নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সীরাত অধ্যয়ন : সঠিক ও স্বচ্ছ উৎসের প্রয়োজনীয়তা

মাওলানা ইরফান জিয়া

আমাদের জীবন যাপনের জন্য সর্বোত্তম আদর্শ হচ্ছে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবন। কুরআনে কারীমের ভাষ্যও এটাই। নবীজীর জীবন থেকে আলো গ্রহণ করতে হলে স্বাভাবিকভাবেই আমাদের দ্বারস্থ হতে হয় সীরাত গ্রন্থের। সীরাত পাঠই হলো নবীজীর জীবন ও আদর্শ জানার সহজ ও সুন্দর একটি মাধ্যম।

ইসলামের শুরু সময় থেকে আজ পর্যন্ত পৃথিবীর নানা প্রান্তে বিভিন্ন ভাষায় অসংখ্য সীরাত গ্রন্থ লেখা হয়েছে। হাদীস সংকলনের পাশাপাশি স্বতন্ত্র সীরাত গ্রন্থ লেখার ধারাও শুরু হয়ে গিয়েছিলো হিজরী প্রথম শতকের ভেতরেই। হযরত উরওয়া ইবনে যুবাইর (৯২ হি.), হযরত আবান ইবনে উসমান (১০৫ হি.), হযরত ওয়াহাব ইবনে মুনাব্বিহ (১১০ হি.) প্রমুখ মনীষী ছিলেন একেবারে প্রথম দিককার সীরাতগ্রন্থ প্রণেতা।

পরবর্তীতে ইবনে ইসহাক ও ইবনে হিশামের মতো সীরাত প্রণেতারা এসে এ ধারাটিকে আরো মজবুত করে তোলেন। এরপর হাজার বছরের পথ পাড়ি দিয়ে সীরাত প্রণয়নের ইতিহাসের সাথে যুক্ত হয়েছে আস-সীরাতুল হালাবিয়্যাহ, সীরাতে ইবনু সাইয়িদিন নাস এবং যাদুল মা‘আদের মতো সাবলীল ও চমৎকার সব গ্রন্থ।

ইসলামের ইতিহাসে হাজার বছরেরও অধিককাল ধরে লেখা এসব সীরাতগ্রন্থের ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা করতে গেলে দরকার পড়বে স্বতন্ত্র পুস্তক রচনার। শুধু তালিকা পেশ করলেও সেটা হবে অনেক লম্বা। তবে আমাদের বক্ষ্যমাণ নিবন্ধটি লেখার উদ্দেশ্য সেটা নয়। বরং এ নিবন্ধের লক্ষ্য হচ্ছে সীরাত পাঠের ক্ষেত্রে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের প্রতি পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করা। সীরাত পাঠের আগ্রহের পাশাপাশি এর উৎস সম্পর্কে আমাদের কতটুকু সচেতন হওয়া প্রয়োজন সে ব্যাপারে পাঠককে কিছুটা ধারণা দেওয়া। সচেতনতার অভাবে সীরাত বিষয়ে অবচেতনভাবেই আমাদের মধ্যে কীভাবে প্রবেশ করছে নানা সংশয় ও আপত্তিকর বিষয়- এ লেখাতে সে ধরনের কিছু দৃষ্টান্তও পেশ করা হবে।

উৎসের স্বচ্ছতা

সীরাত বিষয়ক অসংখ্য গ্রন্থের মধ্যে সবি কিন্তু গ্রহণযোগ্য নয়। হাদীসের মধ্যে যেমন বর্ণনাসূত্রের বিচারে গ্রহণযোগ্যতার বিভিন্ন স্তর রয়েছে, তেমনি সীরাত গ্রন্থগুলোর মধ্যেও গ্রহণযোগ্য বর্ণনার পাশাপাশি অসংখ্য পরিত্যাজ্য বর্ণনাও পাওয়া যায়। সীরাতগ্রন্থে উল্লেখ থাকলেও যেগুলোর উপর বিশ্বাস করার বা সেগুলো দিয়ে দলীল উপস্থাপনের কোনো সুযোগ নেই।

এসব পরিত্যাজ্য বর্ণনাগুলো সীরাতগ্রন্থগুলোতে নানা কারণে এসেছে। কোন সীরাত লেখক এসব বর্ণনা এনেছেন নিতান্তই অসতর্কতা বা অজ্ঞাতসারে। কেউবা আবার জেনেশুনেই এসব বর্ণনা একত্র করেছেন। উদ্দেশ্য ছিলো, সীরাত বিষয়ক সবধরনের বর্ণনাকে এক জায়গায় নিয়ে আসা। এদের মধ্যে কেউ তো নিজ কিতাবের গ্রহণযোগ্য আর অগ্রহণযোগ্য বর্ণনার মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি করে দিয়েছেন। আবার কেউ কেউ এর ভার অন্যদের উপর ছেড়ে দিয়েছেন।

সুতরাং সব ধরনের সীরাত গ্রন্থ সবার জন্য উপযোগী হওয়ার স্বাভাবিক সুযোগ আর থাকছে না; বরং অধ্যয়নের আগে জানতে হবে গ্রন্থের গ্রহণযোগ্যতা সম্পর্কে। সেই সাথে লেখকের পরিচয় এবং গ্রন্থটি লেখার ক্ষেত্রে তার উদ্দেশ্য ও মূলনীতি কী ছিলো, তাও জেনে নেওয়া আবশ্যক। এমনকি লেখক যদি কোনো ঐতিহাসিক মুসলিম ব্যক্তিত্ব হোন, তবু তার গ্রন্থ সম্পর্কে অন্যান্য মুসলিম বিশেষজ্ঞদের মতামত জেনেই অধ্যয়ন শুরু করা উচিৎ।

অমুসলিমদের লেখা সীরাত

এ তো গেলো মুসলমান লেখকদের লেখা সীরাত অধ্যয়ন সম্পর্কে সতর্কতা। এর বিপরীতে সীরাত গ্রন্থগুলোর বিরাট একটা অংশের লেখক রয়েছেন অমুসলিম। অমুসলিম লেখকদের সীরাতগ্রন্থগুলোকে সাধারণ দৃষ্টিতে খুব গুরুত্বের সাথে দেখা হয়। এটাকে ইসলামের নবীর মহত্ত্বের দলীল হিসেবে পেশ করা হয়। মুসলিম না হয়েও নবীজীর পক্ষে কলম ধরার বিষয়টাকে বিরাট কিছু ভাবা হয়। স্বাভাবিকভাবে বিষয়টা সত্যিই অবাক করার মতো। মুসলিম না হয়েও কিছু কিছু লেখক নবীজীর ব্যাপারে যতোটা উচ্চ ধারণা পোষণ করতেন সেটা থেকে আমাদেরও শেখার বিষয় আছে।

তবে সকল অমুসলিম লেখকই যদি সীরাত লেখার ক্ষেত্রে শতভাগ সততার আশ্রয় নিতেন তাহলে চিন্তার কিছু ছিলো না। কিন্তু বাস্তবতা হলো তাদের মধ্যে অনেকেই এক্ষেত্রে সততার পরিচয় দিতে পারেননি। কী মূল লেখা কী অনুবাদ- সবক্ষেত্রেই প্রাচ্যবিদ অমুসলিম লেখকদের পক্ষ থেকে অসংখ্য বেইনসাফীর প্রমাণ রয়েছে। স্বীকার করতে দ্বিধা নেই যে, দুয়েক ক্ষেত্রে তাদের পক্ষ থেকে অনিচ্ছাকৃত ভুল হয়ে যাওয়াও বিচিত্র কিছু নয়। তবে জেনে বুঝে অগ্রহণযোগ্য তথ্য বা মতামত নিজ গ্রন্থে এনে কোনো মনগড়া ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাওয়া লেখকের সংখ্যাও কম নয়। দু’জন লেখক ও তাদের লিখিত গ্রন্থ সম্পর্কে সামান্য আলোচনার মাধ্যমে আশা করি বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠবে।

আলফ্রেড গিয়োম ও তার অনূদিত সীরাতে ইবনে হিশাম

অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত হয়েছে সীরাতে ইবনে হিশামের ইংরেজি অনুবাদ। অনুবাদক আলফ্রেড গিয়োম এ কিতাব অনুবাদের ক্ষেত্রে খুবই অবিশ্বস্ততার পরিচয় দিয়েছেন। তার অবিশ্বস্ততার প্রথম প্রমাণ হলো তিনি বইয়ের প্রচ্ছদে ইবনে ইসহাকের নাম উল্লেখ করছেন। অথচ সীরাতে ইবনে ইসহাকের পূর্ণাঙ্গ কোনো পাণ্ডুলিপি বর্তমানে পাওয়াই যায় না। আর ইবনে হিশাম হলেন ইবনে ইসহাকের প্রায় অর্ধ শতাব্দী পরের । ইবনে ইসহাকের কিতাবুস সীরাত কে ইবনে হিশাম সংযোজন ও পরিমার্জন করেছেন। যেটি বর্তমানে সীরাতে ইবনে হিশাম নামে পরিচিত। আলফ্রেড গিয়োম এই কিতাবেরই অনুবাদ করেছেন। তিনি এ ব্যাপারটি গ্রন্থের ভূমিকার মধ্যে স্বীকার করলেও প্রচ্ছদে সরাসরি ইবনে ইসহাকের নাম ব্যবহার করে অবিশ্বস্ততার বীজ বপন করেছেন।

এখানেই শেষ নয়। আলফ্রেড গিয়োম কিতাবটি অনুবাদ করতে গিয়ে অনেক বিষয় সংযোজন করেছেন। এ সংযোজনের ক্ষেত্রেও তিনি বিশ্বস্ততার পরিচয় দিতে পারেননি। উদাহরণ হিসেবে আমরা অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে ২০০৬ সালে ছাপা কপির ৫৫২ নম্বর পৃষ্ঠার একটি উদ্ধৃতি উল্লেখ করতে পারি।

I. I. From Hakim b.`Abbad b. Hanif and other traditionists : Quraysh had put picturers in the Ka’ba including two of Jesus son of Mary and Mary (on both of whom be peace!) 1. Shihab said : Asma’ b. Shaqr said that a woman of Ghassan joined in the pilgrimage of the Arabs and when she saw the picture of Mary in the Ka’ba she said, `My father and my mother be your ransom! You are surely an Arab woman!’ The apostle ordered that the pictures should be erased except those of Jesus and Mary.

‘এই বর্ণনায় দেখা যাচ্ছে, কুরাইশরা কা’বা গৃহে স্থাপিত অন্যান্য ছবির সাথে মারইয়াম এবং ঈসা আ. -এর দু’টি ছবিও স্থাপন করেছিলো। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মারাইয়াম আ. এবং ঈসা আ. -এর ছবি ছাড়া অন্য ছবিগুলো মুছে দিতে বলেছেন।’

আলফ্রেড গিয়োম -এর উদ্ধৃত এই বক্তব্য মানতে গেলে ছবিকে এক প্রকার বৈধতা দেওয়া হয়। এবং সেটা খোদ কা’বার অভ্যন্তরে। অথচ ছবি, মূর্তি এবং এ জাতীয় অন্যান্য বিষয়ে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি খুবই স্পষ্ট। তাই এ বর্ণনা চূড়ান্ত পর্যায়ের বিশ্লেষণের দাবী রাখে। তবে সেই বিশ্লেষণের আগে আমরা ছবির ব্যপারে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি সংক্ষেপে জেনে নেব।

ইসলামের দৃষ্টিতে ছবি

ইসলামের আগমনই হয়েছে মূর্তি এবং এ জাতীয় সকল কিছু বিনষ্ট করার জন্যে। এ বিষয়ে কিছু বর্ণনা লক্ষ করা যেতে পারে।

১. হযরত আমর ইবনে আবাসা রাযি. থেকে বর্ণিত, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তাআলা আমাকে প্রেরণ করেছেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার, মূর্তিসমূহ ভেঙ্গে ফেলার এবং এক আল্লাহর ইবাদত করার ও তাঁর সঙ্গে অন্য কিছুকে শরীক না করার বিধান দিয়ে।’ (সহীহ মুসলিম; হাদীস ৮৩২)

২. হযরত আবূ হুরাইরা রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

لا تدخل الملائكة بيتا فيه تماثيل أوتصاوير

অর্থ : ফেরেশতারা ওই ঘরে প্রবেশ করেন না যাতে মূর্তি বা ছবি রয়েছে। (সহীহ মুসলিম; হাদীস ২১)

৩. হযরত আবব্দুল্লাহ ইবনে উমর রাযি. থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

إن الذين يصنعون هذه الصور يعذبون يوم القيامة يقال لهم : أحيوا ما خلقتم.

অর্থ : যারা এই সব প্রতিকৃতি প্রস্তুত করে তাদেরকে কিয়ামতের দিন আযাবে নিক্ষেপ করা হবে। তাদেরকে বলা হবে, যা তোমরা সৃষ্টি করেছিলে তাতে প্রাণ সঞ্চার করো। (সহীহ বুখারী; হাদীস ৫৯৫১, সহীহ মুসলিম; হাদীস ২১০৭)

৪. আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি. বলেন-

سمعت محمدا صلى الله عليه وسلم يقول : من صور صورة في الدنيا كلف يوم القيامة أن ينفخ الروح وليس بنافخ.

অর্থ : আমি হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, যে কেউ দুনিয়াতে কোনো প্রতিকৃতি তৈরি করবে তাকে কিয়ামতের দিন বাধ্য করা হবে যেন সে তাতে প্রাণ সঞ্চার করে, অথচ সে তা করতে সক্ষম হবে না। (সহীহ বুখারী; হাদীস ৫৯৬৩, সহীহ মুসলিম; হাদীস ২১১০)

৫. আবূ হুরাইরা রাযি. বলেন-

استأذن جبريل عليه السلام على النبي صلى الله عليه وسلم فقال : كيف أدخل وفي بيتك ستر فيه تصاوير، فإما أن تقطع رؤوسها أو تجعل بساطا يوطأ، فإنا معشر الملائكة لا ندخل بيتا في تصاوير.

অর্থ : একদিন জিবরীল আ. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে আসার অনুমতি চাইলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ভিতরে আসুন। জিব্রীল আ. বললেন, কীভাবে আসব, আপনার গৃহে ছবিযুক্ত পর্দা রয়েছে। আপনি হয় এই ছবিগুলোর মাথা কেটে ফেলুন কিংবা সেটাকে বিছানা বানিয়ে ফেলুন, যা পদদলিত হবে। কেননা, আমরা ফেরেশতারা ওই গৃহে প্রবেশ করি না যাতে ছবি থাকে।’ (সুনানে নাসায়ী; হাদীস ৫৩৬৫, সহীহ ইবনে হিব্বান; হাদীস ৫৮৫৩)

এতো গেলো ছবির ব্যাপারে ইসলাম ও নবীজীর মৌখিক দৃষ্টিভঙ্গি। এরকম আরো অগণন বর্ণনা পেশ করা যাবে। এসব মৌখিক বর্ণনা ছাড়াও আমরা যদি নবীজীর আমল এবং ছবির ব্যাপারে নেওয়া বিভিন্ন সময়ের পদক্ষেপের দিকে তাকাই তাহলেও স্পষ্ট হয়ে যাবে যে ছবির ব্যাপারে ইসলাম কতোটা কঠোর অবস্থানে রয়েছে!

১. হযরত আয়েশা রাযি. থেকে বর্ণিত হাদীসে এসেছে-

لم يكن يترك في بيته شيئا فيه التصاليب إلا نقضه، وفي نسخة : تصاوير

অর্থ : নবীজী তাঁর ঘরে ছবি অঙ্কিত কিছু দেখলে তা বিনষ্ট করে দিতেন। (সহীহ বুখারী; হাদীস ৫৯৫২)

২. আলী ইবনে আবী তালেব রাযি. বলেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি জানাযায় উপস্থিত ছিলেন। তিনি তখন বললেন-

أيكم ينطلق إلى المدينة فلا يدع بها وثنا إلا كسره ولا قبرا إلا سواه، ولا صورة إلا لطخها.

অর্থ : তোমাদের মধ্যে কে আছে, যে মদীনায় যাবে এবং যেখানেই কোনো মূর্তি পাবে তা ভেঙ্গে ফেলবে, যেখানেই কোনো সমাধি-সৌধ পাবে তা ভূমিসাৎ করে দিবে এবং যেখানেই কোনো চিত্র পাবে তা মুছে দিবে? আলী রাযি. এই দায়িত্ব পালন করলেন। ফিরে আসার পর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন-

من عاد لصنعة شيء من هذا فقد كفر بما أنزل على محمد.

অর্থ : যে কেউ পুনরায় ওই সব বস্তু তৈরি করবে সে মুহাম্মাদের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের) প্রতি নাযিলকৃত দীনকে অস্বীকারকারী। (মুসনাদে আহমদ; হাদীস ৬৫৯)

৩. হযরত আয়েশা সিদ্দীকা রাযি. বলেন-

قدم رسول الله عليه وسلم من سفر، وقد سترت سهوة لي بقرام فيه تماثيل، فلما رآه رسول الله صلى الله عليه وسلم هتكه، وقال : أشد الناس عذابا يوم القيامة الذين يضاهون بخلق الله، قالت : فقطعناه فجعلناه وسادة أو وسادتين.

অর্থ : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক সফর থেকে ফিরলেন। আমি কক্ষের দ্বারে একটি পর্দা ঝুলিয়েছিলাম, যাতে ছবি অঙ্কিত ছিল। তিনি তা খুলে ফেললেন এবং বললেন, কিয়ামতের দিন তাদেরকে কঠিন আযাব দেওয়া হবে যারা আল্লাহর সৃষ্টি বৈশিষ্ট্যের সাদৃশ্য গ্রহণ করে।’ উম্মুল মু’মিনীন বলেন, তখন আমরা তা কেটে ফেললাম এবং একটি বা দু’টি বালিশ বানালাম। (সহীহ বুখারী; হাদীস ৫৯৫৪, সহীহ মুসলিম; হাদীস ২১০৭)

নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস এবং তার পদক্ষেপ দুটো থেকেই স্পষ্ট যে, প্রাণীর প্রতিকৃতি প্রস্তুত করা এবং এর মর্যাদাপূর্ণ ব্যবহার সবই শরীয়তে নিষিদ্ধ ও হারাম। এ প্রসঙ্গে যে হাদীসগুলো এসেছে তা অকাট্য ও মুতাওয়াতির। ইসলামের সূচনা থেকে আজ পর্যন্ত এ বিষয়ে গোটা মুসলিম উম্মাহর মাঝে ঐকমত্য রয়েছে।

আলফ্রেড গিয়োমের উদ্ধৃতির বিশ্লেষণ

এবার আসি এ বিষয়ে আলফ্রেড গিয়োম যে উদ্ধৃতিটি দিয়েছেন তার বিশ্লেষণে। আমরা এ বর্ণনাটির ব্যাপারে ধারাবাহিকভাবে কয়েকটি কথা আরজ করছি।

এক.

প্রথম কথা হলো, এ বর্ণনাটি সীরাতে ইবনে ইসহাকে নেই। আলফ্রেড গিয়োম এটি এনেছেন আযরাকীকৃত ‘আখবারু মক্কা’ নামক গ্রন্থ থেকে। আযরাকী নিজেও কিন্তু একথা বলেননি যে, এই বর্ণনা সীরাতে ইবনে ইসহাকে রয়েছে। হ্যাঁ, আযরাকীর সনদে ইবনে ইসহাক একজন বর্ণনাকারী হিসেবে রয়েছেন।

দুই.

আযরাকী ইবনে ইসহাকের ছাত্র ছিলেন না; বরং তার অনেক পরের ছিলেন। আযরাকী সম্পর্কে অনেক অনুসন্ধান করেও তার সম্পর্কে আলোচনা খুব অল্প গ্রন্থেই পাওয়া যায়। তদুপরি যারা তার সম্পর্কে লিখেছেন তারা তার সততা ও সত্যবাদিতা এবং তার স্মৃতিশক্তি ও ধীশক্তি সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ ইমামদের কোনো মন্তব্য আনতে সক্ষম হননি। এজন্য খোদ আযরাকীর সততা ও বিশ্বস্ততাই অজ্ঞাত।

তিন.

আযরাকী ইবনে ইসহাকের উদ্ধৃতি দিয়েছেন। ইবনে ইসহাক এই বর্ণনার কিছু অংশ হাকীম ইবনে আব্বাদ ইবনে হানীফ ও জনৈক অজ্ঞাত ব্যক্তির উদ্ধৃতিতে বর্ণনা করেছেন, আর কিছু কথা ইবনে শিহাবের উদ্ধৃতিতে। ইবনে শিহাব সম্পর্কে দাবি করা হয়েছে যে, তিনি কিছু কথা আসমা বিনতে শাকার এর উদ্ধৃতিতে বর্ণনা করেছেন এবং কিছু কথা উদ্ধৃতি ছাড়া।

চার.

সনদে একটি নাম আসমা বিনতে শাকার। তিনি অজ্ঞাতপরিচয়। আসমাউর রিজালের গ্রন্থে তার নাম পাওয়া যায় না। তদুপরি কোন সূত্রে সে গাসসানের ওই আগন্তুক মহিলার কথা জানতে পেরেছে তারও কোনো উল্লেখ নেই। ইবনে ইসহাককে স্বয়ং ইবনে শিহাব এই তথ্য দিয়েছেন, এটা তিনি বলেননি। যদি ভিন্ন কোনো সূত্রে ইবনে শিহাবের বর্ণনা তিনি পেয়ে থাকেন তবে সেই মাঝের সূত্রটি কে, তা ইবনে ইসহাক উল্লেখ করেননি।

মোটকথা, সনদে যেমন শূন্যতা ও বিচ্ছিন্নতা রয়েছে তদ্রূপ উল্লিখিত রাবীদের পরিচয়ও অজ্ঞাত। এধরনের বিচ্ছিন্ন ও অজ্ঞাত সূত্রে প্রাপ্ত একটি বিবরণ সীরাতে ইবনে হিশামের মধ্যে প্রক্ষেপন করা হয়েছে।

এ বর্ণনার ভিত্তিহীনতা আলফ্রেড গিয়োমের অজানা থাকার কথা না। তার এও অজানা থাকার কথা নয় যে, এটি বিচ্ছিন্ন ও অজ্ঞাত সূত্র সম্বলিত হওয়ার পাশাপাশি ইসলামের অকাট্য ও ঐকমত্যপূর্ণ বক্তব্যের বিরোধী। এরপরও বর্ণনাটিকে সংযুক্ত করার আসল কারণ তো তিনিই ভালো বলতে পারতেন। আমাদের জন্য তার এই সংযুক্তিকে উদ্দেশ্যমূলক বলা ছাড়া উপায় নেই। আর সেই উদ্দেশ্যটি হচ্ছে, মুসলমানদের অকাট্য ও ঐকমত্যপূর্ণ একটি বিষয়ে সন্দেহের বীজ বপন করা।

সত্যি কথা বলতে কি, তিনি তার এই উদ্দেশ্যে অনেকাংশেই সফল। আলফ্রেড গিয়োম কৃত সীরাতে ইবনে হিশামের অনুবাদ থেকে মারইয়াম ও ঈসা আ. -এর ছবি সম্পর্কিত এ বর্ণনাটি মুসলিম অমুসলিম অনেক লেখকই পেশ করছেন। উদ্দেশ্য, ছবিকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা। ২০০৮ সালে এয়ারপোর্টের কাছাকাছি হাজী ক্যাম্পের সামনে স্থাপিত ভাস্কর্যকে বৈধতা দেওয়ার জন্যে এ বর্ণনাটিকেও অবলম্বন করা হয়েছিলো।

আলফ্রেড গিয়োমের ছড়িয়ে দেওয়া এই বিপদ বাংলা ভাষাতেও সংক্রমিত হয়েছে। শহীদ আখন্দ কর্তৃক সীরাতে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নামে অনূদিত হয়ে এটি প্রথমা প্রকাশনী থেকে প্রকাশ পেয়েছে। যেখানে খোদ সীরাতে ইবনে ইসহাকের ব্যাপারেই বিশেষজ্ঞদের অভিমত হলো,

এটি সীরাতের কিতাব হিসেবে মোটামুটিভাবে নির্ভরযোগ্য হলেও এতে বেশ কিছু মুনকার বিষয়ও বিদ্যমান রয়েছে। (মীযানুল ই’তিদাল ৩/৪৬৯)

সেখানে বাংলাতে সীরাতে ইবনে ইসহাকের নামে আলফ্রেড গিয়োমের এই সংকলন প্রকাশ পাওয়াটা কতটা শঙ্কার বিষয় তা সহজেই অনুমেয়।

সীরাতে ইবনে ইসহাক বিশ্বব্যাপী পঠিত ও সমাদৃত একটি গ্রন্থ। কিন্তু বাংলাতে সেটির অনুবাদ আলফ্রেড গিয়োম কৃত ইংরেজি অনুবাদ থেকে করে পাঠককে কতটা ধোঁকায় ফেলা হচ্ছে তা এতক্ষণে সবার বুঝে ফেলার কথা। সীরাতে ইবনে ইসহাকের নামে পাঠক পাচ্ছেন আলফ্রেড গিয়োমের স্বেচ্ছাচারযুক্ত একটি সংকলন। সীরাত অধ্যয়নের ক্ষেত্রে উৎস সম্পর্কে সতর্কতা না থাকায় এর মাধ্যমে বাংলাভাষী পাঠকের মধ্যে নানা রকম সন্দেহ, সংশয় ও অগ্রহণযোগ্য বিষয় প্রবেশ করার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে।

মুহাম্মাদ : আ বায়োগ্রাফি অব দ্য প্রফেট

এ ধরনের আরেকটি গ্রন্থ হলো, ক্যারেন আর্মস্ট্রং লিখিত ‘মুহাম্মাদ : আ বায়োগ্রাফি অব দ্য প্রফেট’। বাংলায় এটি শওকত হোসেন কর্তৃক ‘মুহাম্মাদ : মহানবীর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) জীবনী’ নামে অনূদিত হয়ে সন্দেশ প্রকাশনী থেকে বের হয়েছে। এ বইটির ব্যাপারে আলোচনা শুরু করার আগে বইটির ভূমিকা থেকে কয়েকটি উদ্ধৃতি উল্লেখ করা হচ্ছে।

‘আমরা যখন বিংশ শতাব্দীর শেষ প্রান্তে এগিয়ে যাচ্ছি ঠিক সে সময় ধর্মবিশ্বাস আবার এক শক্তিশালী বিষয় বলে পরিগণিত হচ্ছে। … সোভিয়েত ইউনিয়নে বেশ কয়েক দশকব্যাপী রাষ্ট্রীয় নাস্তিকতার পর্যায় অতিক্রম করার পর সেখানকার নারী পুরুষ এখন ধর্ম অনুসরণের অধিকার দাবী করছে। পশ্চিমা বিশ্বে, যেখানকার জনগণ এতদিন যাবত প্রচলিত বিশ্বাস ও ধর্মানুসরণে খুব একটা আগ্রহী ছিলো না, তারাও ইদানীং আধ্যাত্মিকতা ও অন্তর্গত জীবন সম্পর্কে নতুন করে সচেতন হয়ে উঠছে।’ (পৃষ্ঠা ১১)

‘ইসলাম জন্মগতভাবে ধ্বংসাত্মক বা অন্ধবিশ্বাস, এমনটি ভাবা ঠিক নয়, যেমনটি মাঝে মাঝে বলা হয়ে থাকে। ইসলাম একটি সর্বজনীন (য. প্রা.) ধর্ম বিশ্বাস এবং এর মাঝে উগ্র প্রাচ্যবাদিতা বা পাশ্চাত্য বিরোধিতা বলে কিছু নেই।’ (পৃষ্ঠা ১৪)

লেখকের এ দুটি বক্তব্যের প্রথমটি থেকে মনে হচ্ছে যে, ধর্মীয় বিশ্বাসের বিষয়টি তিনি ইতিবাচকভাবে দেখছেন। দ্বিতীয় বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, তিনি ধর্ম হিসেবে ইসলাম ধর্মের প্রতিও যথেষ্ট শ্রদ্ধাশীল। এ সম্পর্কে তার ধারনাও ইতিবাচক। সুতরাং ভূমিকাটি পাঠ করে একজন পাঠকের জন্য বইটিকে বাহ্যদৃষ্টিতে ইসলাম ও মুসলমানদের পক্ষের মনে করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।

কিন্তু এসব কথার বিপরীতে তার এ গ্রন্থে এমন সব কথাই বেশি, যেগুলো ইসলামের মৌলিক বিষয়ে আঘাত করছে। গ্রন্থকার এক্ষেত্রে খুবই চাতুর্যের সাহায্য নিয়েছেন। তিনি সরাসরি আক্রমণ না করে যুক্তি ও ইনসাফপূর্ণ সরল মন্তব্যের পোষাকে সন্দেহের বীজগুলোকে পাঠকের মনে ঢুকিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। কয়েকটি উদাহরণ থেকে বিষয়টা স্পষ্ট হয়ে উঠবে।

১. ওহীর স্বরূপ বিকৃতি

গারে হেরায় নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রথম ওহী প্রাপ্তির ঘটনা উল্লেখ করে লেখক বলেছেন,

‘এই অভিজ্ঞতার প্রকৃতি বোঝার জন্যে আমাদের একটু বিরতি দিতে হবে। আমরা এখন আর এ ধরনের সকল অভিজ্ঞতাকে সরাসরি হিস্টেরিয়া বা ভুল বিশ্বাস বলে বাতিল করে দিই না। সকল ধর্মীয় সংস্কৃতিতেই অনুপ্রেরণাকে শুভ ক্ষমতা হিসেবে দেখা হয়- শিল্প ও ধর্মীয় উভয় দিক থেকেই। কবিতা বা বাণী যেন এর রচয়িতার সঙ্গে আদেশের সুরে কথা বলে এবং নিজের স্বাতন্ত্র্য ঘোষণা করে। বরাবর একজন সৃজনশীল চিন্তাবিদ এও অনুভব করেন যে তিনি এভাবে অনুপ্রাণিত হয়েছেন : তিনি কোনোও না কোনোওভাবে এক অনির্মিত বাস্তবতাকে স্পর্শ বা আবিস্কার করেছেন যার স্বাধীন অস্তিত্ব রয়েছে। এর সবচেয়ে বিখ্যাত উদাহরণ আর্কিমিডিস, তাঁর সুবিখ্যাত সূত্র আবিষ্কারের পর ‘ইউরেকা! আমি পেয়ে গেছি!’ বলে চৌবাচ্চা থেকে লাফিয়ে উঠেছিলেন তিনি।’ (পৃষ্ঠা ৯৭)

ওহী প্রাপ্তির বিষয়ে লেখকের উপর্যুক্ত বক্তব্যের দিকে যদি তাকাই, তাহলে দেখব লেখক প্রথমে একথা বললেন যে- ‘আমরা এখন আর এধরনের সকল অভিজ্ঞতাকে সরাসরি হিস্টেরিয়া বা ভুল বিশ্বাস বলে বাতিল করে দিই না।’ একথা দ্বারা মূলত লেখক নিজেকে প্রথমে একজন পক্ষপাতমুক্ত মানুষ হিসেবে প্রমাণ করতে চেয়েছেন। এরপরই শুরু করেছেন ওহীর স্বরূপ বিকৃতির ধারাবাহিক প্রচেষ্টা। পরবর্তী বাক্যগুলো লক্ষ করুন।

‘সকল ধর্মীয় সংস্কৃতিতেই অনুপ্রেরণাকে শুভ ক্ষমতা হিসেবে দেখা হয়- শিল্প ও ধর্মীয় উভয় দিক থেকেই।’

লেখকের এই কথার মানে হলো, ওহী নবীজীর উপর আল্লাহর পক্ষ থেকে আসতো না। বরং এটা ছিলো তার ভেতরকার একটি শুভ অনুপ্রেরণা। লেখকের পরবর্তী কথা লক্ষ করুন। ‘কবিতা বা বাণী যেন এর রচয়িতার সঙ্গে আদেশের সুরে কথা বলে এবং নিজের স্বাতন্ত্র্য ঘোষণা করে।’ এখানে ওহী প্রেরণকারী বা প্রত্যাদেশকারী হিসেবে স্বয়ং কবিতা এবং বাণীকেই সাব্যস্ত করা হচ্ছে।

সবশেষে লেখক ওহীকে আর্কিমিডিসের সূত্র পাওয়ার সাথে তুলনা করছেন। ‘এর সবচেয়ে বিখ্যাত উদাহরণ আর্কিমিডিস, তাঁর সুবিখ্যাত সূত্র আবিষ্কারের পর ‘ইউরেকা! আমি পেয়ে গেছি!’ বলে চৌবাচ্চা থেকে লাফিয়ে উঠেছিলেন তিনি।’

এধরনের বক্তব্যের মাধ্যমে আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দার প্রতি প্রত্যাদেশ হওয়ার সম্ভাব্যতাকে অস্বীকার করা হয়েছে। তার দাবী অনুযায়ী শুধু আমাদের নবীজীর ওহী কেনো, সকল নবীর ওহীই ছিলো তাদের ভেতরকার শুভ অনুপ্রেরণা থেকে উদ্ভূত! কেউ কেউ হয়তো ভাববেন, লেখক আসলে এমন একটা ব্যাখ্যা পেশ করেছেন যেটা সাধারণভাবে সকলের কাছে গ্রাহ্য হবে। আস্তিক-নাস্তিক সবার কাছেই কথাটা গ্রহণযোগ্য হবে। সে হিসেবে তো কথাটা ঠিকই আছে।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, এ ধরনের একটা দাবী ধর্মের ভিত্তিকে সম্পূর্ণ নড়বড়ে করে দেয়। অনুপ্রেরণা যতোই শুভ হোক না কেনো, সেটা যদি সরাসরি আল্লাহর পক্ষ থেকে না হয় তাহলে সেটাকে ধর্ম বলে প্রকাশ করাটা কতটুকু যুক্তিযুক্ত। এরকম শুভ অনুপ্রেরণা তো সকল মানুষের ভেতরই উদয় হওয়া সম্ভব। সবার ভাবনাকেই কি তাহলে আলাদা আলাদা ধর্ম বলে স্বীকৃতি দেওয়া হবে? লেখক আর্কিমিডিসের যেই বিখ্যাত উদাহরণ পেশ করেছেন সেটাকেও তো তাহলে একটা ধর্মীয় আবরণ দেওয়া সম্ভব। লেখক ওহীর উৎস হিসেবে অনুপ্রেরণাকে সাব্যস্ত করে হয়তো ভাবছেন, এতে করে মানুষের কাছে ওহীর বিষয়টা হৃদয়গ্রাহ্য হবে এবং মানুষ খুব সহজেই ওহীকে মেনে নেবে। কিন্তু তার সামনে কি এটা লক্ষ করার মতো মেধা ছিলো না যে, এতে করে তিনি যেই ধর্মীয় বিশ্বাসকে প্রমাণিত করতে চাইছেন তার মৌলিকত্বই নষ্ট হয়ে যায়! ক্যারেন আর্মস্ট্রংয়ের বাহ্যিক জ্ঞান ও কাজের পরিধি দেখে তো এটা মনে না করে উপায় নেই যে, তিনি এসব বিষয় বুঝেও ইচ্ছাকৃতভাবেই নতুন কোনো বিতর্কের জন্ম দেওয়ার জন্য এমন অযৌক্তিক কথার অবতারণা করেছেন।

এর বিপরীতে লেখকের নিজেরেই আরেকটি বক্তব্য লক্ষ করুন-

‘মুহাম্মদের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আধ্যাত্মিক প্রতিভা দেখে কেবল চমকিত হতে হয়, তাঁর সঙ্গে ধর্মাচারী ইহুদী বা ক্রিশ্চানদের কোনও যোগাযোগ ছিলো না এবং এসব আদি প্রত্যাদেশ সংক্রান্ত জ্ঞান ছিলো একেবারে এবং অনিবার্যভাবে প্রাথমিক পর্যায়ের; কিন্তু তিনি একেশ্বরবাদী চেতনার মর্মমূলে পৌঁছতে পেরেছেন।’ (পৃষ্ঠা ১১৩)

দেখুন, লেখক নিজেই বলছেন, নবীজীর সঙ্গে ধর্মাচারী ইহুদী বা ক্রিশ্চানদের কোনও যোগাযোগ ছিলো না। কোনো ধরনের যোগাযোগ ছাড়া এমনকি পূর্ববর্তী ধর্ম সম্পর্কে পূর্ব ধারণা ছাড়া শুধু নিজের অনুপ্রেরণা থেকে নতুন একটা ধর্ম প্রতিষ্ঠা করা কি আদৌ সম্ভব? লেখকের বক্তব্য অনুযায়ীই ইসলামের সাথে অন্যান্য ধর্মগুলোর মৌলিকভাবে মিল আছে। আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রত্যাদেশপ্রাপ্ত না হয়ে শুধু নিজের অনুপ্রেরণার মাধ্যমে আহৃত ধর্ম কিভাবে অন্যান্য ধর্মের সাথে সাযুজ্য লাভ করলো?

আরো কথা আছে। কুরআনে পূর্ববর্তীদের অনেক ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। যেগুলোর বাস্তবতা ঐতিহাসিকভাবেও স্বীকৃত। শুধু নিজের অনুপ্রেরণা থেকে কি এতো নিখুঁত ইতিহাস বর্ণনা সম্ভব? শুধু ইতিহাসের বিষয়ই নয়, নবীজী ভবিষ্যতের অনেক কথাও বলেছেন। যেগুলো পরবর্তীতে শতভাগ বাস্তবায়িত হয়েছে। মক্কা বিজয়ের কথাই ধরি। হুদাইবিয়ার সন্ধির পর সূরা ফাতহে বলা হলো,

لَقَدْ صَدَقَ اللهُ رَسُوْلَهُ الرُّؤْيَا بِالْحَقِّ لَتَدْخُلُنَّ الْمَسْجِدَ الْحَرَامَ اِنْ شَاءَ اللهُ اٰمِنِيْنَ مُحَلِّقِيْنَ رُءُوْسَكُمْ وَمُقَصِّرِيْنَ لَا تَخَافُوْنَ فَعَلِمَ مَا لَمْ تَعْلَمُوْا فَجَعَلَ مِنْ دُوْنِ ذٰلِكَ فَتْحًا قَرِيْبًا.

অর্থ : নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর রাসূলকে স্বপ্নটি যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করে দেখিয়েছেন। আল্লাহর ইচ্ছায় তোমরা অবশ্যই নিরাপদে মসজিদুল হারামে প্রবেশ করবে। তোমাদের কেউ কেউ থাকবে মাথা মুণ্ডানো অবস্থায় আর কেউ থাকবে চুল কর্তিত অবস্থায়। তোমাদের কোনো ভয় থাকবে না। তোমরা যা জানো না আল্লাহ তা জানেন। এছাড়াও তিনি তোমাদের দান করেছেন এক সদ্যবিজয়। (সূরা ফাতহ; আয়াত ২৭)

হুদাইবিয়ার সন্ধির সময়ে মুসলমানদের বাহ্যিক অবস্থা যাদের জানা আছে তাদের কাছে এটা অস্পষ্ট থাকার কথা নয় যে, তখন মুসলমানদের বাহ্যিক শক্তি-সামর্থ্য ও লোকবল হিসেবে নিজের পক্ষ থেকে এমন একটা ভবিষ্যত বাণী করা শুধু ঝুঁকিপূর্ণই নয়, ছিলো দূরদর্শীতারও বিপরীত। মক্কা বিজয়ের ঘোষণা শুধু মক্কার লোকদের বিরুদ্ধে ছিলো না। ছিলো সমগ্র আরবের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা। কারণ, কা’বা ঘর শুধু মক্কাবাসীদের জন্য নয়, সমগ্র আরবের জন্যই সম্মানের পাত্র ছিলো। একজন দূরদর্শী মানুষ নিশ্চিত না হয়ে এতো বড়ো ঝুঁকি নিতে পারেন না।

ওহীর উৎসমূল সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলার স্পষ্ট বাণী হলো,

وَمَا يَنْطِقُ عَنِ الْهَوٰى . اِنْ هُوَ اِلَّا وَحْىٌ يُّوْحٰى.

অর্থ : এবং তিনি (নবীজী) প্রবৃত্তি তাড়িত হয়ে কোনো কথা বলেন না। নিশ্চয়ই তিনি যা বলেন তা ওহী- যা তার উপর অবতীর্ণ করা হয়েছে। (সূরা নাজম; আয়াত ৩-৪)

অন্য আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

وَكَذٰلِكَ اَوْحَيْنَا اِلَيْكَ رُوْحًا مِّنْ اَمْرِنَا مَا كُنْتَ تَدْرِىْ مَا الْكِتَابُ وَلَا الْاِيْمَانُ وَلٰكِنْ جَعَلْنَاهُ نُوْرًا نَّهْدِىْ بِه مَنْ نَّشَاءُ مِنْ عِبَادِنَا وَاِنَّكَ لَتَهْدِىْ اِلٰى صِرَاطٍ مُّسْتَقِيْمٍ.

অর্থ : আর এইভাবে আমি আপনার প্রতি ওহী করেছি রূহ (কুরআন) আমার নির্দেশে; আপনি তো জানতেন না কিতাব কী ও ঈমান কী। পক্ষান্তরে আমি একে করেছি আলো, যা দ্বারা আমি আমার বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা হিদায়াত দান করি। আর আপনি অবশ্যই সরল-সঠিক পথে মানুষকে আহ্বান করতেই থাকবেন। (সূরা শূরা; আয়াত ৫২)

এ আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা আরো স্পষ্ট করে বলছেন, ওহী সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর নির্দেশনাধীন। নবীজীকে প্রদত্ত কিতাব ও ঈমান সম্পর্কিত সবটুকু জ্ঞানই এসেছে আল্লাহর পক্ষ থেকে।

লেখক একদিকে নবীজীর ভেতরের অনুপ্রেরণাকে ওহীর উৎস সাব্যস্ত করেছেন। অন্যদিকে ওহীর পক্ষে সাফাই গেয়েছেন বলে দাবী করছেন। তিনি বলছেন, ‘এ ধরনের সকল অভিজ্ঞতাকে সরাসরি হিস্টেরিয়া বা ভুল বিশ্বাস বলে বাতিল করে দিই না।’ কিন্তু প্রশ্ন হলো, এ সকল আয়াতও তো নবীজীর ওহী ছিলো। কুরআনে কারীমের এ সকল আয়াতে তো লেখকের দাবীর সম্পূর্ণ উল্টো কথা বলা হয়েছে। যদি ওহীকে লেখক বাতিল সাব্যস্ত নাই করেন, তাহলে তাকে এসব আয়াতও মানতে হবে। কারণ, একজন মানুষের কথা মানা হবে আবার অস্বীকার করা হবে এটা তো যৌক্তিক নয়। সে হিসেবে ওহীর উৎস হিসেবে কুরআনের বক্তব্য, নবীজীর বক্তব্যকেই চূড়ান্ত মনে করতে হবে।

আর যদি লেখক বলতে চান যে, মৌলিকভাবে ওহীকে তিনি বাতিল সাব্যস্ত না করলেও ওহীর উৎসের ব্যাপারে তার দাবীই সঠিক। তাহলে দেখা যাচ্ছে, নবীজী এর বিপরীত বলছেন। সে হিসেবে তো নবীজীর সাব্যস্ত করা উৎস ভুল ছিলো (নাউযুবিল্লাহ)। তাহলেতো নবীজী আর অনুসরণযোগ্য থাকছেন না। কারণ, নতুন একটি ধর্ম নিয়ে আগমনকারী একজন মানুষ যদি ওহীর মতো মৌলিক একটি বিষয়ের উৎসের ব্যাপারেই ভুল তথ্য দেন তাহলে তিনি আর কিভাবে অনুসরণযোগ্য থাকেন!

২. নবুওয়াতের স্বরূপ বিকৃতি

লেখক বলেন,

‘মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাঁর মিশন শুরু করার জন্যে প্রস্তুত। আপন অভিজ্ঞতার ওপর আস্থা রাখতে শিখেছেন তিনি, এখন তাঁর বিশ্বাস জন্মেছে যে এই বাণী সরাসরি ঈশ্বরের কাছ থেকে আগত। তিনি পথভ্রান্ত কাহিন (ভবিষ্যদ্বক্তা) নন। এই বিশ্বাস স্থাপনের জন্যে সাহস প্রয়োজন, কিন্তু এবার এমন এক পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছেন যার জন্যে দৃঢ় সংকল্পের চেয়েও বাড়তি কিছু প্রয়োজন হবে। তিনি তাঁর অভিজ্ঞতার ব্যাখ্যা হিসেবে ওয়ারাকার মতামতকে গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তাঁকে ‘কুরাইশদের পয়গম্বর’ বলে অভিহিত করা হয়েছে।’ (পৃষ্ঠা ১০২)

লেখক এখানে দাবী করেছেন যে, নবীজী তার দাওয়াতী কাজ শুরু করার ব্যাপারে ওয়ারাকার মতামতকে ব্যাখ্যা হিসেবে গ্রহণ করেছেন। অথচ এই উদ্ধৃতিরই প্রথম দিকে লেখক স্বীকার করছেন যে, ‘প্রাপ্ত বাণী আল্লাহর পক্ষ থেকে হওয়ার ব্যাপারে নবীজীর বিশ্বাস জন্মেছিলো। দৃঢ় সংকল্পও ছিলো।’ তাহলে প্রশ্ন হলো, সে বাণীকে প্রচার করার জন্যে ওয়ারাকার মতামতের কেনোই বা প্রয়োজন পড়লো। আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত বাণী প্রচার করার জন্যে একজন মানুষের শরণাপন্ন হওয়াটা কি বিবেচনাপ্রসূত কোনো কাজ?

নবীজী নিজের নবুওয়াত প্রাপ্তি নিয়ে কখনই সন্দিহান ছিলেন না যে সেই সন্দেহ দূর করার জন্য ওয়ারাকার শরণাপন্ন হতে হবে। নবুওয়াতের বাণী প্রচারের ব্যাপারেও তার নিজের সংকল্পের বাইরে আর কিছু প্রয়োজন ছিলো না। তিনি ওয়ারাকার কাছে গিয়েছেন শুধুই নিজের নবুওয়াত প্রাপ্তির বিষয়টি জানাতে। ওয়ারাকা এ বিষয়ে ইতিবাচক মন্তব্য করেছেন সত্য, কিন্তু নবুওয়াত প্রাপ্তি ও প্রচারের ব্যাপারে তার এ কথাকে সিদ্ধান্ত হিসেবে নেওয়ার কোনো কারণ ছিলো না।

৩. ইসলামের স্বরূপ বিকৃতি

এ গ্রন্থে লেখক এও দাবী করেছেন যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ধর্মটা সারা বিশ্বের জন্য প্রযোজ্য ছিলো না। বরং বিশেষত আরবের জন্য অনুসরণীয় ছিলো। দেখুন- ‘কিন্তু মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কখনও কল্পনা করেননি যে তিনি একটা নতুন বিশ্বধর্ম প্রতিষ্ঠা করছেন। এটা আরবদের ধর্ম হওয়ার কথা ছিল, যারা ইশ্বরের মহাপরিকল্পনার আওতার বাইরে পড়ে গেছে বলে মনে করা হয়েছিলো।’ (পৃষ্ঠা ৯৮)

লেখকের এই দাবী কুরআনের সুস্পষ্ট ঘোষণার বিপরীত। ইরশাদ হয়েছে-

تَبَارَكَ الَّذِىْ نَزَّلَ الْفُرْقَانَ عَلٰى عَبْدِه لِيَكُوْنَ لِلْعَالَمِيْنَ نَذِيْرًا.

অর্থ : মহান ঐ সত্তা যিনি তার বান্দার উপর (হক ও বাতিলের মাঝে পার্থক্য সৃষ্টিকারী) ফুরকান অবতীর্ণ করেছেন। যাতে তিনি বিশ্বজগতের জন্য সতর্ককারী হতে পারেন। (সূরা ফুরকান; আয়াত ১)

সূরা কলমের ৫২ নম্বর আয়াত এবং সূরা তাকবীরের ২৭ নম্বর আয়াতেও একই কথা বলা হয়েছে- ‘কুরআন হলো সারা বিশ্বের জন্য যিকর (উপদেশ)।’

৪. কুরআনের স্বরূপ বিকৃতি

লেখক যেহেতু ইতোপূর্বে ওহীকে আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রত্যাদেশ বলে মানতে চাননি, সে হিসেবে তার মতে তো কুরআনও আল্লাহর কালাম হওয়ার কথা নয়। সেজন্যে খুব স্বাভাবিকভাবেই তিনি কুরআনকে আল্লাহর বাণী হিসেবে স্বীকার করতে চাননি।

কিন্তু বিষয়টা তিনি এতটুকুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেননি, কুরআনের উৎসমূলকে বিকৃত করার পাশাপাশি তিনি কুরআনে বর্ণিত বিষয়াবলীর বাস্তবতাও অস্বীকার করেছেন। দেখুন,

‘কোরানের আলোচনার পুরো ধরনটাই প্রতীকাশ্রয়ী; বারবার এতে মুসলিমদের ভাববার জন্য রাখা অসংখ্য উদহারণের কথা বলা হয়েছে। … কোরানের ধর্মতত্ত্বের রূপকাশ্রয়ী প্রকৃতি প্রায়শই পাশ্চাত্যবাদীরা ভুল বুঝে থাকে… বরং কোরানে বর্ণিত কিছু কিছু বিষয়- পয়গম্বরদের জীবন বা অত্যাসন্ন শেষ বিচার- একেবারেই স্বর্গীয় সত্যের প্রতীকী উপস্থাপন, এগুলোকে আক্ষরিক অর্থে বোঝার চেষ্টা করা উচিৎ নয়।’ (পৃষ্ঠা ১১৩)

লেখক এখানে অন্যান্য পাশ্চাত্যবাদীর ভুল ধরতে গিয়ে নিজেই ভুলে পতিত হয়েছেন এবং অন্যদেরকে ভুল পথে পরিচালিত করছেন। কুরআনের বর্ণনা যদি নিছক প্রতীকীই হয়, বাস্তবতার সাথে এর কোনো সম্পর্কই না থাকে, তাহলে ইহজগত সম্পর্কে কুরআনের অসংখ্য বক্তব্যের কী অর্থ হবে? কুরআনে আছে পাহাড় ও সমুদ্রের কথা। আছে জীব-জন্তুর কথা। আছে আল্লাহ প্রদত্ত বিভিন্ন নিয়ামত, ফলমূল শস্যরাজির কথা- সবই কি প্রতীকাশ্রয়ী। এগুলোকে যদি বাস্তব বর্ণনা বলা হয় তাহলে পয়গম্বরদের জীবন বা শেষ বিচারকে অথবা পরকালের বর্ণনাকে কোন প্রমাণের ভিত্তিতে প্রতীকাশ্রয়ী বক্তব্য বলা হবে? কুরআনে বর্ণিত নবীগণের জীবনীর তো ঐতিহাসিক বাস্তবতাও আছে। এগুলোকে লেখক কিভাবে প্রতীকাশ্রয়ী বলতে পারলেন?

৫. আকিদা ও ইবাদতের ব্যাপারে বিভ্রান্তি

লেখকের দাবী অনুযায়ী সালাত তথা নামায ও কুরআন তিলাওয়াত ইত্যাদি ইসলাম ধর্মের মৌলিক ইবাদত নয়। এগুলোকে অন্য ধর্ম হতে আনা হয়েছে। লক্ষ করুন,

‘এই অনুশীলন সম্ভবত সিরিয় মরুভূমির ক্রিশ্চান মঙ্কদের উপাসনা থেকে গৃহীত, তাঁরা মাঝরাতে উঠে বাইবেলের শ্লোক পাঠ করতেন।’ (পৃষ্ঠা ১১৬)

‘কোরান থেকে এটা মনে হয় যে গোড়ার দিকে সমালোচনার মূল কেন্দ্র ছিলো শেষ বিচারের ধারণা, মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যা ইহুদী-ক্রিশ্চান ঐতিহ্য থেকে গ্রহণ করেছিলেন।’ (পৃষ্ঠা ১২২)

অন্যান্য ধর্মে সালাত বা এ জাতীয় কিছু কিংবা শেষ বিচারের ধারণা কোনো না কোনোভাবে থাকতেই পারে, কিন্তু মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এসকল বিষয় অন্য ধর্ম থেকে এনেছেন, এ দাবী করতে হলে বা ধারণা প্রকাশ করতে হলেও অবশ্যই প্রমাণ পেশ করতে হবে।

এক্ষেত্রে লেখকের নিজের কথাই তার নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষী দিচ্ছে- ‘মুহাম্মদের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আধ্যাত্মিক প্রতিভা দেখে কেবল চমকিত হতে হয়, তাঁর সঙ্গে ধর্মাচারী ইহুদী বা ক্রিশ্চানদের কোনও যোগাযোগ ছিলো না…।’ (পৃষ্ঠা ১১৩)

উপর্যুক্ত বিষয়ের মধ্যে প্রত্যেকটাই এমন ধরনের বিকৃতি যেটা ইসলামের মূলে আঘাত হেনেছে। এ ধরনের মৌলিক বিকৃতি ছাড়াও লেখক নবীজীবনের হিলফুল ফুযূল, বক্ষ বিদারণ, তাঁর স্বপ্ন আরো অনেক বিষয়েই তথ্য বিভ্রাট এবং বিকৃতি ঘটিয়েছেন। লেখার কলেবর বৃদ্ধির আশঙ্কায় সেগুলো উল্লেখ করা হচ্ছে না। ক্যারেন আর্মস্ট্রংয়ের এ বইটি বাংলায় অনুবাদ ও প্রকাশ করে বাংলাভাষী সাধারণ পাঠকদেরকে অনেক বড়ো বিপদে ফেলে দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে অনলাইনে সর্বাধিক পঠিত ও বিক্রিত নবীজীর জীবনী সংক্রান্ত গ্রন্থসমূহের তালিকার প্রথম দিকে রয়েছে এটি। এ থেকেই বোঝা যায় সাধারণ মানুষের মধ্যে কত দ্রুত এ গ্রন্থের বিকৃতিগুলো প্রবেশ করার সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে। আল্লাহ আমাদের হিফাযত করুন। আমীন।

পরিশিষ্ট

আলোচ্য দু’টি গ্রন্থের অবস্থা দেখে পাঠকের নিশ্চয় আর বুঝতে বাকী নেই যে, পক্ষপাতমুক্ততার দাবীদার পাশ্চাত্যের লেখকরা নবীজীর সীরাতের নামে কতটা সুকৌশলে ইসলাম ও নবীজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোতে কালিমা লেপনের চেষ্টা করছে। এক্ষেত্রে তাদের আক্রমণটা সরাসরি আক্রমণের চাইতেও সুগভীর ও মারাত্মক। সেজন্যে এ লেখার পরিসমাপ্তিতে এসে আমরা শুরুর কথাগুলোরই পুনরাবৃত্তি করছি।

সীরাত অধ্যয়ন এবং তা থেকে আলো গ্রহণ অবশ্যই আমাদের জীবনের প্রয়োজনীয় একটি বিষয়। মুসলমানদের জন্য এ ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। তবে অধ্যয়নের আগে অবশ্যই জানতে হবে গ্রন্থের গ্রহণযোগ্যতা সম্পর্কে। সেই সাথে লেখকের পরিচয় এবং গ্রন্থটি লেখার ক্ষেত্রে তার উদ্দেশ্য ও মূলনীতি কী ছিলো- তাও জেনে নেওয়া আবশ্যক। গ্রন্থটি সম্পর্কে গ্রহণযোগ্য মুসলিম বিশেষজ্ঞদের মতামত কী তাও জানতে হবে। অন্যথায় অবচেতনভাবেই আমাদের মধ্যে প্রবেশ করবে ভুল তথ্য, গলত ব্যাখ্যা, নানা সন্দেহ-সংশয়। আমাদের ভেতর সীরাতের আলোর পরিবর্তে প্রবেশ করবে বিকৃতির অন্ধকার। সীরাত পাঠের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজে যেটি কখনই কাম্য হতে পারে না।

তথ্যসূত্র:

১. আল-কুরআনুল কারীম।

২. সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, সুনানে নাসায়ী, সহীহ ইবনে হিব্বান, মুসনাদে আহমদ, মীযানুল ই’তিদাল।

৩. দ্য লাইফ অফ মুহাম্মাদ, আলফ্রেড গিয়োম, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস।

৪. মুহাম্মাদ : মহানবীর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) জীবনী, ক্যারেন আর্মস্ট্রং, অনুবাদ : শওকত হোসেন, সন্দেশ প্রকাশনী, আজিজ সুপার মার্কেট, শাহবাগ, ঢাকা।

৫. মাসিক আলকাউসার, ডিসেম্বর ২০০৮ ঈসায়ী।

৬. “السيرة المطهرة، شبهات وافتراءات” محاضرة حول  মাওলানা যাকারিয়া আব্দুল্লাহ দা.বা., দাওয়াহ বিভাগ, মারকাযুদ দাওয়াহ আল-ইসলামিয়া, শিক্ষাবর্ষ : ২০১৬-১৭।

পোস্টটি লাইক ও শেয়ার করুন।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

2 মন্তব্য আছে “নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সীরাত অধ্যয়ন : সঠিক ও স্বচ্ছ উৎসের প্রয়োজনীয়তা”

একটি মন্তব্য লিখুনঃ

Your email address will not be published. Required fields are marked *