সম্মানিত মাস মুহাররম

মুহাম্মাদ ইরফান জিয়া

যেকোন বিষয়ের সূচনাই জ্ঞানীদের জন্যে খুব গুরুত্বপূর্ণ। পরবর্তী প্রতিটি কাজের সূচনালগ্নেই তারা হিসেব করে নেন যে তার পূর্ববর্তী কাজটা কতটুকু সুন্দর ও যথার্থ হয়েছে। এই হিসেব নিকেশ মানুষকে পূর্বের চাইতে গতিশীল ও কার্যক্ষম করে তোলে।

চান্দ্রসন বা হিজরী সালের চাকা ঘুরে আমাদের সামনে উপস্থিত মুহাররম মাস। হিজরী সনের বারোটি মাসের মধ্যে মুহাররমই প্রথম মাস। সে হিসেবে চান্দ্রবছরের সূচনা বা প্রবেশদ্বার হলো এই মুহাররম মাস।

যেকোন বিষয়ের সূচনার মতো চান্দ্রবছরের সূচনাও আমাদের কাছে সীমাহীন গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে। চলে যাওয়া বছরটা কতটুকু কাজে লেগেছে আর কী পরিমাণ নষ্ট হয়েছে তার চূড়ান্ত হিসেব নেয়ার এটাই সময়। হেলায় হারানো সময়ের জন্যে অনুশোচনা প্রকাশ করে নতুন বছরকে আরো বেশি কাজে লাগানোর মানসিক প্রস্তুতি এ সময় থেকেই গ্রহণ করতে পারলেই চান্দ্রবছরের সূচনালগ্নকে কাজে লাগানো হবে।

মুহাররমের মাহাত্ম্য

মুহাররম আল্লাহ তা‘আলার নিকট অত্যন্ত সম্মানিত একটি মাস। এটি আশহুরে হুরুম বা সম্মানিত চার মাসের অন্তর্ভুক্ত একটি মাস। এ চার মাসের মাহাত্ম্য সম্বন্ধে পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে,

 إِنَّ عِدَّةَ الشُّهُورِ عِنْدَ اللَّهِ اثْنَا عَشَرَ شَهْرًا فِي كِتَابِ اللَّهِ يَوْمَ خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ مِنْهَا أَرْبَعَةٌ حُرُمٌ ذَلِكَ الدِّينُ الْقَيِّمُ فَلَا تَظْلِمُوا فِيهِنَّ أَنْفُسَكُمْ.

‘‘নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে মাসের সংখ্যা বারটি, যা আল্লাহর কিতাব (লওহে মাহফুজ) অনুযায়ী সেদিন থেকে চালু আছে, যেদিন আল্লাহ আকাশমণ্ডল ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছিলেন। এর মধ্যে চারটি মাস মর্যাদাপূর্ণ। এটাই দ্বীন (-এর) প্রতিষ্ঠিত (দাবি)। সুতরাং তোমরা এ মাস সমূহে নিজেদের প্রতি জুলুম করো না।” (সূরা তাওবা, আয়াত: ৩৬)

এ আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা বলছেন, ‘তোমরা এ মাস সমূহে নিজেদের প্রতি জুলুম করো না’ অর্থাৎ এ মাসসমূহে তোমরা কোন অন্যায় ও পাপকাজে লিপ্ত হয়োনা। হলে সেটা হবে নিজেদের উপরই জুলুম করার নামান্তর।

এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো- যদিও বারো মাসের কোন মাসেই পাপাচারে লিপ্ত হওয়া বৈধ নয়; কিন্তু এ চার মাসের সম্মান প্রকাশের জন্যে আল্লাহ তা‘আলা বিশেষভাবে এ মাস সমূহে অন্যায়ে লিপ্ত হতে নিষেধ করেছেন।

আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস (রা:) এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন, আল্লাহ তা‘আলা এই বারো মাসের কোনোটিতেই অন্যায় অপরাধে জড়িত হতে নিষেধ করছেন। এরপর সেগুলোর মধ্য থেকে চারটি মাসকে বিশেষভাবে নির্দিষ্ট করে সেগুলোকে মহা সম্মানে সম্মানিত করেছেন। এসবের মাঝে সংঘটিত অপরাধকে অতি মারাত্মক অপরাধ বলে গণ্য করেছেন। আর তাতে সম্পাদিত নেক আমলকে অন্যান্য মাসের তুলনায় বেশি সাওয়াব যোগ্য আমল বলে সাব্যস্ত করেছেন। (তাফসির ইবন কাসির, সূরা তাওবা, আয়াত: ৩৬)

হযরত আবু বাকরাহ রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,

السنة اثنا عشر شهرا منها أربعة حرم ثلاثة متواليات ذو القعدة وذو الحجة والمحرم ورجب مضر الذي بين جمادى وشعبان .

“বছর হলো বারোটি মাসের সমষ্টি। এর মধ্যে চারটি অতি সম্মানিত। তিনটি পর পর লাগোয়া- জিলকদ, জিলহজ ও মুহররম। (চতুর্থটি হলো) জুমাদাস সানি ও শাবানের মধ্যবর্তী রজব।” (সহীহ বুখারী, হাদীস: ৪১৪৪)

মুহাররম শব্দের অর্থই হলো মহা সম্মানিত। মুহাররমের মর্যাদা এসব আয়াত ও হাদীসের মাধ্যমে প্রমাণিত হওয়ার পাশাপাশি এ মাসের নাম থেকেও এর মর্যাদা ফুটে ওঠে।

মুহাররমের আমল

মুহাররমের মর্যাদার এসব স্পষ্ট বর্ণনার মাধ্যমে এটা নিশ্চয়ই বোঝা গেছে যে, এ মাস চান্দ্রবছরের প্রথম মাস হিসেবে নিছক নববর্ষ হিসেবেই আমাদের মাঝে আগমন করে না; বরং এ মাস মুমিন বান্দাদের জন্যে নতুন বছরের দুয়ার খোলার পাশাপাশি ইবাদতের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত করে দেয়। সে জন্যে এ মাসকে বেশি বেশি ইবাদাতের মাধ্যমে সাজিয়ে তুলতে হবে। হাদীসে এ মাসে কয়েক প্রকার ইবাদতের কথা এসেছে।

  1. বেশি বেশি নফল রোযা রাখা। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করছেন,

أَفْضَلُ الصِّيَامِ، بَعْدَ رَمَضَانَ، شَهْرُ اللهِ الْمُحَرّمُ، وَأَفْضَلُ الصَلَاةِ، بَعْدَ الْفَرِيضَةِ، صَلَاةُ اللَّيْلِ

“রমযানের পর সবচে উত্তম রোযা হল আল্লাহর মাস (মুহাররমের) রোযা। আর ফরয নামাযের পর সবচে উত্তম নামায হল রাতের নামায।” (সহীহ মুসলিম, কিতাবুস সওম, ফাযলু সওমি মুহাররম)

এ হাদীসে রমযানের পর মুহাররমের রোযাকে সবচেয়ে উত্তম বলা হয়েছে। যদিও কিছু হাদীস থেকে এটাও জানা যায় যে, রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম শা’বান মাসে অধিকহারে রোযা রেখেছেন। সেসব হাদীসের সাথে এ হাদীসের আসলে কোন বৈপরিত্ব নেই। কারণ, মর্যাদা ও ফযীলতের বিষয়টি সম্পূর্ণ আল্লাহর করুণার উপর নির্ভরশীল। আল্লাহ যে মাসে চান সে মাসেই ইবাদতের মর্যাদা বাড়িয়ে দিতে পারেন।  এ হাদীসের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো- এতে মুহাররমকে ‘আল্লাহর মাস’ বলা হয়েছে। যদিও সব মাসই আল্লাহর মাস; কিন্তু মুহাররমকে ‘আল্লাহর মাস’ বলে এ মাসের মর্যাদা বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে।

  • বেশি বেশি তাওবা ও ইস্তেগফার করা। মুহাররম মাসে এমন একটি দিন আছে, যেই দিনে আল্লাহ তা‘আলা ইতোপূর্বে অনেক মানুষের তাওবা কবুল করছেন। ভবিষ্যতেও করবেন। (সুনানে তিরমিযী, সওমুল মুহাররম অধ্যায়)

রাব্বুল আলামীন ঘোষিত তাওবা কবুলের দিনটি আশুরার দিন হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও তা নিশ্চিত নয়। সেজন্যে উচিৎ সারামাসই বেশি বেশি তাওবা-ইস্তেগফারে লিপ্ত থাকা। সম্ভব হলে কুরআন-হাদীসে বর্ণিত ইস্তেগফার সম্বলিত দু‘আগুলো পাঠ করতে চেষ্টা করবে। সম্ভব না হলে নিজের ভাষায় ইস্তেগফার করার অবকাশও আছে।

আশুরা প্রসঙ্গ

মুহাররম মাসের দশ তারিখকে বলা হয় আশুরা। এদিনের সাথে ঐতিহাসিক অনেক ঘটনা জড়িত রয়েছে। এদিনে আল্লাহ তা‘আলা বনী ইসরাঈলকে দুশমনদের কবল থেকে বাঁচিয়েছিলেন। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত,

قدم النبي صلى الله عليه و سلم المدينة فرأى اليهود تصوم يوم عاشوراء فقال ( ما هذا ) . قالوا هذا يوم صالح هذا يوم نجى الله نبي إسرائيل من عدوهم فصامه موسى . قال ( فأنا أحق بموسى منكم ) . فصامه وأمر بصيامه

“নবীয়ে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনায় আগমন করে দেখতে পেলেন ইয়াহুদিরা আশুরার দিন রোজা পালন করছে। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এটি কি? তারা বললো, এটি একটি ভাল দিন। এ দিনে আল্লাহ তাআলা বনী ইসরাঈলকে তাদের দুশমনের কবল থেকে বাঁচিয়েছেন। তাই মুসা আ. এদিনে রোজা পালন করেছেন। রাসূলুল্লাহ বললেন, মুসা আ. কে অনুসরণের ব্যাপারে আমি তোমাদের চেয়ে বেশি হকদার। এরপর নবীয়ে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এদিনে রোজা রেখেছেন এবং (অন্যান্য সাহাবায়ে কেরামকে) রোজা রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। (বুখারী: বাবু সিয়ামি ইয়াওমি আশুরা)

মুসনাদে আহমাদের ৮৭১৭ নম্বর হাদীসের বর্ণনা অনুযায়ী নূহ আলাইহিস সালামের কিশতি আশুরার দিন জুদী পাহাড়ে এসে স্থির হয়েছিলো। এর শুকরিয়া স্বরূপ নূহ আলাইহিস সালাম এদিনে রোযা রেখেছিলেন। ইসলামপূর্ব জাহেলী যুগেও লোকদের মাঝে আশুরার রোযা রাখার প্রচলন ছিলো।

আশুরার রোযার ফযীলত

ইসলামী শরীয়তে রমাযানের রোযা ফরয হওয়ার পূর্বে আশুরার রোযা ফরয ছিলো। রমাযানের রোযা ফরয হওয়ার পর এ রোযাকে নফল হিসেবে রাখা হয়। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় হিজরত করার পূর্ব থেকেই এদিনে রোযা রাখতেন। হিজরতের পর সাহাবায়ে কেরামকেও এদিনে রোযা রাখতে উৎসাহিত করেছেন। এদিনে রোযা রাখার ফযীলত সম্পর্কে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহ ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,

صيام يوم عاشوراء أحتسب على الله أن يكفر السنة التى قبله

“আল্লাহর কাছে আমি আশাবাদী যে, তিনি আশুরার রোযার মাধ্যমে বিগত এক বছরের (সগীরা) গোনাহ ক্ষমা করে দিবেন।”

হযরত আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,

ما رأيت النبي صلى الله عليه و سلم يتحرى صيام يوم فضله على غيره إلا هذا اليوم يوم عاشوراء وهذا الشهر يعني شهر رمضان

“আমি নবীয়ে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এই আশুরার দিন এবং (এই) রমাযান মাসের রোযার চেয়ে বেশি আগ্রহী অন্য কোন রোযার প্রতি হতে দেখিনি।” (বুখারী: বাবু সিয়ামি ইয়াওমি আশুরা)

আশুরার রোযা রাখার পদ্ধতি

আশুরার রোযা রাখার উত্তম পদ্ধতি হলো- ১০ ই মুহাররমের আগে অথবা পরে আরো একদিন রোযা রাখা। পাঠক নিশ্চয় ইতোমধ্যে জেনেছেন যে, আশুরার দিনে রোযা রাখাটা ইয়াহুদীদের মধ্যেও প্রচলিত ছিলো। সে কারণে তাদের সাথে ভিন্নতা অবলম্বন ও মুসলিম উম্মাহর স্বাতন্ত্র্য রক্ষার্থে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ আদেশ করেছেন।  হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,

صوموا يوم عاشوراء وخالفوا فيه اليهود وصوموا قبله يوما أو بعده يوما

“তোমরা আশুরার রোযা রাখ এবং এক্ষেত্রে ইহুদীদের সাদৃশ্য ত্যাগ করে আশুরার আগে বা পরে আরো একদিন রোযা রাখ।” (মুসনাদে আহমাদ ১/২৪১)

তবে কারো পক্ষে দু’টি রোযা রাখা সম্ভব না হলে শুধু দশ তারিখে রোযা রাখারও অবকাশ আছে।

আশুরা ও কারবালা

এই আশুরার দিনে তথা মুহাররমের ১০ তারিখে ইরাকের কারবালার ময়দানে ঘটেছিলো হুসাইন রাযি.ও তার পরিবারবর্গের মর্মান্তিক শাহাদাতের ঘটনা। তারা নিজেদের কলিজার তপ্ত খুন দ্বারা অন্যায় ও অসত্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের এক অমর ইতিহাস রচনা করেছেন। এটি আমাদের জন্যে অত্যন্ত হৃদয়বিদারক ও কষ্টের একটি ঘটনা। নববী আদর্শ প্রতিষ্ঠার সবক হিসেবে এই ঘটনা আমাদের সব সময়ই স্মরণ রাখতে হবে। এর পাশাপাশি আমাদের এটাও মনে রাখতে হবে যে, হুসাইন রাযি. –এর শাহাদাতে ব্যথিত হয়ে এমন কোন আচরণ করা কিছুতেই যুক্তিসঙ্গত হবে না; খোদ হুসাইন রাযি.ও নিজের ব্যাপারে এমন হতে দেখলে যেটা পছন্দ করতেন না। সুতরাং এদিনে প্রচলিত তাযিয়া তৈরি ও মিছিল করা, মাতম করা, মুহাররমের খিচুরী রান্না করা –সহ সব ধরণের বিদআত ও কুপ্রথা থেকে আমাদের কঠোরভাবে বেঁচে থাকতে হবে।

পোস্টটি লাইক ও শেয়ার করুন।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

একটি মন্তব্য লিখুনঃ