তারাবীহ নামায ২০ রাকাআত : দলীল প্রমাণ

মুফতী হাফিজুর রহমান

১. ইরবাজ বিন সারিয়া রাযি. হতে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমার তিরোধানের পর তোমরা যারা বেঁচে থাকবে তারা নানা ধরনের মতভিন্নতা দেখতে পাবে। সেক্ষেত্রে তোমরা আমার এবং আমার সত্যনিষ্ঠ সুপথপ্রাপ্ত প্রতিনিধিদের সুন্নাহ ও আদর্শকে গ্রহণ করবে। একে তোমরা আকড়ে ধরবে এবং দন্তমাড়ির সাহায্যে কামড়ে ধরার ন্যায় প্রাণপণে আকড়ে ধরবে।…এবং তোমরা (ধর্মীয় বিষয়ে) নবাবিস্কৃত বিষয়াদি থেকে খুব সতর্কতার সাথে নিবৃত্ত থাকবে। কারণ প্রতিটি নব আবিস্কৃত বিষয়ই হলো বিদাত। আর প্রতিটি বিদাত হলো পথভ্রষ্টতা।-সুনানে আবুদাউদ; হাদীস ৪৬০৭, সুনানে তিরমিযী, হাদীস ২৬৭৬, মুসনাদে আহমদ, হাদীস ১৬৬৯২, সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস ৪২, সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস ৫

২. উরওয়া রাযি. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আয়িশা রাযি. বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদা গভীর রাতে রুম থেকে বের হলেন। এরপর মসজিদে গিয়ে নামায আদায় করলেন। অন্যান্য লোকজনও তার সাথে সে নামায আদায় করলো। ভোর বেলা লোকজন এ বিষয়টি নিয়ে কথা বার্তা বলতে শুরু করলো। পরদিন রাতে গত রাতের তুলনায় আরো বেশি লোকজন একত্রিত হল এবং তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে নামায পড়লো। দ্বিতীয় দিন ভোর বেলা সবাই এ বিষয় নিয়ে আবার পরস্পরের সাথে আলোচনা শুরু করে দিলো। ফলে তৃতীয় দিন রাতে লোকের সংখ্যা আরো বেড়ে গেলো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে গিয়ে নামায পড়লেন। তাঁর সাথে আগত সাহাবায়ে কেরাম সে নামায আদায় করলেন। চতুর্থ দিন রাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে যেতে অপারগতা প্রকাশ করলেন। ফজরের নামাযে মসজিদে গিয়ে যখন নামায আদায় শেষ করলেন তখন সাহাবাদের দিকে মুখ করে বসলেন। এরপর আল্লাহর একত্ববাদ এবং আল্লাহর রাসূল হওয়ার ব্যাপারে সাক্ষ্য পাঠ করলেন। এরপর বললেন, আজ রাতে তোমাদের মসজিদে উপস্থিত হওয়ার ব্যাপারটি আমার কাছে লুকায়িত ছিল না। তবে আমি আশঙ্কা বোধ করছিলাম, না জানি তোমাদের উপর এ নামায ফরয হয়ে যায়। সাহাবায়ে কেরাম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অক্ষমতার ব্যাপারটি সন্তুষ্ট চিত্তে মেনে নিলেন। এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এন্তেকাল করেন। আর গভীর রাতের নামাযের ব্যাপারটি সেভাবেই থেকে যায়।-সহীহ বুখারী, হাদীস ২০১২

৩. আব্দুর রহমান বিন আব্দ আল-কারী রাযি. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রমাযানের এক রাতে আমি উমর রাযি. এর সাথে মসজিদে গেলাম। তখন আমরা দেখতে পেলাম কেউ একাকী নামায পড়ছে, কেউ গুটি কয়েকজন লোক নিয়ে জামাতের সাথে নামায পড়ছে। তখন উমর রাযি. বললেন, আমার মনে হয যদি সকলে একজন ইমামের পেছনে নামায আদায় করতো তাহলে বিষয়টি শ্রেষ্ঠতর হতো। এরপর দৃঢ়ভাবে সংকল্পবদ্ধ হলেন। এবং সবাইকে উবাই ইবনে কা‘ব রাযি. এর পেছনে একত্রিত করলেন। এরপর অন্য একদিন রাতে আমি উমর রাযি. এর সাথে মসজিদে গেলাম তখন দেখতে পেলাম সকল লোক তাদের এক ইমামের পেছনে নমাজ আদায় করছে। তখন উমর রাযি. বললেন, এটা কত সুন্দর একটি নতুন বিষয়! শুরু রাতে যে নামায পড়া হয় তার তুলনায় শেষ রাতের নামায উত্তম। লোকজন তখন শুরু রাত্রে নামায আদায় করতো।-সহীহ বুখারী, হাদীস ২০১০

৪. ইবনে আব্দুল বার রাযি. বলেন, উমর ইবনুল খাত্তাব রাযি. নতুন কিছু করেননি। তিনি তাই করেছেন যা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পছন্দ করতেন। কিন্তু নিয়মিত জামাতের কারণে তারাবীহ নামায উম্মতের উপর ফরয হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিয়মিত জামাতের ব্যবস্থা করেননি। কারণ নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুমিনদের ব্যাপারে ছিলেন খুবই দয়াবান এবং যারপরনাই অনুগ্রহশীল। উমর রাযি. বিষয়টি জানতেন। তিনি দেখলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর এন্তেকালের পর ফরযের মাঝে কোনোরূপ সংজোযন বিয়োজন হবে না। তাই তিনি নববী রুচিবোধের প্রতি লক্ষ্য করে ১৪ হিজরীতে তারাবীহ নামাযের একটি জামাআতবদ্ধ রূপ দান করলেন। আল্লাহ তা‘আলা যেন তার জন্যই এ মর্যাদার আসনটি নির্ধারিত করে রেখেছিলেন। আবূ বকর রাযি. এর মনে এ চিন্তা উদগত হয়নি। যদিও সামগ্রিকভাবে তিনিই উত্তম ও অগ্রগণ্য ছিলেন। আলী রাযি. উমর রাযি. এর এ উদ্যোগটিকে উত্তম বিবেচনা করেন। এবং এটিকে প্রাধান্য দিলেন। এবং বলেন, এটি হলো রমাযন মাসের জ্যোতির্ময় আলো।-ইবনে আব্দুল বার, আত তামহীদ লিমা ফিল মুয়াত্তা মিনাল মায়ানী ওয়াল আসানীদ ৮/১০৮

উমর রাযি. বললেন, এটা অর্থাৎ তারাবীহ এর বড় জামাত কত সুন্দর নতুন একটি বিষয়। উমর রাযি. বলেননি, তারাবীহ নামায কত সুন্দর নতুন একটি বিষয়। কারণ তারাবীহ নামায যে সুন্নত তাতো মৌলিকভাবে প্রমাণিত।- মোল্লা আলী আলকারী আলহারাবী, মিরকাতুল মাফাতীহ শরহু মিশকাতিল মাসাবীহ ৪/৪৩৪

৫. সায়িব বিন ইয়াজিদ রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, তাঁরা (সাহাবা এবং তাবিয়ীন) উমর রাযি. এর যুগে রমাযান মাসে বিশ রাকাআত পড়তেন। তিনি আরো বলেন, তাঁরা নামাযে শতাধিক আয়াতবিশিষ্ট সূরা পাঠ করতেন। এবং উসমান রাযি. এর যুগে তাদের কেউ কেউ নামায দীর্ঘায়িত হওয়ার কারণে লাঠিতে ভর করে দাঁড়াতেন।-ইমাম বাইহাকী, আস-সুনানুল কুবরা; হাদীস ৪৮০১

৬. সায়িব বিন ইয়াজিদ রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা উমর রাযি. এর যুগে বিশ রাকাআত এবং বিতির পড়তাম।- ইমাম বাইহাকী, মা‘রিফাতুস সুনান ওয়াল আসার; হাদীস ৫৪০৯। হাদীসটি সনদ বিবেচনায় সহীহ। হাদীস এবং ফিকহের অনেক ইমাম এ হাদীস দ্বারা প্রমাণ উপস্থাপন করেছেন। যথা ইমাম নববী, তাকিউদ্দীন সুবকী, ওয়ালিউদ্দীন ইরাকী, বদরুদ্দীন আইনী এবং জালালুদ্দীন সুয়ূতী রহ. প্রমুখ। প্রয়োজনে দেখা যেতে পারে- আল-মাজমু শরহুল মুহাযযাব ৩/৫২৭, নাসবুর রায়াহ ২/১৫৪, উমদাতুল কারী শরহু সহীহিল বুখারী ৭/১৭৮, ইরশাদুস সারী শারহু সহীহিল বুখারী ৪/৫৭৮, আল মাসাবীহ ফি সালাতিত তারাবীহ ২/৭৪ ইত্যাদি
সায়িব বিন ইয়াজিদ রাযি. এর উপরোক্ত হাদীসটিকে শায়খ নাসিরুদ্দীন আলবানী রহ. এবং আব্দুর রাহমান মুবারকপুরী রাহ. জয়ীফ বলতে চেষ্টা করেছেন। আমাদের জানা মতে ইতিপূর্বে হাদীস বা ফিকহের কোনো ইমাম কিংবা কোনো মুহাদ্দিস আলিম হাদীসটিকে জয়ীফ বলেননি। এ বিষয়ে শায়খ আলবানী রাযি. যেসব স্থানে ত্রুটি বিচ্চুতিতে আক্রান্ত হয়েছেন তার মধ্য হতে বেশ কিছু জায়গা দলীল প্রমাণের আলোকে চিহ্নিত করেছেন সৌদি আরবের কেন্দ্রীয় দারুল ইফতার প্রাক্তন গবেষক মুহাদ্দিস ইসমাইল বিন আনসারী তার তাসহীহু সালাতিত তারাবীহ ইশরীনা রাকআতান ওয়ার রদ্দু আলাল আলবানী ফী তাযয়ীফিহী নামক অনবদ্য গ্রন্থে। আর মুবারকপুরী রহ. যেসব ত্রুটি বিচ্চুতির শিকার হয়েছেন তার স্বরূপ চিহ্নিত করেছেন মাওলানা হাবীবুর রহমান আ‘জমী রাহ. তার ‘রাকাআতে তারাবীহ’ গ্রন্থে।

৭. ইয়াজিদ বিন রুমান রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, সাহাবা এবং তাবিয়ীগণ উমর রাযি. এর যুগে রমাযান মাসে তেইশ রাকাআত পড়তেন। মুয়াত্তা মালিক; হাদীস ৩৮০

৮. আব্দুল আযীয বিন রুফাই রাযি. বলেন, উবাই বিন কা‘ব রাযি. রমাযান মাসে মসজিদে নববীতে লোকদের নিয়ে বিশ রাকাআত পড়তেন এবং তিন রাকাআত বিতর পড়তেন।-মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা; হাদীস ৭৭৬৬

উপরোক্ত হাদীসগুলো বর্ণনাগত দিক থেকে মুরসাল। আর পূর্বসূরি ইমামদের মতানুসারে তাবিয়ী ইমামদের মুরসাল বর্ণনা প্রমাণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য। বিশেষত একই বিষয়ে যদি একাধিক মুরসাল বর্ণনা থাকে কিংবা মুরসাল বর্ণনার সমর্থনে উম্মাহর অবিচ্ছিন্ন সম্মিলিত কর্মধারা বিদ্যমান থাকে তবে তো তার প্রামাণিকতার বিষয়ে কারো কোনো দ্বিমত নেই। ইমাম ইবনে তাইমিয়া রাযি. বলেন, যে মুরসাল বর্ণনার অনুকূলে অন্য কোনো বর্ণনা পাওয়া যায় কিংবা পূর্বসূরিগণ যার অনুসরণ করেছেন তা ফকীহগণের সর্বসম্মতিক্রমে দলীল হিসেবে গ্রহণযোগ্য।-ইকামাতুদ দলীল আলা ইবতালিত তাহলীল ১/৭৫

৯. ইমাম ইবনে তাইমিয়া রাহ. বলেন, …এ বিষয়টি প্রমাণিত, উবাই বিন কা‘ব রাযি. রমাযান মাসে মুসল্লীদের নিয়ে বিশ রাকাআত (তারাবীহ) পড়তেন এবং তিন রাকাআত বিতর পড়তেন।- ইমাম ইবতে তাইমিয়া, মাজমুউল ফাতাওয়া ২৩/১১২

১০. বিশ রাকাআত তারাবীহ সম্বন্ধে অন্যত্র ইবনে তাইমিয়া রাহ. বলেন, খুলাফায়ে রাশিদীনের সুন্নাহ এবং মুসলিম জাতির সম্মিলিত কর্ম দ্বারা এটি প্রমাণিত।- ইমাম ইবনে তাইমিয়া, মাজমুউল ফাতাওয়া ২৩/১১৩

১১. আবূ আব্দুর রাহমান সুলামী রাযি. বলেন, আলী রাযি. এক রমাযানে কারীদেরকে (হাফেযদেরকে) ডাকলেন। তাদের মধ্য হতে একজনকে লোকদের নিয়ে বিশ রাকাআত পড়াতে বললেন। বর্ণনাকারী আরো বলেন, আলী রাযি. তাদের নিয়ে বিতর পড়তেন। হাদীসটি আলী রাযি. থেকে অন্য একটি সূত্রেও বর্ণিত হয়েছে।-ইমাম বাইহাকী রহ., আসসুনানুল কুবরা (আলজাওহারুন নাকী সংযুক্ত); হাদীস ৪৮০৪

১২. আবুল হাসনা রাযি. থেকে বর্ণিত, আলী রাযি. এক রমাযানে এক ব্যক্তিকে লোকদের নিয়ে বিশ রাকাআত নামায পড়ার নির্দেশ দিলেন। মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা; হাদীস ২২৭
উপরোক্ত হাদীস দুটি দলীল হিসেবে গ্রহণযোগ্য। কারণ দুটি হাদীসই হাসান পর্যায়ভুক্ত। দেখা যেতে পারে, আলজাওহারুন নাকী, ইবনুত তুরকুমানী ২/৪৯৫

উপরন্তু, ১ম (পূর্ণ ধারাক্রমানুসারে ১১তম) হাদীসটি শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহ. মিনহাজুস সুন্নাতিন নাবাবিয়্যাহ গ্রন্থে (২/২২৪) এবং ইমাম শামসুদ্দীন যাহাবী রহ. আলমুনতাকা গ্রন্থে (৫৪২) দলীল হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এবং এর মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন, আলী রাযি. তারাবীহের জামাত এবং রাকাআত সংখ্যা বিষয়ে দ্বিতীয় খলীফা উমর ফারুক রাযি. এর নীতির উপরই ছিলেন।

১৩. ইমাম আতা বিন আবী রাবাহ রাযি. বলেন, আমি লোকদেরকে (সাহাবা এবং প্রথম সারির তাবিয়ী) দেখেছি, তাঁরা বিতরসহ তেইশ রাকাআত পড়তেন। মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা; হাদীস ৭৬৮৮

আর আতা বিন আবি রাবাহ রাযি. তো নিজেই বলেছেন, আমি দুই শত জন সাহাবীর সাক্ষাৎ লাভ করেছি। তাহযীবুল কামাল ১৩/৪৯

১৪. ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন, এটা প্রমাণিত, উবাই বিন কা‘ব রাযি. রমাযান মাসের তারাবীহতে লোকদের নিয়ে বিশ রাকাআত পড়তেন এবং তিন রাকাআত বিতর পড়তেন। তাই বহু আলেমের সিদ্ধান্ত, এটিই সুন্নত। কারণ উবাই বিন কা‘ব রাযি. মুহাজির এবং আনসার সাহাবীদের উপস্থিতিতেই বিশ রাকাআত পড়িয়েছেন। এবং তাতে কেউ কোনো ধরণের আপত্তি তোলেনি। ইমাম ইবনে তাইমিয়া, মাজমুউল ফাতাওয়া ২৩/১১২

১৫. ইমাম আবূ ইউসুফ রহ. বলেন, আমি ইমাম আবূ হানীফা রহ. কে তারাবীহ এবং এ বিষয়ে উমর রাযি. এর কর্মপদ্ধতি সম্বন্ধে প্রশ্ন করি। তিনি প্রতি উত্তরে বলেন, তারাবীহ হলো সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ বা গুরুত্বপূর্ণ একটি সুন্নত। উমর রাযি. নিজের পক্ষ থেকে অনুমান করে নির্ধারণ করেননি। এবং তিনি এ ব্যাপারে নতুন কিছু আবিষ্কারও করেননি। তিনি দলীলের ভিত্তিতে এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রাপ্ত কোনো নির্দেশনার ভিত্তিতেই এই আদেশ দান করেছিলেন। তাছাড়া উমর রাযি. যখন এই নিয়ম চালু করেন এবং উবাই বিন কা‘ব রাযি. এর ইমামতিতে লোক সকলকে একত্রিত করেন এবং লোকজনও স্বতঃস্ফূর্তভাবে জামাতবদ্ধ হয়ে এ নামায আদায় করতে থাকেন তখন সাহাবায়ে কেরামের সংখ্যা ছিল প্রচুর। যাদের মধ্যে উসমান, আলী, আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ, আব্বাস, আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস, তালহা, যুবায়ের, মুআজ ও উবাই রাযি. প্রমুখ বড় বড় মুহাজির এবং আনসার সাহাবী বিদ্যমান ছিলেন। তাঁদের কেউ এ ব্যাপারটি প্রত্যাখান করেননি। বরং সবাই তাকে সমর্থন করেছেন, তার সাথে একমত হয়েছেন এবং অন্যদেরকে এ ব্যাপারে আদেশ করেছেন।-আল ইখতিয়ার লি তালীলিল মুখতার, ইমাম আবুল ফজল মাজদুদ্দীন আল মাওসিলী ১/৭০

১৬. বিশিষ্ট তাবিয়ী আবুল আলিয়া রাহ. উবাই বিন কা‘ব রাযি. এর উদ্ধৃতিতে বর্ণনা করেন, উমর রাযি. উবাই বিন কা‘ব রাযি. কে রমযান মাসে লোকদের নিয়ে নামায পড়ার আদেশ করতে গিয়ে বলেন, লোকজন দিনের বেলা রোজা রাখে। কিন্তু রাতের বেলা উত্তমরূপে কুরআন পড়তে পারে না। আপনি যদি তাদের সামনে কুরআন পড়তেন। তখন উবাই বিন কা‘ব রাযি. উত্তরে বলেন, আমীরুল মু‘মিনীন এ বিষয়টি তো আগে ছিল না। উত্তরে তিনি বলেন, তা আমি জানি। তবে এ বিষয়টি সর্বাধিক উত্তম। এরপর উবাই ইবনে কা’ব রাযি. লোকজন নিয়ে বিশ রাকাআত নামায পড়েন।- আলআহাদীসুল মুখতারা, ইমাম জিয়াউদ্দীন মাকদেসী; হাদীস ১১৬১

হাদীসটিতে লক্ষণীয় বিষয় হলো, ছোট ছোট কয়েকটি জামাতকে একত্র করে একজন ইমামের পেছনে একটি বড় সড় জামাআতের রূপদান একটি ব্যবস্থাপনাগত বিষয়। শরয়ী দৃষ্টিকোণ থেকে তা নিষিদ্ধ হওয়ার কথা নয়। বাস্তবে নিষিদ্ধ হওয়ার ব্যাপারে কোনো দলীল প্রমাণও নেই। বরং বিষয়টি শরীয়তের রুচির সাথে বেশ সাযুজ্যপূর্ণ। তথাপি উবাই বিন কা‘ব রাযি. এ ব্যাপারে নিজের সংশয়ের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘এভাবে এক জামাআতে তারাবীহ পড়ার ব্যবস্থা তো আগে ছিল না।’ উমর রাযি. তাকে বিষয়টি বুঝিয়ে দিলে তিনি সম্মত হন। কিন্তু তারাবীহ এর রাকাআত সংখ্যার ব্যাপারে তাকে কিছু বলতে হয়নি। তিনি বিনা দ্বিধায় বিশ রাকাআত তারাবীহ পড়িয়েছেন। এটা কিভাবে সম্ভব হলো? যদি বিশ রাকাআত তারাবীহ এর ব্যাপারে তাঁর কাছে নববী আদর্শ বিদ্যমান না থাকত তাহলে তো তিনি আরো শক্ত করে বলতেন, ‘এ বিষয়টি তো আগে ছিল না।’

১৭. ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমাযান মাসে বিশ রাকাআত তারাবীহ ও বিতর পড়তেন। মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা; হাদীস ৭৬৯২, আস সুনানুল কুবরা, বাইহাকী; হাদীস ৪৭৯৯, আল-মু‘জামুল কাবীর, তাবারানী; হাদীস ১২১০২, মুসনাদে আব্দ ইবনে হুমাইদ; হাদীস ৬৫৩, হাদীসটি ইবনে আব্দুল বার রহ. তার আত-তামহীদ (৮/১১৫) এবং আল-ইসতিজকার (৫/১৫৬) গ্রন্থেও এনেছেন।

অনেক ভাই এ হাদীসটিকে মওজু বলেন। কিন্তু যখন তাদেরকে বলা হয়, হাদীসের কোনো ইমাম কিংবা অন্তত কোনো নির্ভরযোগ্য মুহাদ্দিসের উদ্ধৃতিতে হাদীসটি মওজু বলে প্রমাণ করুন তখন তারা এ ব্যাপারে কোনো উদ্ধৃতি দিতে সক্ষমতা দেখাতে পারেন না। এটা সত্য, কোনো কোনো মুহাদ্দিস হাদীসটির সনদকে জয়ীফ বলেছেন। কারণ হাদীসটির সূত্র পরম্পরায় ইবরাহীম বিন উসমান নামের একজন বর্ণনা কারী রয়েছেন। ইনি জয়ীফ পর্যায়ের রাবী। তবে স্মরণ রাখা প্রয়োজন, অগ্রগণ্য মতানুসারে ইবরাহীম বিন উসমানকে চরম পর্যায়ের যয়ীফ বা মাতরুক-পরিত্যাজ্য বলা যথাযথ নয়। দেখা যেতে পারে আল-কামিল, ইবনে আদী ১/৩৮৯, তাহযীবুত তাহযীব, ইবনে হাজার আসকালানী ১/১৪৪, ই‘লাউস সুনান, যফর আহমদ উসমানী ৭/৮২, রাকাআতে তারাবী, হাবীবুর রহমান আ‘জমী ৬৩, রিসালায়ে তারাবীহ, মাওলানা গোলাম রাসূল (আহলে হাদীস আলেম) ২৪

উপরন্তু মওযু এবং যয়ীফ হাদীসের মাঝে আকাশ জমিন ব্যবধান রয়েছে। মওযু তো হাদীসই নয়। মিথ্যুকেরা একে হাদীস নামে চালিয়ে দেয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করেছে মাত্র। জয়ীফ অর্থ হলো, বিবরণটির সনদে দুর্বলতা রয়েছে। বলা বাহুল্য, সনদের দুর্বলতার কারণে বিবরণটিকে মিথ্যা, ভিত্তিহীন বলে দেয়া যায় না। হাদীস শাস্ত্রের নির্ভরযোগ্য মূলনীতি হলো, যয়ীফ হাদীস দুই শ্রেণীতে বিভক্ত। ১. যয়ীফ সনদে বর্ণিত বর্ণনাটির বক্তব্যও শরীয়তের দৃষ্টিতে আপত্তিজনক। এই বিবরণের অনুকূলে শরয়ী কোনো দলীলের সমর্থন তো নেই-ই; বরং তার বিপরীতে দলীল বিদ্যমান রয়েছে। এ ধরনের যয়ীফ কোনো ক্রমেই আমলযোগ্য নয়। ২. বর্ণনাটি যয়ীফ সনদে বর্ণিত, কিন্তু তার বক্তব্যের সমর্থনে শরীয়তের অন্যান্য দলীল প্রমাণ বিদ্যমান রয়েছে। মুহাক্কিক মুহাদ্দিস ও ফকীহগণের সিদ্ধান্ত হলো, এ ধরনের বর্ণনাকে যয়ীফ বলা হলে তা হবে শুধু সনদের বিবেচনা। অন্যথায় বক্তব্য ও মর্মের বিচারে এটি সহীহ।

আলোচিত হাদীসটি তেমনি একটি বর্ণনা। একে শুধু সনদের বিবেচনায় শুধু দুর্বল বলা যায়; কিন্তু এর বক্তব্যের সমর্থনে ইতিপূর্বে উল্লেখিত পাঁচ ধরনের দলীলের শক্তিশালী সমর্থন বিদ্যমান রয়েছে। হাদীস শাস্ত্রের পরিভাষায় এ ধরনের যয়ীফ হাদীসকে الضعيف المتلقى بالقبول বলা হয়। অর্থাৎ এমন হাদীস যার সনদ যয়ীফ। কিন্তু এর বক্তব্য অনুযায়ী সাহাবা যুগ থেকে গোটা উম্মতের আমল চলে আসছে। এ ধরনের যয়ীফ হাদীস সম্পর্কে উসূলে হাদীসের সিদ্ধান্ত হলো, তা সহীহ এবং দু এক সূত্রে বর্ণিত সাধারণ সহীহ হাদীসের তুলনায় এর মান ও গ্রহণযোগ্যতা বেশি। উসূলে হাদীসের এ নীতি সম্বন্ধে হাজারো উদ্ধৃতি রয়েছে। তন্মধ্য হতে দু একটি উদাহরণস্বরূপ উপস্থাপন করা হলো,

১. ইমাম বদরুদ্দীন যারকাশী রহ. বলেন, যয়ীফ হাদীস যখন ব্যাপকভাবে উম্মাহর (মুহাদ্দিস ও ফকীহগণের) কাছে সমাদৃত হয় তখন সে হাদীস অনুযায়ী আমল করা হবে। এটাই বিশুদ্ধ কথা। এমন কি তখন তা হাদীসে মুতাওয়াতির (বিপুল সংখ্যক সূত্রে বর্ণিত) হাদীসের পর্যায়ে পৌঁছে যায়। আননুকাত আল মুকাদ্দিমাতি ইবনিস সালাহ ১/৩৯০

২. ইমাম ইবনে হাজার আস্কালানী রহ. বলেন, হাদীস গ্রহণযোগ্য হওয়ার একটি নিদর্শন হলো, ইমামগণ সে হাদীসের বক্তব্যের উপর আমল করার ব্যাপারে একমত পোষণ করেছেন। এক্ষেত্রে হাদীসটি গৃহীত হবে। এবং এর উপর আমল করা অপরিহার্য হয়ে পড়বে। উসূলের অনেক ইমাম এ মূলনীতিটি উল্লেখ করেছেন। আননুকাত আলা কিতাবি ইবনিস সালাহ ১/১১৯

অনেক ভাই তাহাজ্জুদ বিষয়ক একটি সহীহ হাদীসকে আট রাকাআত তারাবীহ এর সপক্ষে ব্যবহার করে থাকেন। আর এ প্রয়োগকে বৈধতা দেয়ার জন্য বলে থাকেন তারাবীহ ও তাহাজ্জুদ এক নামাযেরই দুই নাম। যে নামায এগারো মাস তাহাজ্জুদ থাকে তা রমাযানে এসে তারাবীহ হয়ে যায়। তাদেরকে যখন বিনীত সুরে বলা হয়, তারাবীহ তাহাজ্জুদ এক নামায সহীহ হাদীসের আলোকে প্রমাণ করুন, সাথে সাথে একথাও প্রমাণ করুন তাহাজ্জুদের নামায আট রাকাআতের চেয়ে বেশি পড়া যায় না তখন তাদের পক্ষ থেকে কোনো হাদীসই প্রমাণস্বরূপ উপস্থাপন করা সম্ভব হয় না। অথচ তারা বলে থাকেন, তারাবীহ আট রাকাআতের বেশি পড়া নাজায়েজ বা বিদআত। কিন্তু সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত, তাহাজ্জুদের রাকাআত সংখ্যা নির্ধারিত নয়। দুই রাকাআত করে যত ইচ্ছা পড়তে থাকুন। যখন সুবহে সাদিক হওয়ার আশঙ্কা হবে তখন বিতর পড়ে নিন। হাদীসে এসেছে, তোমরা (তাহাজ্জুদ) ও বিতর পাঁচ রাকাআত পড়, সাত রাকাআত পড়, নয় রাকাআত পড়, এগারো রাকাআত পড় কিংবা তার চেয়ে বেশি পড়। সহীহ ইবনে হিব্বান; হাদীস ২৪২৯, মুস্তাদরাকে হাকেম, হাদীস ১১৭৮

ইমাম যাইনুদ্দীন ইরাকী রহ. প্রমুখ বলেছেন, হাদীসটি সহীহ। নাইলুল আওতার, শাওকানী ৩/৪৩, আত-তালখীসুল হাবীর, ইবনে হাজার আসকালানী ২/১৪

সায়্যিদ সাবেক রাহ. বলেন, এ বিষয়টি বিশুদ্ধভাবে প্রমাণিত, মানুষ উমর, উসমান এবং আলী রাযি. এর যুগে বিশ রাক‘আত নামায পড়তো। এটাই ইমাম আবূ হানীফা, ইমাম আহমদ এবং ইমাম দাউদ অনুসৃত বিরাট সংখ্যক ফিকহবিদদের অভিমত। ইমাম তিরমিযী রহ. বলেন, উমর, আলী এবং অন্যান্য সাহাবায়ে কেরাম থেকে বর্ণিত বিশ রাক‘আতের মতটিই অধিকাংশ উলামায়ে গ্রহণ করেছেন। এটাই ইমাম সুফইয়ান সাওরী ,ইবনুল মুবারক, এবং শাফি রহ. এর অভিমত। এবং তিনি বলেন, আমি মানুষকে মক্কায় এভাবেই বিশ রাক‘আত নামায আদায় করতে দেখেছি। সয়্যিদ সাবিক, ফিকহুস সুন্নাহ ১/২০৪

সা’লাবা ইবনে মালিক রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমাযানের এক রাতে বাহিরে বের হলেন। তখন দেখলেন মসজিদের এক কোণে কিছু মানুষ নামায পড়ছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এরা কি করে? একজন বলল, হে আল্লাহর রাসূল! এসব লোকদের কুরআন মুখস্থ নেই। উবাই ইবনে কা‘ব রাযি. এর কুরআন মুখস্থ আছে। তাই তারা উবাই ইবনে কা’ব এর পেছনে নামায পড়ছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তারা সুন্দর কাজ করছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের এ কাজটিকে অপছন্দ করলেন না। বাইহাকী রহ. এর শাইখ আবূ আব্দুল্লাহ হাকেম নাইসাবুরী রহ. বলেন, এটা হাসান মুরসাল পর্যায়ের হাদীস। সা’লাবা ইবনে আবূ মালিক মদীনর প্রথম শ্রেণীর তাবিয়ী। তবে ইবনে মান্দাহ সা’লাবা ইবনে আবূ মালিককে সাহাবীদের মধ্যে গণ্য করেছেন। বর্ণিত আছে, তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখেছেন।… ইমাম বাইহাকী, সুনানে কুবরা; হাদীস ৪৭৯৪

জহীর আহসান নিমাভী রাহ. হাদীসটি উল্লেখ করে বলেন, ইমাম বাইহাকী রহ. হাদীসটি আলমা’রিফা গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। আর হাদীসটির সনদ জায়্যিদ তথা উত্তম স্তরের। সুনানে আবূ দাউদে আবূ হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত এর সাক্ষ্য হাদীসও রয়েছে (সুনানে আবূ দাউদ, হাদীস ১৩৭৯, সহীহ ইবনে খুযাইমা হাদীস ২২০৮, সহীহ ইবনে হিব্বান ২৫৪১)। তবে তা হাসান পর্যায়ের নয়। হাদীসটির টিকায় হাদীসটির সম্পূর্ণ সনদ উল্লেখ করে নিমাভী রহ. বলেন, যদি আপনি বলেন, সা’লাবা তো ইমাম ইজলী রহ. এর বর্ণনা মতে একজন তাবিয়ী তাহলে আমি বলবো, ইমাম বাইহাকী রহ. হাদীসটি বর্ণনা করে বলেন, ইতিহাস বিশেষজ্ঞ উলামায়ে কেরামের দাবি মতে সা’লাবা ইবনে আবূ মালিক রাযি. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখেছেন। ইমাম যাহাবী রহ. তাজরীদু আসমাইস সাহাবাহ গ্রন্থে বলেন, আবূ ইয়াহইয়া সা’লাবা ইবনে আবূ মালিক কুরাযী বনী কুরাইযা গোত্রের ইমাম ছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর যুগে তিনি জন্ম গ্রহণ করেন। তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে দেখেছেন। এবং তিনি দীর্ঘ দিন জীবিত ছিলেন। আততাহযীব গ্রন্থে ইবনে হাজার আসকালানী রাহ. বলেন, তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে দেখেছেন এবং তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে ও উমর ইবনুল খাত্তাব, জাবির বিন আব্দুল্লাহ, উসমান বিন আফফান ও আব্দুল মালিক বিন মারওয়ান থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন। ইবনে হাজার আসকালানী, তাহযীবুত তাহযীব ১/১৬, ইমাম মিযযী, তাহযীবুল কামাল ৪/৩৯৭, আল্লামা নিমাভী, আসারুস সুনান (টিকা ২৭৩) ২৪৭

পোস্টটি লাইক ও শেয়ার করুন।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

একটি মন্তব্য লিখুনঃ