল্লাহর নামে জবাই করে দিতে হবে এবং শরীকী কুরবানী হলে এটাকেও প্রত্যেকের অংশ হিসেবে পৃথক ভাগ করে দিতে হবে। কেউ ইচ্ছা করলে এর গোশত খেতে পারে। কিন্তু না খেলে কোন দোষ হবে না। (ফাতাওয়া শামী ৯/৫৩৪, আযীযুল ফাতাওয়া ২/১৮২; ফাতাওয়া আলমগীরী ৫/২৮৯)

মাসআলা: যদি বড় জানোয়ারের মধ্যে কারো অংশ সাত ভাগের এক ভাগের চেয়ে কম হয়, তাহলে একজনেরও কুরবানী আদায় হবে না। (সহীহ মুসলিম; হা.নং ১৩১৮, আদ্দুররুল মুখতার ৯/৪৫৭)

মাসআলা: বকরী যতই মোটা তাজা হোক না কেন, তার জন্য এক বছর পূর্ণ হওয়া জরুরী। এক বছরের একদিন কম হলে কুরবানী জায়েয হবে না। (সহীহ মুসলিম; হা.নং ৫১৯৪, রদ্দুল মুহতার ৯/৪৬৬)

মাসআলা: খরিদকৃত কুরবানীর জানোয়ার দ্বারা নিজে উপকৃত হওয়া মাকরূহ। চাই সে ধনী হোক বা গরীব হোক। সুতরাং কুরবানীর জন্য জানোয়ার ক্রয় করার পর যদি বাচ্চা হয় অথবা জবাই করার পর যদি পেটে জীবিত বাচ্চা পাওয়া যায় তবে ঐ বাচ্চাটিও কুরবানী করে দিতে হবে। তবে বাচ্চা কুরবানী না করে জীবিত দান করে দেয়া জায়েয আছে। এমনিভাবে কুরবানীর নিয়তে খরিদকৃত জানোয়ারের দুধও নিজে পান করবে না। গরীবদের মধ্যে দান করে দিবে। (মুসনাদে আহমদ; হা.নং ১৬২৫৫, ফাতাওয়া আলমগীরী ৫/৩০০-৩০১, ফাতাওয়া শামী ৯/৪৬৭)

মাসআলা: কুরবানীর পশু হারিয়ে যাওয়ার পর আরেকটি ক্রয় করা হলো। অতঃপর হারিয়ে যাওয়া পশুটি পুনরায় পাওয়া গেল। তাহলে ধনাঢ্য ব্যক্তির জন্য দু’টির যে কোন একটি কুরবানী করা ওয়াজিব। পক্ষান্তরে সে ব্যক্তি যদি গরীব হয়, তাহলে তার উপর দু’টি পশুই কুরবানী করা ওয়াজিব। উল্লেখ্য, ধনী ব্যক্তি যদি প্রথমে ক্রয়কৃত পশুটি কুরবানী না করে দ্বিতীয়টি করে এবং প্রথমটির চেয়ে দ্বিতীয়টির ক্রয় মূল্য কম হয়, তাহলে প্রথমটি ক্রয় করতে দ্বিতীয়টির চেয়ে যে পরিমাণ টাকা অতিরিক্ত লেগেছে, সে পরিমাণ টাকা সদকা করতে হবে। (সুনানে বাইহাকী কুবরা; হা.নং ১৯৬৭১, ফাতাওয়া শামী ৯/৪৭১)

যে সমস্ত ত্রুটিযুক্ত পশু কুরবানী করা জায়েয নয়

ক. অন্ধ, কানা বা খোঁড়া জানোয়ার কুরবানী করা দুরস্ত নয়। (সুনানে তিরমিযী; হা.নং ১৪৯৭, ১৫০৩, সুনানে আবু দাউদ; হা.নং ২৮০৪, ফাতাওয়া শামী ৫/৩১৬, ফাতাওয়া আলমগীরী ৫/২৯৭)

খ. পশু যদি এমন রুগ্ন ও দুর্বল হয় যে, কুরবানীর স্থান পর্যন্ত পায়ে হেঁটে যেতে পারে না, তাহলে এমন জানোয়ারের কুরবানী জায়েয হবে না। (সুনানে নাসাঈ; হা.নং ৭২১৫, সুনানে তিরমিযী; হা.নং ১৫০৩, ফাতাওয়া আলমগীরী ৫/২৯৭)

গ. জন্তুর কান বা লেজ এক তৃতীয়াংশ বা তার চেয়ে বেশি কেটে গিয়ে থাকলে, তার দ্বারা কুরবানী দুরস্ত নয়। (সুনানে তিরমিযী; হা.নং ১৪৯৮, ফাতাওয়া আলমগীরী ৫/২৯৮)

ঘ. যে পশুর মোটেও দাঁত নেই, কিংবা অধিকাংশ দাঁত পড়ে গেছে, তার দ্বারা কুরবানী করা যাবে না। যদি অধিকাংশ দাঁত বিদ্যমান থাকে, তাহলে কুরবানী জায়েয হবে। (ফাতাওয়া আলমগীরী ৫/২৯৮)

ঙ. যে পশুর শিং উঠেইনি, কিংবা উঠেছিল কিন্তু উপর থেকে ভেঙ্গে গেছে, তার কুরবানী জায়েয। কিন্তু একেবারে মূল থেকে ভেঙে গিয়ে থাকলে, কুরবানী দুরস্ত নয়। (সুনানে তিরমিযী; হা.নং ১৫০৪, ফাতাওয়া আলমগীরী ৫/২৯৭)

চ. যে জানোয়ারের খুঁজলি বা চর্মরোগ হয়েছে, যদি এর প্রতিক্রিয়া গোশত পর্যন্ত পৌঁছে গিয়ে থাকে, তবে কুরবানী দুরস্ত নয়, অন্যথায় দুরস্ত আছে। (আহকামে কুরবানী; পৃষ্ঠা ৩৬)

ছ. যে মাদী জানোয়ারের স্তন নেই, কিংবা স্তন আছে কিন্তু শুকিয়ে গেছে অথবা শক্তি বৃদ্ধির জন্য ঔষধের মাধ্যমে শুকিয়ে ফেলা হয়েছে, তাহলে এরূপ পশু দ্বারা কুরবানী দুরস্ত হবে না। (কিফায়াতুল মুফতী ৮/১৮৯, ফাতাওয়া আলমগীরী ৫/২৯৮)

কুরবানী করার নিয়ম

কুরবানীর জন্তুকে ক্বিবলা রোখ করে শোয়ানোর পর প্রথমে নিম্নোক্ত দু‘আটি পড়বে। উল্লেখ্য, ক্বিবলার দিকে না করা হলে মাকরূহ হবে। (রদ্দুল মুহতার ৯/৪২৭)

إِنِّي وَجَّهْتُ وَجْهِيَ لِلَّذِي فَطَرَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ حَنِيفًا وَمَا أَنَا مِنَ الْمُشْرِكِينَ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ لَا شَرِيكَ لَهُ وَبِذَلِكَ أُمِرْتُ وَأَنَا من الْمُسْلِمِينَ اللهم منك ولك بسم الله الله اكبر

জবাইয়ের পরে বলবে- اللهم تقبل منى كما تقبلت من حبيبك محمد وخليلك ابراهيم عليهم السلام (সুনানে আবু দাউদ; হা.নং ২৭৯৫, ফাতাওয়া মাহমূদিয়া ২৬/৩৪৮, ৩৪৯)

[যদি নিজের কুরবানী হয়, তবে মিন্নী বলবে। আর যদি অন্যের কুরবানী হয়, তবে মিন শব্দের পর যার বা যাদের কুরবানী তার বা তাদের নাম উল্লেখ করবে। আর যদি অন্যের সঙ্গে শরীক হয়, তবে মিন্নীও বলবে এবং মিন্নী-এর পর ওয়ামিন শব্দ লাগিয়ে তারপর অন্যদের নাম উল্লেখ করবে।]

অর্থ: আমি একমুখী হয়ে স্বীয় মুখমণ্ডল ঐ আল্লাহর দিকে করেছি, যিনি নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডল সৃষ্টি করেছেন এবং আমি মুশরিকও নই। আমার নামায, আমার কুরবানী এবং আমার জীবন ও মরণ বিশ্ব-প্রতিপালক আল্লাহরই জন্য। হে আল্লাহ! এটাকে আপনি আমার পক্ষ হতে কবুল করে নিন। যেমন আপনি কবুল করেছেন আপনার হাবীব হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং আপনার খলীল হযরত ইবরাহীম আ. এর পক্ষ হতে। দু‘আ নিজ ভাষায়ও পড়া যাবে।

মাসআলা: কুরবানী করার সময় মুখে নিয়ত করা এবং দু‘আ পড়া জরুরী নয়। যদি অন্তরে এ ধারণা করে যে, আমি কুরবানী করছি, আর মুখে কিছুই না বলে শুধু ‘বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার’ বলে জবাই করে তবুও কুরবানী জায়েয হবে। তবে যদি সহীহ শুদ্ধভাবে দু‘আ স্মরণ থাকে তাহলে পড়ে নেয়া উত্তম। (ফাতাওয়া শামী ৯/৪৫২, জাওয়াহিরুল ফিকহ ১/৪৫০)

মাসআলা: যে কোনো হালাল পশুপাখি জবাই করার সময় ইচ্ছাকৃতভাবে ‘বিসমিল্লাহ’ ছেড়ে দিলে, জবাইকৃত প্রাণীর গোশত হারাম হয়ে যায়। তা নিজে খাওয়া বা অপরকে খাওয়ানো অথবা বিক্রি করা সম্পূর্ণ নাজায়েয বা হারাম। (সূরা মায়েদা- ৩, সহীহ বুখারী; হা.নং ৩৮২৬, ফাতাওয়া আলমগীরী ৫/২৮৮, ফাতাওয়া মাহমূদিয়া ২৬/১৪০)

মাসআলা: অনেক লোক কুরবানী করার জন্য দু‘আ পড়াকে খুবই জরুরী মনে করে। অথচ দু‘আ পড়া ব্যতীতই কুরবানী সহীহ হয়ে যায়। দু‘আ পড়া শুধু মুস্তাহাব, জরুরী নয়। (আগলাতুল আওয়াম; পৃষ্ঠা ১৩৪)

মাসআলা: জবাইকারীর সাথে অন্য কেউ ছুরি চালানোর মধ্যে শরীক থাকলে তার জন্যও ‘বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার’ বলা ওয়াজিব। যারা হাত, পা, মুখ ইত্যাদি ধরে তারা জবাইয়ের মধ্যে শরীক নয়; বরং তারা শুধু সাহায্যকারী। কাজেই তাদের জন্য বিসমিল্লাহ পড়া জরুরী নয়। (ইমদাদুল ফাতাওয়া ৩/৫০৭, ফাতাওয়া শামী ৯/৪৮৩)

মাসআলা: জবাই করার সময় যদি পশুর মাথা শরীর থেকে পৃথক হয়ে যায়, তাহলে হারাম হবে না, হালালই থাকবে এবং কুরবানীও হবে। তবে মাকরূহ হবে। (রদ্দুল মুহতার ৯/৪২৭)

মাসআলা: জবাইয়ের পর পশু শান্ত হওয়ার পূর্বে তার পায়ের রগ ইত্যাদি কাটা মাকরূহ। (রদ্দুল মুহতার ৯/৪২৭)

কুরবানীর ওয়াক্ত বা সময়

কুরবানী নির্দিষ্ট সময়ের সাথে সম্পর্কিত একটি ইবাদত। এ সময়ের পূর্বে যেমন কুরবানী আদায় হবে না তেমনি পরে করলেও আদায় হবে না। কারণ কুরবানীর কোনো কাযা নেই। তবে কারো উপরে যদি কুরবানী ওয়াজিব হয়ে থাকে এবং সে কুরবানীর দিনগুলোতে কুরবানী না করে তবে পরবর্তীতে তাকে একটি বকরীর মূল্য দান করে দিতে হবে। (আলমাবসুত লিসসারাখসী ৬/২০০৯, আলহিদায়া ৪/৪৪৪।)

যারা ঈদের নামায আদায় করবেন তাদের জন্য কুরবানীর সময় শুরু হবে ঈদের নামায আদায় করার পর থেকে। যদি ঈদের নামায আদায়ের পূর্বে কুরবানীর পশু জবাই করা হয় তাহলে কুরবানী আদায় হবে না। হাদীসে এসেছে, আল-বারা ইবনে আযেব রাযি. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি শুনেছি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুতবাতে বলেছেন,

إن أول ما نبدأ فى يومنا هذا، أن نصلى ثم نرجع فننحر، فمن فعل ذلك فقد أصاب سنتنا، ومن نحر قبل الصلوة فإنما هو لحم قدمه لأهله، ليس من النسك في شيء.

অর্থ : এ দিনটি আমরা শুরু করব নামায দিয়ে। অতঃপর নামায থেকে ফিরে আমরা কুরবানী করব। যে এমন আমল করবে সে আমাদের আদর্শ সঠিকভাবে অনুসরণ করল। আর যে এর পূর্বে জবাই করল সে তার পরিবারবর্গের জন্য গোশতের ব্যবস্থা করল। কুরবানীর কিছু আদায় হলো না। (সহীহ বুখারী; হা.নং ৯৬৫)

নামায শেষ হওয়ার সাথে সাথে কুরবানী পশু জবাই করবে না; বরং নামাযের খুতবা দু’টি শেষ হওয়ার পর জবাই করবে। কারণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুতবা শেষ করে জবাই করেছেন। হাদীসে এসেছে, জুনদাব ইবনে সুফিয়ান আল-বাজালী রাযি. বলেছেন,

صلى النبى صلى الله عليه وسلم يوم النحر، ثم خطب ثم ذبح الخ

অর্থ : নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরবানীর দিন নামায আদায় করলেন অতঃপর খুতবা দিলেন তারপর পশু জবাই করলেন। (সহীহ বুখারী; হা.নং ৯৮৫)

মাসআলা: যে শহরে একাধিক জায়গায় ঈদের নামায হয়, তথায় কোনো এক জায়গায় নামায হয়ে গেলেই কুরবানী জায়েয হবে। যিনি কুরবানী করবেন তিনি যদিও ঈদের নামায না পড়ে থাকেন, তারপরও এলাকার কোন মসজিদে ঈদের নামায হয়ে গেলেই কুরবানী করতে পারবেন। কেননা যার কুরবানী করা হবে, তার জন্য ঈদের নামায থেকে ফারিগ হওয়া জরুরী নয়। (ফাতাওয়া মাহমূদিয়া ২৬/৩৪৩, ইমদাদুল ফাতাওয়া ৩/৫৯৭)

মাসআলা: যে সমস্ত এলাকায় শরীয়ত মতে ঈদের নামায হয় না, সে স্থানের লোকেরা সুবহে সাদিকের পর কুরবানী করতে পারে। যদি শহরের লোকেরা এরূপ গ্রামে কুরবানীর পশু পাঠিয়ে দেয়, তাহলে সেই পশুর কুরবানী সুবহে সাদিকের পর জায়েয আছে। তবে শহরবাসীদের নিজস্ব এলাকায় ঈদের নামাযের পর কুরবানী করতে হবে। (ফাতাওয়া শামী ৯/৪৬১)।

মাসআলা: রাত্রেও কুরবানী করা যায় তবে ভালো নয়। কেননা হয়ত এর ফলে কোন রগ কাটা বাকী থাকতে পারে, যদ্দরুণ কুরবানীই বাতিল হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। (ফাতাওয়া আলমগীরী ৫/২৯৬)।

মাসআলা: যদি বিশেষ কারণ বশতঃ কোনো এলাকার লোকজন প্রথম দিন ঈদের নামায পড়তে না পারে, তবে ঈদের নামাযের ওয়াক্ত অতিবাহিত হওয়ার পরই কুরবানী করা জায়েয হবে। (মাসায়িলে ঈদাইন ও কুরবানী; পৃষ্ঠা ১৫৮)।

মাসআলা: কুরবানী কেবলমাত্র তিন দিনের মধ্যে সীমিত। আর কুরবানীর দিনগুলো হলো ১০, ১১ ও ১২ যিলহজ্জ। এ তিন দিনের যে কোন দিন কুরবানী করা যায়। তবে প্রথম দিন কুরবানী করা উত্তম। তারপর পর্যায়ক্রমে ১১ ও ১২ যিলহজ্জ। উল্লেখ্য যে, কোন কারণ ব্যতীত কুরবানী করায় বিলম্ব না করাই উত্তম। (ফাতাওয়া শামী ৯/৪৮৫, ফাতাওয়া আলমগীরী ৫/২৯৫, সহীহ বুখারী; হা.নং ৯৫৫, সহীহ মুসলিম; হা.নং ১৯৬১)

অংশীদারিত্বের কুরবানী

শরীকী কুরবানী বা অংশীদারিত্বের কুরবানী হলে শরীকদের প্রত্যেকেরই আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের নিয়ত থাকতে হবে। কেউ যদি কেবল গোশত খাওয়ার উদ্দেশ্যে কুরবানী করে, তাহলে কারো কুরবানীই দুরস্ত হবে না। (ফাতাওয়া শামী ৯/৪৭২)

মাসআলা: অংশীদারিত্বের কুরবানীর গোশত অনুমানের ভিত্তিতে বণ্টন করা যাবে না। বরং পূর্ণ মাত্রায় সতর্কতার সাথে সঠিক ও সমভাবে নিক্তিতে ওজন করে বণ্টন করা না হলে কোন অংশে যদি বেশ-কম হয়ে যায়, তাহলে তা সুদে পরিণত হবে এবং গুনাহ হবে। তবে কথা হলো, গোশতের সাথে যদি পশুর মাথা, পা, চামড়া ইত্যাদি সব এক সাথে বণ্টন করা হয়, তাহলে যে অংশে এগুলো পড়বে, সে অংশে গোশত কিছু কম পড়লেও জায়েয হবে। চাই যে পরিমাণ কম পড়–ক। আর যে অংশে গোশত বেশি পড়েছিল, সে অংশে এগুলো দিলে সুদ গণ্য হবে এবং গুনাহ হবে। (ফাতাওয়া শামী ৯/৪৭২-৪৭৩)

মাসআলা: মনে করুন, সাত জন শরীক মিলে কুরবানী করার জন্য একটা পশু ক্রয় করেছে। কিন্তু পশু জবাই করার পূর্বে এমন একজন অংশীদার পৃথক হয়ে গেল যার উপর কুরবানী ওয়াজিব এবং অন্য লোক যদি তার স্থানে শরীক হয়ে যায়, তবে তাদের কুরবানী শুদ্ধ হয়ে যাবে। আর যদি অংশীদারদের মধ্য থেকে এমন ব্যক্তি জবাইয়ের পূর্বে পৃথক হয়ে যায়, যার উপর কুরবানী ওয়াজিব ছিল না, তাহলে অংশীদারদের কারো কুরবানী দুরস্ত হবে না। (আদ্দুররুল মুখতার ৬/৬৩৯, কিফায়াতুল মুফতী ৮/১৯২)

মাসআলা: স্ত্রীর পক্ষ থেকে স্বামীর কুরবানী করা এবং স্বামীর পক্ষ থেকে স্ত্রীর কুরবানী করা ওয়াজিব নয়। (আলমাবসূত লিস্সারাখসী ৬/২০০৯, ফাতাওয়া শামী ৯/৪৫৩)

হ্যাঁ, যদি অনুমতি নিয়ে একে অপরের কুরবানী করে তাহলে ওয়াজিব আদায় হয়ে যাবে। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৬/১৯৫, ফাতাওয়া শামী ৯/৪৫৩)

মাসআলা: কোনো কোনো স্থানে মানুষ এক বছর নিজের নামে এক বছর ছেলের নামে আর এক বছর নিজের স্ত্রীর নামে কুরবানী করে অর্থাৎ প্রতি বছর নাম পরিবর্তন করতে থাকে এটা জায়েয নয়। বরং যার উপর কুরবানী ওয়াজিব হয়, প্রতি বছর শুধু তারই কুরবানী করা কর্তব্য। অন্যের নামে করলে তার নিজের কুরবানী আদায় হবে না। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৫/২৯৩)

মাসআলা: কুরবানী দাতার জন্য কুরবানীর গোশত বিক্রি করা হারাম। এতদসত্ত্বেও যদি কেউ বিক্রি করে দেয় তাহলে সেই মূল্য গরীব মিসকিনদের মধ্যে বণ্টন করে দিতে হবে। ঐ মালিক কোনো মতেই সেই মূল্য ভক্ষণ করতে পারবে না। তবে কোনো ব্যক্তি উক্ত কুরবানীর গোশতের মালিক হওয়ার পর সে যদি তা বিক্রি করে দেয় তাহলে তা নাজায়েয হবে না। গরু, মহিষ, উট ইত্যাদির মধ্যে সাত ভাগের বেশি শরীক হয়ে কুরবানী করা জায়েয হবে না। যদি কেউ এমন করে তাহলে তাদের মধ্যে কারো কুরবানী সহীহ হবে না। এমনকি কারো ভাগের মধ্যে যদি অন্য কাউকে শরীক করে তাহলেও জায়েয হবে না। দুই বা ততধিক ব্যক্তি সাত ভাগের এক অংশের মধ্যে শরীক হলেও কুরবানী জায়েয হবে না। (মুসনাদে আহমদ; হা.নং ১৬২৫৫, জাওয়াহিরুল ফিকহ ১/৪৫২)

মাসআলা: যদি কোন ব্যক্তির দশজন ছেলে থাকে এবং সকলেই একান্নভুক্ত হয়, তাহলে শুধু পিতার উপর একটি কুরবানী ওয়াজিব হবে। হ্যাঁ, যদি ছেলেরা নিসাবের মালিক হয়, তাহলে পিতার কুরবানী তাদের জন্য যথেষ্ট হবে না। তাদের আলাদা কুরবানী করতে হবে। (রদ্দুল মুহতার ৫/২০০)

মান্নতের কুরবানী

মাসআলা: কুরবানী মান্নত করলে, মান্নতকারী ধনী হোক বা গরীব হোক, সর্বাবস্থায় তার উপর কুরবানী ওয়াজিব হয়ে যায়। (সূরা হজ্জ- ৩০, সহীহ বুখারী; হা.নং ৬৬৯৬, ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৫/২৯১, বাদায়িউস সানায়ি’ ৫/৬১)

মাসআলা: মান্নতের কুরবানীর গোশত মান্নতকারী ও ধনী ব্যক্তিদের জন্য খাওয়া নাজায়েয। খেয়ে ফেললে, যে পরিমাণ খেয়েছে, তার মূল্য সদকা করে দিতে হবে। (ফাতাওয়া শামী ৬/৩২১)

মাসআলা: কোন নির্দিষ্ট জন্তুকে কুরবানী করার জন্য মান্নত করলে সেটাকেই কুরবানী করতে হবে। যদি কুরবানীর দিন অতিবাহিত হয়ে যায়, কিন্তু জন্তুকে কুরবানী করা হয়নি, এমতাবস্থায় ঐ জন্তুটিকে জীবিত সদকা করে দিতে হবে। (ফাতাওয়া মাহমূদিয়া ২৬/৩৫৪, রদ্দুল মুহতার ৫/২০৪)

মাসআলা: নিসাবের মালিক ব্যক্তি যদি বকরা ঈদের পূর্বে কুরবানী করার মান্নত করে, তাহলে তার উপর দু’টি কুরবানী করা ওয়াজিব। একটি নযর বা মান্নতের দ্বিতীয়টি নিসাবের। (ফাতাওয়া শামী ৫/২২৫)

জবাইয়ের মাসায়িল

মাসআলা: জবাই করার সময় জবাইকারীর মুখ পশ্চিম দিকে করা সুন্নাতে মুআক্কাদাহ। বিনা ওযরে অন্য দিকে মুখ করে জবাই করা মাকরূহে তাহরীমী। (ফাতাওয়া আলমগীরী ৫/২৮৮)

মাসআলা: নিজের কুরবানীর পশু নিজের হাতে জবাই করা উত্তম। নিজে না জানলে, অন্যকে দিয়ে করিয়ে নিবে। তবে জবাইয়ের পশুর নিকট উপস্থিত থাকা উত্তম। (সুনানে তিরমিযী; হা.নং ১৫২১, মুস্তাদরাকে হাকেম; হা.নং ৭৫২৫, ফাতাওয়া শামী ৬/৩২৮)

মাসআলা: জবাই করার পর পশু একবারে নিস্তেজ হবার পূর্বে তার গলায় ছুরির মাথা দিয়ে আঘাত করা, পায়ের চামড়া কাটা বা চামড়া ছাড়ানো মাকরূহে তাহরীমী। (বাদায়িউস সানায়ি’ ৫/৮০)

মাসআলা: কুরবানীর পশুর রশিসহ কোন কিছু বিক্রি করা যাবে না, পারিশ্রমিক হিসেবে দেয়া যাবে না। (ফাতাওয়া শামী ৬/৩২৮; ফাতাওয়া আলমগীরী ৫/৩০০)

চামড়ার মাসায়িল

মাসআলা: কুরবানীর চামড়া দীনী মাদরাসার দরিদ্র ছাত্রদেরকে দান করা উত্তম। কেননা তাতে দুই দিকে সাওয়াব অর্জন হয়। প্রথমতঃ গরীবকে দান করার সাওয়াব। দ্বিতীয়তঃ দীনী ইলমের প্রচার ও প্রসার। অর্থাৎ দীনের খিদমতের সাওয়াব। কিন্তু তা দ্বারা শিক্ষকের বেতন বা অন্য কর্মচারীর পারিশ্রমিক দেয়া আদৌ জায়েয হবে না। (জাওয়াহিরুল ফিকহ ১/৪৫৬, সূরা মায়িদা- ২, ইমদাদুল ফাতাওয়া ৩/৫৩৩)

মাসআলা: কুরবানীর চামড়া বিক্রি করে তার মূল্য দিয়ে মসজিদ, মাদরাসা, মক্তব, রাস্তা মেরামত বা নির্মাণ করা জায়েয নয়। (ফাতাওয়া শামী ৬/৩২৮-৩২৯, আহসানুল ফাতাওয়া ৭/৪৯৫, কিফায়াতুল মুফতী ৮/২৪২)

মাসআলা: পশুর দেহ থেকে চামড়া পৃথক করার পূর্বে তা বিক্রি করা নাজায়েয। (আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩২৯)

মাসআলা: কুরবানীর পশুর পুরো চামড়াটাই হাদিয়া করে দেয়া যেতে পারে। তবে বিক্রি করলে তার মূল্য গরীবকে দান করা জরুরী। বিক্রয়লব্ধ চামড়ার মূল্যটা হুবহু ঐভাবেই প্রাপ্যদের হাতে পৌঁছে দেয়া উচিত। টাকাটা কোনো কাজে খরচ করে পরবর্তীতে সমপরিমাণ টাকা নিজের থেকে পরিশোধ করাটা নিতান্ত দোষণীয়। তবে দোষণীয় হলেও আদায় হয়ে যাবে। (ফাতাওয়া শামী ৬/৩২৮, ফাতাওয়া আলমগীরী ৫/৩০১)

মাসআলা: কুরবানীর গোশত, চামড়া বা তার মূল্য দ্বারা কসাই, জবাইকারী বা অন্য কারো পারিশ্রমিক দেয়া নাজায়েয। পৃথকভাবে তাদের মজুরি দিতে হবে। (সহীহ মুসলিম; হা.নং ৩২৪১, ফাতাওয়া শামী ৬/৩২৮, শরহুত তানবীর ৫/৩২১)

মাসআলা: কুরবানী দাতার পক্ষে চামড়া দ্বারা বালতি, মশক, জায়নামায প্রভৃতি দ্রব্য সামগ্রী তৈরি করে ব্যবহার করা বৈধ আছে। (ফাতাওয়া শামী ৬/৩২৮)

মৃত ব্যক্তির নামে কুরবানী

মাসআলা: মৃত ব্যক্তিকে সাওয়াব পৌঁছানোর উদ্দেশ্যে তার পক্ষ থেকে কুরবানী করা যায়। আর সে কুরবানীর গোশত সকলেই খেতে পারে। কিন্তু মৃত ব্যক্তি যদি তার নিজস্ব মাল থেকে কুরবানী করার ওসীয়ত করে যায়, তাহলে কুরবানীর সম্পূর্ণ গোশত সদকা করে দিতে হবে। (ফাতাওয়া শামী ৬/৩৩৫)

মাসআলা: একাধিক লোক মিলে এক মৃত ব্যক্তির জন্য কুরবানী করতে পারে। যেমন, ছয় ব্যক্তি কুরবানীর উদ্দেশে একটা গরু খরিদ করল। তাতে ছয় জনের ছয় অংশ থাকল, অবশিষ্ট একাংশ তাদের সকলের ঐক্যমতে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বা যে কোন মৃত ব্যক্তির জন্য দেয়া হলো। (ফাতাওয়া মাহমূদিয়া ২৬/৩১১, ফাতাওয়া শামী ৬/৩৬২)

মাসআলা: কারো উপর কুরবানী ওয়াজিব হওয়া সত্ত্বেও যদি সে নিজের পক্ষ থেকে কুরবানী না করে অন্য কারো পক্ষ থেকে ওয়াজিব কুরবানী করে, তাহলে ঐ কুরবানীর দ্বারা তার নিজের ওয়াজিব কুরবানী আদায় হবে না; বরং তার উপর আরেকটি কুরবানী করা ওয়াজিব হবে। কারণ, একটি কুরবানী দুইজনের পক্ষ থেকে যথেষ্ট নয়। আর যদি কুরবানী নিজের পক্ষ থেকে করে এবং মৃত ব্যক্তির জন্য ইসালে সাওয়াব উদ্দেশ্য হয়, তাহলে উক্ত কুরবানীর দ্বারাই তার ওয়াজিব আদায় হবে। (ফাতাওয়া মাহমূদিয়া ২৬/২৪৬, ফাতাওয়া আলমগীরী ৫/৩০৪)

মাসআলা: যে ব্যক্তির উপর কুরবানী ওয়াজিব নয়, সে যদি কুরবানীর উদ্দেশ্যে পশু খরিদ করে ফেলে, তাহলে তার উপর কুরবানী ওয়াজিব হয়ে যাবে। (ফাতাওয়া আলমগীরী ৫/২৯৪)

মাসআলা: নাবালেগ সন্তানদের পক্ষ থেকে কুরবানী করা মুরুব্বীদের উপর ওয়াজিব নয়; বরং মুস্তাহাব। নাবালেগ ছেলেমেয়ে মালদার হলেও তাদের মাল থেকে কুরবানী করা যাবে না। (ফাতাওয়া শামী ৬/৩১৬, ফাতাওয়া আলমগীরী ৫/২৯৬)

কুরবানীর গোশতের হুকুম

মাসআলা: কুরবানীর গোশত সবাই খেতে পারে। নিজে খাবে, আত্মীয়-স্বজনকে দিবে এবং গরিব-মিসকিনদের মাঝে বণ্টন করবে। যদি সম্পূর্ণ গোশত নিজে খায়, তবুও নাজায়েয হবে না। তবে উত্তম এই যে, কুরবানীর গোশতকে তিন ভাগ করবে, এক ভাগ স্বয়ং নিজের ও পরিবার-পরিজনের জন্য রাখবে, এক ভাগ আত্মীয়-স্বজনকে এবং এক ভাগ ফকির-মিসকিনদের মধ্যে বিলিয়ে দিবে। অর্থাৎ এক-তৃতীয়াংশ ফকির-মিসকিনদেরকে দেয়া মুস্তাহাব। তবে কেউ যদি সম্পূর্ণ গোশত নিজেই খায়, দান না করে তাও জায়েয আছে। (সূরা হজ্জ- ২৮, সহীহ বুখারী; হা.নং ৫৫৬৯, হিদায়া ৪/৫, ফাতাওয়া মাহমূদিয়া ২৬/৩৮৪, আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩২৮, ফাতাওয়া আলমগীরী ৫/৩০০)

মাসআলা: কুরবানীর গোশত বাসা-বাড়ির চাকর-চাকরানিকে বেতন হিসেবে খাওয়ানো জায়েয হবে না। বেতন হিসেবে না দিয়ে যদি এমনিতেই দেয়, তাহলে কোনো অসুবিধা নেই। দারুল উলূম দেওবন্দের মুফতী মাহদী হাসান সাহেব রহ. বলেছেন, কুরবানী বা আকীকার গোশত বেতনের মধ্যে শামিল হবে না। কারণ, মালিক যখন ঐ গোশত স্বীয় ঘরে এনে পাকায় তখন কুরবানীর গোশতের হুকুম খতম হয়ে সাধারণ খানার ন্যায় হয়ে যায়। কাজেই চাকরকে খাওয়াতে কোনো অসুবিধা নেই। (ইমদাদুল মুফতীন; পৃষ্ঠা ৮০০, মাসায়িলে ঈদাইন ও কুরবানী; পৃষ্ঠা ১৮৯)

মাসআলা: কুরবানীর গোশত অমুসলিমকেও দেয়া যেতে পারে। (আযীযুল ফাতাওয়া ৭৬১, আপকে মাসাইল আওর উনকা হল ৪/১৩৪)

মাসআলা: কারো উপর কুরবানী ওয়াজিব ছিল, কিন্তু সে তিনদিনের মধ্যে কুরবানী করেনি, তাহলে তার উপর একটি ছাগল বা ভেড়া অথবা একটি গরু-মহিষের এক-সপ্তমাংশের মূল্য সদকা করা ওয়াজিব। (ফাতাওয়া শামী ৬/৩২৯, ফাতাওয়া মাহমূদিয়া ২৬/৩৪৬)

মাসআলা: কুরবানীর জন্তু ক্রয় করা সত্ত্বেও কুরবানীর সময়ের মধ্যে যদি সে কুরবানী না করে, তাহলে অবিকল সেই জন্তুই সদকা করা ওয়াজিব। উল্লিখিত অবস্থায় সে ঐ জন্তু জবাই করে গরিবদের মধ্যে বণ্টন করবে। কিন্তু সে উক্ত জন্তুর গোশত খেতে পারবে না এবং কোনো ধনী লোককেও দিতে পারবে না। এটা শুধু ফকির-মিসকিনদেরই হক। (ফাতাওয়া শামী ৬/৩২১)

মাসআলা: কুরবানীর পশু জবাই করে তার বিনিময় গ্রহণ করা জায়েয আছে। বরং বিনিময় নেয়াটা জবাইকারীর হক। তবে সেই বিনিময় কুরবানীর গোশত বা চামড়ার দ্বারা লেনদেন করা নিষেধ। অবশ্য কেউ যদি আল্লাহর ওয়াস্তে অন্যের জন্তু জবাই করে দেয় তাহলে এটা তার জন্য উত্তম। (আযীযুল ফাতাওয়া ১/৬৬৯, কিফায়াতুল মুফতী ৮/২৪৩)

মাসআলা: হালাল প্রাণীর আটটি অংশ খাওয়া নিষেধ। যথা- (১) পুরুষ লিঙ্গ, (২) স্ত্রী লিঙ্গ, (৩) মূত্র থলি, (৪) পিঠের হাড়ের ভিতরের মগজ বা সাদা রগ, (৫) চামড়ার নিচের টিউমারের মতো উঁচু গোশত, (৬) অ-কোষ, (৭) পিত্ত এবং (৮) প্রবাহিত রক্ত। উল্লেখ্য যে, শুধু প্রবাহিত রক্ত খাওয়া হারাম, আর অবশিষ্টগুলো মাকরূহে তাহরীমী। (ইমদাদুল ফাতাওয়া ৪/১১, ফাতাওয়া মাহমূদিয়া ২৬/২১৭, আল-বাহরুর রায়িক ৮/৪৮৫, তাবয়ীনুল হাকায়েক ৬/২২৬

পোস্টটি লাইক ও শেয়ার করুন।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

একটি মন্তব্য লিখুনঃ