পাহাড় সাগর ঝর্ণাধারায়…

মাওলানা আবূসাঈদ


প্রতীক্ষা একটি কষ্টবহশব্দ। প্রতীক্ষার গন্ধে অনেক সময় আশপাশের পরিবেশও অস্থির হয়ে ওঠে। তবে প্রতীক্ষার পথযত দীর্ঘ হয় তার অবসানে আনন্দও ততো বেশি হয়। অথবা অপেক্ষিত বস্তু যত প্রিয় ও আনন্দেরহয় তার প্রাপ্তির পথও তত দীর্ঘ হয়। আমাদেরও এক অপেক্ষায় পার হয়েছিল দু-দুটি বছর। বরংদুই বছর গত হয়েছিল আশা-নিরাশা, স্বপ্নের ভাঙা-গড়া ও চড়াই উৎরাইয়ের মধ্য দিয়েই। কথাছিল মা’হাদের উস্তাদ-ছাত্র মিলে শিক্ষা সফরে যাবো। বছরে একবারের এই ইলমী সফর মা’হাদের একটি বৈশিষ্ট্য।

মা’হাদের প্রথম বছর ২০১২ খ্রিস্টাব্দে সফরটি হয়েছিল ঠিকঠাকভাবেই। তবে মা’হাদের দ্বিতীয় বছর শুরু হলো গোলমাল। দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষার পর সফরে যাওয়ার কথা। কিন্তু পরীক্ষার অল্প কিছুদিন আগেও আমাদের মাঝে কোনো ধরনের ইমেজ নেই। কারণ আসাতিযায়ে কেরামের পক্ষ থেকে সফরের কোনো আভাস আসে নি এখনো। হুযূর ক্লাসে আসেন, ক্লাস করান, কিন্তু সফরের কোনো আলোচনা হয় না। কী আর করার, শেষ পর্যন্ত আমরাই বলে ফেললাম,

-হুযূর! সফর কবে হবে?

-রাজনৈতিক আবহাওয়া গরম। আপাতত সফর হচ্ছে না। দু‘আ করতে থাকো, পরিস্থিতি ভালো হলে সামনে কোনো এক সময় যাব।

মুদীর সাহেব হুযূরের সাবলীলভাবে কথাগুলো বলে গেলেন। কথাগুলো সহজ হলেও আপাত দৃষ্টিতে আমাদের জন্য বেশ কঠিন মনে হলো। আমরা কেউই মূলত এর জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। কিন্তু দু‘আ ব্যতিরেকে কিছুই করার নেই। দু‘আই করতে লাগলাম। কিন্তু আল্লাহ তা‘আলার মর্জি না থাকায় কাক্সিক্ষত ‘কোন এক সময়’ ঐ বছর আর আসল না।

মা’হাদের তৃতীয় বছর, আমাদের দ্বিতীয় বছর। দাঙ্গা-হাঙ্গামার মধ্য দিয়েই আমাদের নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হয়েছিল। ইংরেজি নববর্ষও শুরু হলো একইভাবে। ২৫ জানুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণ হলো। বিরোধী দলগুলোর অবস্থান এর বিপক্ষে। কিন্তু নির্বাচন হবেই এবং শেষ পর্যন্ত হলোও তাই। ফলও ঘোষণা করা হলো। তবে ফলের স্বাদটা বিষাদ। ফল যা হবার তাই হলো। ভাবলাম এবার অবস্থা আরো ভয়াবহ হবে। সফর আর হবে না। অবশেষে সফরের আশা ছেড়েই দিলাম। এখন আর সফরের আলোচনা কেউ করে না। আলোচনা করলে কষ্ট হয়। এজন্য প্রকাশ্যে আলোচনাও অঘোষিতভাবে নিষিদ্ধ। তাই মনে মনে ‘মাতা নাসরুল্লাহ’ পড়তে থাকলাম।

দেখতে দেখতে দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষা নিকটবর্তী হলো। এই সেই সময়- যে সময়ে সফরে যাওয়ার কথা ছিল গত বছর। এই বছর অবশ্য কিছু বলা হয় নি। তবুও মনে ক্ষীণ আশা। সেই আশা নিয়ে একদিন মুদীর সাহেব হুযূরকে বলেই ফেললাম। হুযূর! এ বছর কি …? হুযূর আশ্বাস দিলেন। ঘুমন্ত আশা ফের জাগ্রত হলো। নতুন করে অনেক জল্পনা-কল্পনা এবং অনেক পরিকল্পনাও শুরু করতে লাগলাম। আবার অপেক্ষার তসবীহ দানা গুণতে লাগলাম। হঠাৎ একদিন হুযূর আসলেন সফরের সম্ভাব্য তারিখ জানিয়ে দেওয়ার জন্য। যতদূর মনে পড়ে, এপ্রিলের ১৪ তারিখ মঙ্গলবার হবে দিনটি।

সফরের পাঁচ ছয় দিন বাকি। হঠাৎ একদিন মুদীর সাহেব হুযূর সবাইকে একত্রে বসতে বললেন। আমরা সবাই বসে হুযূরের আসার পথ চেয়ে আছি। হুযূর আসলেন, কামরায় প্রবেশ করছেন। কিন্তু সফরের পাঁচ ছয় দিন পূর্বের উৎফুল্ল, উল্লসিত ছাপ হুযূরের চেহারায় প্রতিভাত হচ্ছে না। সবার ভিতর অজানা এক আশঙ্কা। ব্যাপারটা কী! কিন্তু নিরাশ হলাম না। দেখা যাক হুযূর কী বলেন? হুযূর যা বললেন তা শুনে ছাত্র ভাইদের চেহারায় মনে হয় মেঘে ছায়া করল। সফর পিছিয়ে গেল একমাস। দিনটি ছিল ১০ মে শনিবার। কিন্তু সফর পেছানোর যে কারণ হুযূর দর্শালেন তা শুনে মেঘের ছায়া সবার চেহারা থেকে সরে যেতে লাগল। মা’হাদের প্রধান মুফতী, মুফতী ইবরাহীম হাসান সাহেব দা.বা. আমাদের সফরের প্রধান হবেন। আনন্দে ফেটে পড়লাম। আহ্লাদে বিগলিত হলাম। সবচেয়ে বেশি খুশি কে হয়েছে, জানার উপায় নেই। তবে আমি বেশিই খুশি হয়েছিলাম। হুযূর অনেক মাদরাসায় দরস দেন। তাই সবক শেষ না হলে কোথাও যেতে পারেন না। মুদীর সাহেব আমাদের মতামত জানতে চাইলেন। কিন্তু এত সহজে এত বড়ো নেয়ামতের প্রস্তাবে সহাস্যে জী আলহামদুলিল্লাহ বলা ছাড়া আর কোনো মতামত থাকতে পারে না। তবে হুযূরকে বললাম, ভবিষ্যতে রাজনৈতিক অবস্থা তো আরো ঘোলাটে হতে পারে। মুদীর সাহেব হুযূর বললেন, আমিও হুযূরের সামনে এই শঙ্কা প্রকাশ করেছিলাম। হুযূর বলেছেন, ইনশাআল্লাহ কোনো সমস্যা হবে না। আমরা সবাই আশ্বস্ত হলাম। আলহামদুলিল্লাহ কোনো সমস্যা হলোও না। সুবহানাল্লাহ! আল্লাহ ওয়ালাদের এই দৃঢ়তার উৎস তারাই জানেন। আল্লাহ তা‘আলার উপর কতটুকু আস্থা থাকলে এতগুলো মানুষের সফর মুলতবী এবং পরবর্তীতে এর বাস্তবায়নের আশ্বাস দেওয়া যায়Ñ এটা বড়ো চিন্তার বিষয়। হে আল্লাহ! আমাদেরও এই দৃঢ়তা অর্জনের তাওফীক দিয়ে দিন। আমীন।

আরো একমাস অপেক্ষার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করলাম। কিন্তু এবার একমাস পার করতে কয়দিন লেগেছে তা নিশ্চিত করে বলা না গেলেও একমাস যে লেগেছে তা কিন্তু নিশ্চিত বলতে পারি। কারণ যেদিন সফরের তারিখ পরিবর্তন করা হয়েছিল সে দিনই আমাদের প্রবন্ধ লেখার বিষয় নির্ধারণ করা হয়েছিল। যা কিনা বার্ষিক পরীক্ষারই একটি অংশ। প্রবন্ধের চাপে সফরের চিন্তার জন্য আর বেশ একটা ফুরসত মিলল না। তবে মাঝে মধ্যে প্রসঙ্গটা তুলে আনন্দিত হতে আর ভুল হয় না। আবার কখনো কখনো কল্পনার জগতে হারিয়ে যাই অজান্তেই। আর মনে মনে বলি সফর হলে তবে কেমন মজা হবে!

সফরের কয়েকদিন মাত্র বাকি। হুযূর মাঝে মাঝেই আসেন আর বলেন, ১০ তারিখে সফর, আগেভাগে সব প্রস্তুতি সেরে ফেল। ১০ তারিখে আবার রাহমানিয়ার ফারেগীনদের সমন্বয়ে গঠিত ‘রাবেতায়ে আবনায়ে রাহমানিয়া’র দ্বিতীয় বার্ষিক আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠান। সারাদিন রাবেতা’র অনুষ্ঠান শেষে বাদ মাগরিব আবার রাহমানিয়ার খতমে বুখারীর আয়োজন। এবারের অনুষ্ঠানে প্রখ্যাত বুযুর্গ হযরত পাহাড়পুরী হুযূর দা.বা. ও দারুল উলূম দেওবন্দের প্রবীণ মুফতী হযরত ইউসুফ তাওলবী দা.বা.-এর উপস্থিতি, বুখারীর দরস দান ও নসীহতে ধন্য ও সিক্ত হওয়ার সুযোগ রয়েছে।

আনন্দঘন এই দিনের শেষে এক প্রকার অতৃপ্তি নিয়েই ফিরতে হবে আমাদের। কারণ দূর-দূরান্তের বিভিন্ন জেলা থেকে আমাদের অনেক সহপাঠী আসবেন, তাদেরকে বেশি একটা সময় দেওয়ার সুযোগ হবে না। এর সাথে আবার অবসাদ নিয়েই রাতের বেলা রওয়ানা হতে হবে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে। আমাদের এ ইলমী সফর হবে কক্সবাজার, বান্দরবান ও চট্টগ্রামের বড়ো বড়ো মাদরাসা সমূহে।

আজ ১০ মে শনিবার। প্রতিক্ষিত সেই দিন। অন্যান্য দিনের তুলনায় আজকের ঘুম থেকে জাগা একটু অন্যরকম ছিল। দিনের বেলায় রাহমানিয়ার অনুষ্ঠানের আমেজ আর রাতের বেলায় সফরের ইমেজ। সারাদিন কাটল মসজিদুল আবরারের ঝলমলে উদ্ভাসিত অনুষ্ঠানে। মাগরিবের পরে মসজিদুল আবরারে পাহাড়পুরী হুযূর বয়ান করলেন। হুযূরের আবেগপূর্ণ ও দরদমাখা বাণীতে অন্তর প্রশান্ত হলো। চোখের পানির অঝোর ধারা দেখে আমাদের চোখও তার অনুকরণ করতে চাইল। দু‘আ শেষে তড়িঘড়ি করে মা’হাদের উদ্দেশ্যে ছোটাছুটি শুরু হলো। যে যেভাবে পারলাম মা’হাদে পৌঁছলাম। এসেই দেখলাম, আমাদের অগ্রজ মাওলানা ওয়াহিদুজ্জামান ভাইকে। গত বছর এখান থেকে ফারেগ হয়েছেন। সফরে যাওয়ার খুব আগ্রহ। তাই হুযূরদের সাথে বরাবর যোগাযোগ করে আসছিলেন অনেকদিন যাবত। বাগেরহাটের এক মাদরাসায় পাঠদান করেন। সেখান থেকেই এসেছেন। এইমাত্র নাযেমে তা’লীমাত সাহেব হুযূর এসে আমাদের তাড়াতাড়ি প্রস্তুত হতে বললেন। সামানপত্র গোছগাছ করলাম। খাওয়ার তেমন একটা চাহিদা কারো নেই। তবুও সামান্য কিছু খেয়ে নিলাম। কারণ রাতে কখন ক্ষুধা পাবে আর কখন ক্ষুধা নিবারক পাওয়া যাবে তা বলা যায় না।

আমরা মোটামুটি সার্বিকভাবে প্রস্তুত। মুদীর সাহেব আসলেন। প্রথম বর্ষের কামরায় আমাদের সবাইকে একত্রিত করলেন। সফরের উদ্দেশ্য ও আদব আলোচনা করলেন। সবার যাতে গতানুগতিক সফর না হয়; বরং কিছু শেখার আগ্রহ ও মনমানসিকতা নিয়ে সফরে যাই সে ব্যাপারে তারগীব দিলেন। তখন রাত সোয়া নয়টার মতো। আমরা সাড়ে নয়টায় মাদরাসা থেকে বের হলাম। নীচে গাড়ি রাখা ছিল। দুটি গাড়ি। সামনেরটি ঘঙঅঐ সাত ছিটের, পিছনেরটি ঐওঅঈঊ ১০ সিটের গাড়ি। ঐওঅঈঊ গাড়ির ড্রাইভার আমাদের সুপরিচিত হেলাল ভাই। জুব্বা গায়ে পাঁচ কল্লি টুপি মাথায়। মাঝে মাঝেই উলামায়ে কেরামকে নিয়ে দীনী মাহফিলে যান। উলামায়ে কেরামের সোহবতে অনেক তারাক্কী করেছেন। অপর গাড়ির ড্রাইভারের সাথে তুলনা করলে বিষয়টা স্পষ্ট বুঝে আসে। পুরা সফরে আমরা দুই গাড়ির ড্রাইভারের আচরণ তুলনা করার সুযোগ পেয়েছি, আর হেলাল ভাইয়ের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়েছি।

যাহোক, আমরা দ্বিতীয় বর্ষের ছয়জন, অফিস স্টাফ ইউসুফ, বড়ো ভাই ওয়াহিদুজ্জামান এবং মুদীর সাহেব হুযূর মোট নয়জন হেলাল ভাইয়ের গাড়িতে আসন নিলাম। আর মুহাম্মদপুর থেকে আমাদের দুই বুযুর্গ উস্তাদ হযরত মাওলানা আহমাদুল্লাহ সাহেব দা.বা. এবং আমীরে সফর হযরত মুফতী ইবরাহীম হাসান সাহেব দা.বা. আমাদের গাড়িতে উঠবেন। আর অন্য গাড়িতে প্রথম বর্ষের পাঁচজন এবং নাযেমে তা’লীমাত সাহেব উঠলেন। গাড়িতে উঠে আমরা সফরের দু‘আ পড়লাম। গাড়ি ছাড়ল পৌনে দশটার দিকে। সামান্য এগিয়ে গাড়ি চরওয়াশপুর মাদরাসার সামনে থামে। সেখান থেকে চরওয়াশপুর মাদরাসার বড়ো হুযূর মাওলানা জামালুদ্দীন সাহেব উঠলেন। এবার গাড়ি ছুটল রাহমানিয়া মাদরাসার উদ্দেশ্যে। রাহমানিয়ার সামনে গাড়ি থামল, রাত দশটাও বাজল। ভাই আব্দুল হাই গাড়ি থেকে নেমে প্রাণপ্রিয় উস্তাদ হযরত আহমাদুল্লাহ সাহেব হুযূরকে এগিয়ে আনার জন্য গেল। হুযূরও অপেক্ষায় ছিলেন মনে হয়, অল্প বিলম্বে চলে আসলেন। হুযূরের আলো ঝলমল চেহারা দেখে আনন্দে বুক ভরে উঠল। শুধু এখন নয়; সবসময়ই হুযূরের দর্শনে এক আলাদা তৃপ্তি আমার অনুভব হয়। তবে কখনোই পরিপূর্ণ তৃপ্ত হতে পারি না। কিছুটা অতৃপ্তি থেকেই যায়। তার নীরব প্রেমের আধারে হোঁচট খেয়ে আছড়ে পড়ি বারবার। কিন্তু মুখে ব্যক্ত করতে পারি না তার অনেকখানিই। মাঝে মাঝে মন চায় বুক চিরে তার ভালোবাসার অঙ্কিত ছাপ দেখিয়ে দিই। শুনিয়ে দিই হৃদয়পটে তার ভালোবাসার অনুনাদ। কিন্তু তাও পারা যায় না। হুযূরের প্রতি এমন ভালোবাসার দাবিদার আমার মতো আরো অনেকেই। তবে আমি হুযূরকে অধিক ভালোবাসি এই স্বতন্ত্র দাবিতে আমি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি।

হুযূরের কোমল, বিমল, অনাবিল, অনুপমেয় চরিত্র মাধুর্যের কারণে সব ছাত্রের হৃদয়ে হুযূরের প্রতি এক অজানা ভালোবাসা বিদ্যমান। মনে হয় হুযূরের এই অনুপম গুণাবলির কারণে আল্লাহ তা‘আলা তাকে ভালোবাসেন। এজন্য আমরাও তাকে ভালোবাসতে বাধ্য থাকি। হুযূর হযরত মুহাদ্দিস সাহেব হুযূর রহ.-এর দৌহিত্র। সূরতে সীরাতে তিনি তাঁর প্রতিচ্ছবি। আর মুহাদ্দিস সাহেব রহ.-এর ব্যাপারে প্রসিদ্ধ আছে, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতিচ্ছবি ছিলেন।

আহমাদুল্লাহ সাহেব হুযূর আরোহণের পর গাড়ি বাইতুল মুয়াজ্জম মসজিদের দিকে রওয়ানা হলো। আমীরে সফর হযরত মুফতী ইবরাহীম হাসান সাহেব দা.বা. এখান থেকে গাড়িতে উঠবেন। হুযূরের বাসা মসজিদের দ্বিতীয় তলার এক পার্শ্বে। হুযূর নেমে আসলেন। একেবারে চালকের পাশের সিটে বসলেন।

প্রাণপ্রিয় উস্তাদ ও মুরুব্বীদ্বয়কে পেয়ে আমাদের হৃদয় আনন্দে ভরপুর হয়ে গেল। বিশেষ করে আমীরে সফর হযরত ইবরাহীম হাসান সাহেব হুযূরের দীর্ঘ সোহবত এই মনে হয় আমাদের প্রথম নসীব হলো। সফর না হলে এটা হয়ত জীবনে কখনো সম্ভবও হতো না। হুযূরের দীনী ব্যস্ততার কারণে হুযূরের শাগরেদগণ এমনকি ঘনিষ্ঠজনও তার সান্নিধ্যে তৃপ্ত হতে পারেন না। হুযূরের বদান্যতা, নূরানী চেহারা, সুন্নাতী হাসি, শান্ত স্বরে, অমায়িক, হৃদয়গ্রাহী ইখলাসপূর্ণ বয়ানসহ অন্যান্য অপার জ্ঞান গরিমা ও তাকওয়া পরহেযগারীর কারণে অনেকেই প্রথম দর্শনে হুযূরের অনুরক্ত হয়ে যায়। কিন্তু হৃদয় ভরে একান্তে কিছু কথা বলার বা শোনার আগ্রহ রাখেন এমন অনেকেই বঞ্চিত থেকে যান। আর আল্লাহ তা‘আলা আমাদের জন্য তার দীর্ঘ সোহবতের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন, আলহামদুলিল্লাহ। গাড়ির ভিতরে নূরানিয়াত ও রূহানিয়াতের এক পবিত্র আবহ সৃষ্টি হলো। গাড়ি আবার চলতে শুরু করল। আসাদগেট দিয়ে বের হয়ে সোজা দক্ষিণ দিকে ছুটল। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্য দিয়ে ঢুকে পলাশির মোড় দিয়ে গুলিস্তান যাত্রাবাড়ি ফ্লাইওভারে উঠে পড়ল। এই প্রথম গুলিস্তান ফ্লাইওভারের পূর্ণ পরিসীমার পরিভ্রমণ। রাত্রিবেলা ব্রিজের শোভা ছিল চমৎকার। চাদের সাথে লাইট পোস্টের মৃদু আলো আর ডান বামের আলোকিত ঢাকা শহর আমাদের মুগ্ধ করল। হৃদয় গভীরে উথলে উঠল এই আকুতিÑ হে আল্লাহ! এই শহর যেমন আলোয় প্লাবিত, শহরবাসীর হৃদয়ও যেন হয় আলোকস্নাত। ফ্লাইওভার থেকে নেমে আমাদের গাড়ি গন্তব্য পথে ছুটে চলল। কাঁচপুর ব্রিজ পার হওয়ার পর রাস্তার দু’পাশে আঁধার নেমে এল। মাঝে মাঝে ফিলিং স্টেশন, বাজার ইত্যাদির কারণে আলোর কিছুটা দেখা মেলে। আবার তা আঁধারে মিলিয়ে যায়। এভাবে আলো আঁধারির মাঝে দ্রুত বেগে আমাদের গাড়ি চলতে লাগল। চারপাশের কুদরতী দৃশ্যাবলি তেমন দেখা যাচ্ছিল না, তাই চক্ষুদ্বয় বন্ধ করে ঘুমানোর চেষ্টা করলাম।

সুবহে সাদিকের পর আমরা চট্টগ্রাম পৌঁছলাম। চট্টগ্রাম শহর থেকে বের হওয়ার পূর্বেই চারদিক প্রভাতের মোহনীয় আভাসে আলোকিত হয়ে উঠল। মেঘের কারণে চট্টগ্রামের আকাশে জীবনের প্রথম সূর্যোদয় দেখতে না পেলেও ভোরের বিমল আলোয় প্রিয় চট্টগ্রামকে প্রাণ ভরে দেখলাম। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার সড়কের দু’পাশের বৃষ্টিস্নাত সবুজের সমারোহ আমাদেরকে দারুণভাবে মুগ্ধ করল।

ফজরের নামায পড়ার জন্য বহদ্দারহাটে আমাদের গাড়ি থামল। বেশ কিছুক্ষণ ধরে ঝিরঝিরে বৃষ্টি হচ্ছিল। আমরা নামতে নামতে টাপুর টুপুর ফোঁটা পড়তে শুরু করল। বৃষ্টিতে ভিজেই উযূ সারলাম, নামায আদায় করলাম। ফজরের পরের মাসনূন আমলসমূহ করতে করতে আমরা আবার গাড়িতে উঠলাম। এবার গাড়ি ছুটল কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে। ১৫০ কি.মি. পথ। ঘন্টা তিনেক সময় লাগবে। সারারাত কিছু খাওয়া হয় নি। শরীর দুর্বল। মুদীর সাহেব হুযূর বললেন, তোমাদের চোখে হোটেল পড়লে আমাদেরকে বলো, নাশতা করে নেওয়া যাবে। আবার সিদ্ধান্ত হলো, নাশতা কক্সবাজারে গিয়ে হবে। আপাতত পথে কোথাও গাড়ি থামিয়ে রুটি-কলা খেয়ে নেব। পরে তাই হয়েছিল। ভেজা পিচঢালা পথ দিয়ে আমাদের গাড়ি দ্রুতগতিতে ছুটে চলল নীল সাগর অভিমুখে। বেশ কিছুক্ষণ চলার পর মুদীর সাহেব হুযূর বললেন, ঐ যে পাহাড় দেখা যায়। সবাই নড়েচড়ে বসে ডানে বামে পাহাড় খুঁজতে লাগলাম। বহুদূরে আকাশের শেষ সীমায় ধু ধু পাহাড় নজরে আসল। সবুজ চাদর মুড়ি দেওয়া পাহাড়ের উপর ধূসর মেঘ। এই প্রথম পাহাড় দেখলাম। ঘুম চলে গেল এক দৌড়ে পাহাড়ের আড়ালে। পাহাড়ের কাছে না গেলে আর ঘুমের নাগাল পাওয়া যাবে না। গাড়ি ছুটছে পাহাড়ের পথে। রাস্তার দুই পাশে বড়ো বড়ো গাছ প্রাকৃতিক তোরণ সেজেছে। রাস্তা থেকে একটু নীচেই ধানক্ষেত। সদ্য কেটে ফেলা হয়েছে। গ্রামের ছেলেরা টুপি মাথায় আর মেয়েরা ঘোমটা মাথায় মকতবে ছুটছে। দৃশ্যটা অতি পরিচিত, গর্বের এবং আনন্দের। কিছুক্ষণ পরপরই এই দৃশ্যের দেখা মিলল। আমরা প্রকৃতি দেখছি আর আমাদের বুযুর্গদ্বয় প্রকৃতির স্রষ্টার স্মরণে ব্যস্ত। হযরত আমীরে সফর কিতাব মুতালাআ করছিলেন। হযরত আহমাদুল্লাহ সাহেবের পিছনে আমি বসা। হুযূরের চেহারা সরাসরি দেখা যাচ্ছে না। তবে নীরবে থাকলে হুযূর সর্বদা তসবীহ জপতে থাকেন। এখনো হয়তবা তাই করছেন।

কেরানীহাট অতিক্রম করার বেশ খানিক পরে ছোটো ছোটো কিছু পাহাড় আমাদের রাস্তার পাশেই দেখতে পেলাম। আরো একটু পরে আমরা দুই পাশের পাহাড়ের মাঝে আটকে গেলাম। মনে হচ্ছিল পাহাড়গুলো এখনি ভেঙে পড়বে। কোনো কোনো পাহাড়ের অবস্থান আবার রাস্তা থেকে খানিক দূরে। লালচে মাটির পাহাড়। দু-এক খণ্ড পাথরও আছে। বড়ো বড়ো কিছু বৃক্ষের অভিভাবকত্বে ছোটো ছোটো অনেক গাছ গাছালি। লতাগুল্মের ঝোপঝাড়ও মাঝে মাঝে দেখা যায়। সবুজ শ্যামলে সুশোভিত পাহাড়ের দৃশ্য যত দেখি ততই দেখার আগ্রহ বাড়ে। প্রত্যেক দৃষ্টিতে নতুন কিছু খুঁজি আর অজানা নতুনত্ব অনুভব করি। অজানা এক ভালোলাগা আর ভালোবাসায় হারিয়ে যাই। রাতের বৃষ্টিতে সবুজ পাতার ধূলাবালি দূর হয়ে গেছে। ফলে সবুজের ঔজ্জ্বল্য আরো কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ডানদিকের দৃশ্য বেশি মনোহরী না কি বামদিকের তা নিরূপণ করার জন্য বার বার গ্রিবাদেশ পরিবর্তন করতে করতে ঘাড় ব্যথা আর মাথা ঘোরার ফায়দাই হাসিল হলো। কোনোকিছু আর নিরূপণ করা গেল না। কারণ দুই পাশের শোভা ও দীপ্তিই সমান ছিল। আল্লাহ তা‘আলার অপার সৃষ্টির অনিন্দ্য সুন্দর দৃশ্য দেখে হৃদয়ের গভীর থেকে সুবহানাল্লাহ, আল্লাহু আকবার উচ্চারিত হলো অনেক বার। পাহাড়ের পাদদেশে উপত্যকা, পাহাড়ের উপরিভাগে রয়েছে জনবসতি। কিছু কিছু পাকা বাড়ি নজরে আসলেও অধিকাংশই ছিল কাঁচা ও জীর্ণশীর্ণ।

আল্লাহর কুদরতের এই অপরূপ মহিমা দেখতে দেখতে একসময় আমরা কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকতের কাছাকাছি চলে এলাম। কে যেন বলল, ঐ যে সাগর দেখা যায়। মুহূর্তেই সবার দৃষ্টি আছড়ে পড়ল সাগর বক্ষে। নীল জলরাশি ও শুভ্র ফেনা সুস্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। মন চাচ্ছিল এখনই সাগর তীরে ছুটে যাই। মুদীর সাহেব হুযূর আমাদের মনের ভাব বুঝলেন, বললেন, হোটেলে একটু পরে যাব। আগে অল্প সময় সাগর দেখে নিই। রাস্তার শেষ মাথায় গাড়ি থামল। গাড়ি থামতে দেরি, নামতে আর দেরি হলো না। বড়ো বড়ো পা ফেলে সবাই একদম সাগরের তীরে গিয়ে দাঁড়ালাম। সাগরের গর্জন আর ঊর্মিমালার সাথে এই প্রথম পরিচয়। কীভাবে তাকে উপভোগ করতে হয় জানি না। আপাতত শুধু দিগি¦দিক ফ্যালফেলিয়ে তাকিয়ে থেকে অভিভূত হলাম। যতদূর চোখ যায় সেখান থেকেই ঢেউয়ের উৎস দেখা যায়। তবে দূরের ঢেউগুলো সরাসরি কিনারায় আসে না। কিছুদূর এসে নতুন উদ্যমে আবার ফুস করে ওঠে। একসময় কূলে এসে বীরদর্পে আছড়ে পড়ে। যত দেখি দেখার আগ্রহ ততই বাড়ে। একবার চোখের পাতা পুরোপুরি উন্মুক্ত করে চোখ বড়ো করে সাগরের শেষ সীমা দেখার চেষ্টা করলাম। চক্ষুযুগল ব্যর্থ মনোরথ হয়ে আমার দিকেই ফিরল। না কোনো প্রান্তসীমা উদ্ধার হলো না। অবশ্য মাঝে মাঝে জেলেদের মাছ ধরার ছোটো ছোটো নৌকা দেখা গেল। এ কথাই আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কুরআনে এভাবে বর্ণনা করেছেন,

তিনি ঐ সত্তা, যিনি তোমাদের জন্য সাগরকে অধীন করে দিয়েছেন যাতে তোমরা তা থেকে তাজা মাছ ভক্ষণ করতে পার এবং পরিধেয় অলঙ্কার আহরণ করতে পার। আর তুমি তাতে সাগরের বুক চিরে নৌযান চলতে দেখবে এবং যাতে তোমরা আল্লাহর অনুগ্রহ অনুসন্ধান করতে পার এবং আল্লাহর অনুগ্রহ স্বীকার কর। (‘সূরা নাহল’- ১৪)

মুদীর সাহেব হুযূরকে আমাদের মুফতী ইবরাহীম হাসান সাহেব বললেন, এই সমুদ্রের পরে কোন্ দেশ? হুযূর বললেন, এর পরে সোজা পশ্চিমে ভারত আর সোজা দক্ষিণে ভারত মহাসাগর। এখানে আন্দামান দ্বীপপুঞ্জ নামে কিছু দ্বীপ রয়েছে। এর মধ্যে একটি দ্বীপ হলো মাল্টা দ্বীপ। এখানে অল্প হলেও বসতি রয়েছে। এই দ্বীপেই ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের লড়াকু সৈনিক উলামায়ে কেরামকে বন্দি করে রাখা হয়েছিল। এ দ্বীপপুঞ্জের পরে রয়েছে নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ। ভারত মহাসাগরের পর দক্ষিণ মহাসাগর, এরপর রয়েছে অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশ। সোজাসুজি পশ্চিমে বরিশাল, ভোলা, বরগুনা, খুলনা ঘেঁসে ভারত এবং বামে অর্থাৎ দক্ষিণ-পূর্ব কোণ ঘেঁসে মায়ানমারের অবস্থান। মাদরাসায় এসে ম্যাপে সে রকমই দেখলাম।

১৫৫ কি.মি ব্যাপী বিশ্বের সর্ববৃহৎ সমুদ্র সৈকতের কুদরতী সৌন্দর্য দেখার জন্য বিভিন্ন দেশ থেকে অনেক পর্যটকের আগমন ঘটে শীতকালে। তখন বেলাভূমি অনেক বিস্তৃত থাকে। সাগরের মেজাজ থাকে প্রশান্ত। পানিও থাকে স্বচ্ছ। তবে সাগর পাড় তখন পাপাচারে অশান্ত ও বিভৎস হওয়ার কারণে সাগরের আসল শোভায় ভাটা পড়ে। তাই আমাদের সফরটা এখানে যথাসময়েই হয়েছে। সাগর তীরে তিনবার আমাদের সময় কাটানোর সুযোগ হয়েছিল। আলহামদুলিল্লাহ। অযাচিত রূপ কোথাও তেমন চোখে পড়ে নি। এখন সাগর অশান্ত, দুরন্ত, অস্থির ও উন্মাদ। কোনো বাধা মানতে চায় না, সব গ্রাস করে নিতে চায়। সাগরের এই বিমর্ষ ভাবের উৎপাদক হয়ত সাগরের নীচে বিদ্যমান আগুন। সাগরের এই ভয়াবহতা দেখে কিয়ামতের ভয়াবহতাও স্মরণ হয়। কিয়ামতের সময় চন্দ্র-সূর্য নিষ্প্রভ হয়ে সাগরে নিক্ষিপ্ত হবে। মিঠা ও লবণ সাগর একাকার হয়ে যাবে। অতঃপর এক বাতাস বইবে যাতে সাগরে আগুনের সৃষ্টি হবে। আর সাগর জাহান্নামে পরিণত হবে। (মা‘আরিফুল কুরআন [বাংলা], ‘সূরা তাকবীর’, ‘সূরা ইনফিতার’)

কতইনা ভয়াবহ হবে সেই দৃশ্য। হে আল্লাহ! সেই দিন আসার পূর্বে আমাদের সবাইকে প্রস্তুতি নেওয়ার তাওফীক দান করুন। আমীন।

অল্প কিছুক্ষণ সাগর তীরের কুদরতী সৌন্দর্য অবলোকন করে এবং সাগর ছুঁয়ে আসা হিমেল বায়ুতে তনুমন শীতল করে হোটেলের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। তবে অন্তঃকরণ সেই সাগর তীরেই পড়ে রইল।

হযরত আহমাদুল্লাহ সাহেব হুযূরের সাথে আমি হাঁটছি। হুযূর তার চিরাচরিত নিয়মে নিশ্চুপই ছিলেন। আমি হুযূরকে জিজ্ঞাসা করলাম, হুযূর এখানে ইতিপূর্বে কখনো এসেছেন কি না। হুযূর মাথা নেড়ে বললেন,

-না, এই প্রথম। তুমি?

-আমিও নতুন, আগে আসিনি।

এরপর হুযূর আবার নীরব রইলেন। গাড়িতে চড়ে হোটেলের উদ্দেশ্যে চললাম। আমাদের রুম বুকিং দেওয়া হয়েছে হোটেল শামস প্লাজায়। কলাতলী মোড় থেকে উত্তর দিকে রাস্তার ডান পার্শ্বে আধা কি.মি.-এরও কম দূরত্বে হোটেলটির অবস্থান। রাস্তার দু’পাশে অনেক সুরম্য দালান-কোঠা। স্থাপনাগুলো নতুন গড়ে উঠেছে। এগুলোর কারণে সমুদ্র তীর অনেকখানি সংকুচিত হয়ে গেছে। প্রাসাদগুলো প্রযুক্তির গুণে অত্যাধুনিক সাজে সজ্জিত। তবে প্রাসাদের বারান্দায় দাঁড়িয়ে সাগরের অপরূপ কুদরতী শোভার দিকেই দর্শনার্থীরা তাকিয়ে থাকেন। কুদরত এবং কৃত্রিমতার মধ্যকার এই বিস্তর ফারাক সত্যান্বেষী ও জ্ঞানীদের সত্যের সন্ধান দেয়, আরো জ্ঞানী করে তোলে। কৃত্রিম সৃষ্টির সৌন্দর্য শোভা একসময় নিঃশেষ হয়ে যায় এবং পুরনত্বের আবরণে ঢেকে যায়। পক্ষান্তরে কুদরতী সৃষ্টির কান্তি, বাহার ও রূপ-লাবণ্যের শেষ নেই।

শামস প্লাজার সামনে গাড়ি থামল। সাত তলা দালান। মুদীর সাহেব হুযূর নেমে রিসিপশনে গিয়ে কর্তব্যরত ভদ্রলোকের সাথে আলাপ করলেন। অবশ্য হোটেল মালিকের সাথে পূর্বেই তিনি কথা বলে রেখেছিলেন। হোটেল মালিক জনাব শাহীন পারভেজ। ঢাকার শাহজাহানপুর ঝিল মসজিদ এলাকার বাসিন্দা। মুদীর সাহেব হুযূরের তারাবীহর মুসল্লী। ছাত্র যামানায় হুযূর সেখানে তারাবীহর নামায পড়াতেন। সেই থেকে তার সাথে হুযূরের ঘনিষ্ঠতা। আমরা গাড়ি থেকে নেমে রিসিপশনে বসলাম। একটু পর এক ভদ্রলোক আমাদেরকে হোটেলের ভিতরে নিয়ে চললেন। আমরা সফর-সঙ্গী দুই ড্রাইভারসহ মোট বিশজন। তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম তলায় মোট পাঁচটি কামরা আমাদের দেওয়া হলো। পঞ্চম তলায় দুটি কামরা। এক কামরায় আমরা দ্বিতীয় বর্ষের ছয়জন আর অপর কামরায় আমাদের দুই মুরুব্বী উস্তাদ হযরত ইবরাহীম হাসান সাহেব এবং হযরত আহমাদুল্লাহ সাহেব। প্রত্যেক কামরায় দুটি পালঙ্ক। দুই হুযূর দুই পালঙ্কে। আর আমাদের পালঙ্কগুলো বড়ো হওয়ায় প্রত্যেকটিতে তিনজন করে মোট ছয়জনকে থাকতে হবে।

হুযূরদ্বয়ের কামরা গোছগাছ করে আমরা আমাদের কক্ষে প্রবেশ করে প্রয়োজন সেরে বিছানায় গা এলিয়ে শুয়ে পড়লাম। হঠাৎ দরজায় ঠক্ ঠক্ ঠক্। দরজা খুলতেই মুদীর সাহেব হুযূর সালাম দিয়ে বললেন,

-কি তোমরা শুয়ে পড়েছ। নিজেদেরও নাশতার কথা মনে নেই, হুযূরদের কথাও ভুলে গেছ। তাড়াতাড়ি সবাই নীচে এসো। আর হুযূরদের জন্য দুইজন খাদেম এসো।

সবাই নীচে নামলাম। আমি আর মাহমূদ ভাই হুযূরদের নাশতা আনতে গেলাম। আমাদের হোটেলের নীচতলায়ই খাবার ব্যবস্থা। বৈশাখী রেস্তোরা এন্ড রেস্টুরেন্ট। সকালের নাশতা পরটা সবজি। অন্যান্য সঙ্গীরা নাশতা সেরে উপরে চলে গেছে। আমি আর মাহমূদ ভাই হুযূরদের নাশতা করিয়ে নিজেরা করলাম। নাশতা করে যখন ঘুমোতে গিয়েছি ঘড়িতে তখন সময় দশটার উপরে। একটা পর্যন্ত ঘুমালাম। উযূ গোসল সেরে নামাযের জন্য নীচে গেলাম। দ্বিতীয় তলায় ছোট্ট একটি কক্ষের দরজায় লেখা ‘নামাযের স্থান’। ছোট্ট কামরা। একসাথে সবাই নামায পড়া যায় না। একাধিক জামাআত করতে হলো। নামাযান্তে সবাই নীচে আসলাম দুপুরের খাবার খেতে। আমি আর মাহমূদ ভাই মুরুব্বীদ্বয়ের খানা নিয়ে উপরে আসলাম। কোরাল মাছ, সবজি আর ডাল। হুযূর আমাদের বললেন,

-আপনারা যান, খেয়ে নিন, আমরা নিজেরা খেয়ে নিচ্ছি।

আমরা আসতে রাজি হলাম না। কারণ বুযুর্গদের আহার গ্রহণ দেখার মধ্যেও অনেক কিছু শেখার আছে। হুযূরদ্বয় খেতে শুরু করার পূর্বেই তা প্রকাশ পেল। হুযূর আমাদের ক্ষুধাও অনুভব করছিলেন। তাই আমাদের খেয়ে নিতে বললেন। আর বিশেষ করে আহমাদুল্লাহ সাহেব হুযূরের খানা খাওয়া, বিশেষ করে খাওয়ার শেষে খাবারের বরতন পরিষ্কার করে খাওয়ার দৃশ্য অনেক আকর্ষণীয়, দৃষ্টিনন্দন ও শিক্ষণীয়।

সবার খাওয়া দাওয়া শেষ। এখন রওয়ানা হবো হিমছড়ির উদ্দেশ্যে। সবাই প্রস্তুত আমি আর মাহমূদ ভাই ছাড়া। আমাদের খাওয়া হয় নি। খেতে বসে জানা গেল খানাও শেষ। কিছুক্ষণের মধ্যে ধোঁয়া সহকারে গরম ভাত আসল। কোরাল মাছ না কি চিংড়ি কোনটি খাব। কোরাল মাছ ফ্রিজে ভেজে রাখা হয়। কেউ খেতে চাইলে গরম করে পরিবেশন করে। তাই চিংড়ি চাইলাম। কিন্তু চিংড়ির সূরত দেখে আর ভক্তি হলো না। চিংড়ি ফেরত দিয়ে কোরাল চাইলাম। হুযূর জিজ্ঞেস করলেন, চা পান করব কি না। কিন্তু সময়ের অভাবে চা’র আগ্রহ দেখালাম না। দ্রুত গাড়িতে উঠলাম। গাড়ি হিমছড়ির দিকে ছুটল। আর জানালা দিয়ে আসা বাতাসে শরীরও হিম হতে শুরু করল। ছয় সাত কি.মি. পথ। কলাতলী মোড় হয়ে হিমছড়ির রাস্তায় ঢুকতে কত টাকা যেন টোল গুণতে হলো। কলাতলী থেকে সোজা দক্ষিণে হিমছড়ির রাস্তা। সাগর তীরের অদূরেই রাস্তা। পিচঢালা রাস্তার ডানে মাঝারি ধরনের গাছগাছালি সটান দাঁড়িয়ে আছে। তার ফাঁক গলিয়ে সমুদ্রের ঢেউ স্পষ্টই দেখা যায়। আর রাস্তার বাম পার্শ্বে বড়ো ছোটো পাহাড়। চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার আসার পথের পাহাড়গুলো থেকে এই পাহাড়গুলো একটু বিচিত্র ধরনের। এখানের পাহাড়গুলো রাস্তার পাশ ঘেঁষে হিমছড়ি পর্যন্ত দীর্ঘায়িত। একদম খাড়া প্রাচীর। মনে হয় পাহাড়ের অপর পার্শ্বের অধিবাসী এবং ভূমিকে প্রাচীরের মাধ্যমে সংরক্ষণ করা হয়েছে সামনের উত্তাল ঢেউয়ের আগ্রাসন থেকে। অনুমান ভিত্তিক এই ধারণাটাই আসলে বাস্তবতা। কোথাও কোথাও পাহাড় বেয়ে বৃষ্টির পানি গড়িয়ে পড়ার চিহ্নও রয়েছে। পনের বিশ মিনিটে গাড়ি হিমছড়ি পৌঁছল। হিমছড়ির অন্যতম দুটি আকর্ষণ হলোÑ (১) উঁচু পাহাড়ের উপর দাঁড়িয়ে মুক্ত সমুদ্রের দর্শনে চক্ষু শীতল করা আর মুক্ত হাওয়ায় দেহ ঠাণ্ডা করা। (২) লোনা সাগরের পার্শ্বেই সুমিষ্ট ঝর্ণার পানির কলতান এক অনিন্দ্য সুন্দর দৃশ্য এবং কুদরতের অপার লীলা। তবে পাহাড়ে চড়া ও ঝর্ণায় প্রবেশের জন্য টিকেট গ্রহণ করতে হয়। মূল্য ২০ টাকা। মুদীর সাহেব হুযূর সকলের জন্য টিকিট কাটলেন, আমরা ভিতরে প্রবেশ করলাম। উপরে চড়ার জন্য সিঁড়ি তৈরি করা আছে। কৃত্রিম সিঁড়ি। কয়েক ধাপ চড়তেই জানতে পারলাম সরাসরি পাহাড় বেয়ে চূড়ায় উঠা যায়। সাথে সাথে সিঁড়ি থেকে নেমে আসলাম। আমার পিছু নিল আরো কয়েকজন। একদম খাড়া রাস্তা। তরুণদের জন্য এই রাস্তা বেয়ে পাহাড়ের চূড়ায় আরোহন করাতেই আনন্দ। তবে মুরুব্বীগণ সিঁড়ি বেয়ে উঠলেন। আমরা আগে ভাগে উঠে তাদের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। অল্পক্ষণে আমরা ক্লান্তি ঝেড়ে ফেলে শান্ত হয়েছি। আর মুরুব্বীরা তখন মাত্র ক্লান্তি নিয়ে উঠেছেন। উপরে উঠে সবাই কেবলামুখী হয়ে সাগরের বিশালতায় দৃষ্টি নিবদ্ধ করে মহান রাব্বুল আলামীনের মহা মহিমা অবলোকন করে প্রীত ও অভিভূত হলাম। বিশাল সাগর। এক সাগরের পর আরেক সাগর। তারপরও সাগর। আল্লাহ তা‘আলা তাঁর পবিত্র কালামে পাকে এ কথা বর্ণনা করেছেন,

হে নবী! আপনি বলে দিন, আমার রবের মহিমা কীর্তন লিখতে যদি সাগরের সব পানিকে মসি হিসেবে ব্যবহার করা হয় এবং এর সাথে আরো এই পরিমাণ পানি আমি নিয়ে আসি তবু আমার রবের মহিমা ফুরাবার আগেই সাগরের পানি ফুরিয়ে যাবে। অর্থাৎ আল্লাহর মহিমা, জ্ঞান, কুদরত, কারিশমা ফুরাবার নয়। সবই সসীম আর রবই একমাত্র অসীম। (‘সূরা কাহাফ’- ১০৯)

পাহাড়ের উপর উত্তর দক্ষিণ লম্বা পাকা ইট বসানো রাস্তা। একশ গজের মতো উত্তরে গিয়ে একটি সিঁড়ি বেয়ে পাহাড়ের সর্বোচ্চ চূড়া। অনেকেই সেখানে গিয়েছেন। মুদীর সাহেব হুযূর আমাকে বললেন,

-সবাইকে ডেকে নিয়ে এসো, ফেরার সময় হয়েছে।

সাথিরা বিভিন্ন স্থানে বিচরণ করছিল। সবাইকে আসার জন্য বললাম। সবাই আসতে লাগলেন। ততক্ষণে আমরা কয়েকজন চূড়ার উপর শামুক ঝিনুক ইত্যাদি দিয়ে তৈরি বিভিন্ন সামুদ্রিক অলঙ্কার সামগ্রীর ছোটো একটি দোকানে প্রবেশ করলাম। শামুক-ঝিনুকের তৈরি মালা, মেয়েদের চুলের খোপা, চুড়ি, আরো কত কি সব মনিহারি। বাড়িতে কচিকাঁচা আছে, সবার স্মরণে কিছু কড়ি খরচ করলাম। আমাদের প্রিয় নাযেমে তা’লীমাত সাহেবও কি কি কিনলেন। সফর শেষে বাড়িতে এসে ঈদের আনন্দে সবকিছু বণ্টন করেছিলাম। যারা পেয়েছিল তারাও অনেক খুশি হয়েছিল।

দোকানের সৌন্দর্য, সৌষ্ঠব, চাকচিক্য দেখে হুযূরের ফেরার ঘোষণা ভুলেই গিয়েছিলাম। হুযূর আবার সংবাদ পাঠালে দ্রুত আসলাম। এবার পাহাড় চূড়া থেকে নেমে ঝর্ণার ঝরঝর শোনা এবং নির্ঝর দেখার পালা। মুরুব্বীগণ সিঁড়ি দিয়েই নামছেন। কিন্তু তারুণ্যের অনুভূতি, চেতনা আমাদের কৃত্রিম সিঁড়ি দিয়ে নামার পরিবর্তে কুদরতী সিঁড়ি দিয়ে নামতে উদ্বুদ্ধ করল। একদম খাড়া এবং দুর্গম গিরিপথ, নামতে সাহস হয় না। অনেকে একটু নেমে হাল ছেড়ে দিল। সুবহানাল্লাহ পড়ে আমি নীচে নামতে লাগলাম। অর্ধেক পথ অতিক্রম করার পর তাদেরও হিম্মত হলো। আমরা ঝর্ণার কাছে যাচ্ছি। এক ব্যক্তি আমাদের লক্ষ করছিলেন অনেকক্ষণ ধরে। তিনি আমাদের লক্ষ করে তার সঙ্গীকে বললেন, ছেলেগুলো অনেক কষ্ট করছে। ঝর্ণার কাছে গিয়ে দেখতে পেলাম কিছু লোক ঝর্ণার পানি নিয়ে খেলা করছে। প্রায় পনেরো ফুট উপর থেকে ঝর্ণার পানি সানন্দে তাদের হাতের উপর লাফিয়ে পড়ছে। আমাদেরকে দেখে তারা সরে গিয়ে আমাদেরও কিছু বিনোদনের সুযোগ করে দিল। লোনা সাগরের তীরবর্তী পাহাড় নির্গত সুমিষ্ট ঝর্ণাধারা শুধু দেখে দেখে তৃপ্ত না হয়ে তার করমর্দনেও আহ্লাদিত হতে চাইলাম। জামার হাতা গুছিয়ে ঝর্ণার দিকে গেলাম। অনেক উপর থেকে পানি নীচের কালো পাথরের উপর পড়ে চতুর্দিকে ছিটাতে থাকার কারণে বেশি কাছে গেলে ভিজে যেতে হয়। তবুও দূর থেকে হাত বাড়িয়ে অল্প সল্প পানি হাতের তালুতে জমা করে উযূর অঙ্গগুলো কোনো মতে ধুয়ে নিলাম। ইতোমধ্যে আমাদের উস্তাদগণ এসে গেলেন ঝর্ণার কাছে। আমাদের কাণ্ড দেখে উৎসাহব্যঞ্জক হাসি দিলেন। উযূ সেরে হুযূরের কাছে আমরা সবাই জড়ো হলাম। হযরত আমীরে সফর সাহেব আমাদের নসীহত করলেন। হুযূর আমাদের জিজ্ঞাসা করলেন,

-পানি লোনা না কি মিঠা?

-আমরা বললাম, মিঠা।

তখন হুযূর সাগরের পানির সাথে এই পানির তুলনা করে আল্লাহর বড়ত্ব ফুটিয়ে তুললেন। হুযূর আরো বললেন,

-মানুষ যদি কৃত্রিম উপায়ে এমন ঝর্ণা তৈরি করতে চাইত তাহলে তা কত ব্যয়বহুল হতো। অথচ আল্লাহ তা‘আলা আমাদের বিনামূল্যে এত সুন্দর ব্যবস্থা করে দিয়েছেন।

এরপর হুযূর বললেন,

-কাফেররা আল্লাহর প্রাকৃতিক দৃশ্যকে ভোগবিলাস এবং বিনোদন মনে করে। আমরা এগুলো দেখে উপদেশ গ্রহণ করি, ঈমান বৃদ্ধি করি।

আরো দারুণ কারগুজারী হুযূর আমাদেরকে শোনালেন। হুযূর তখন পাকিস্তান পড়াশোনা করেন। হুযূর বলেন,

-আমরা রমাযানে পাহাড়ি বরফ দিয়ে ইফতার করতাম। পাকিস্তানে বরফ আচ্ছাদিত পাহাড় আছে। তার পাশেই সাগর। প্রচণ্ড শীতের কারণে সাগর থেকে সাতরিয়ে কেউ কূলে আসতে পারে না। এই বরফের বৈশিষ্ট্য হলো, তা যতটুকু পান করা হয় তার পুরোটাই হজম হয়ে যায়। আর কৃত্রিম বরফের অধিকাংশই শরীর থেকে বিভিন্নভাবে বেরিয়ে যায়। এই বৈশিষ্ট্যের কারণে পাহাড়ি বরফের মূল্য ছিল চারগুণ বেশি। স্বাভাবিক বরফের মূল্য ছিল পঞ্চাশ পয়সা সের, আর পাহাড়ি বরফের মূল্য সের দুই টাকা।

হুযূরের কথাগুলো আমরা বিভিন্নভাবে সংরক্ষণ করলাম।

হিমছড়ি ঝর্ণা থেকে বের হয়ে আমাদের কেউ কেউ ঢেউয়ের হাতছানিতে ছুটে গেল সাগর তীরে। কিন্তু আকাশের কালো মেঘ ও ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টির কারণে তারা আবার গাড়ির কাছে ফিরে এল। সবাই গাড়িতে উঠলাম। আমাদের একেক জনের হাতে একেক ধরনের সামগ্রী দেখে মুরুব্বীগণও আনন্দিত হলেন। গাড়িতে উঠতেই আবার মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হলো। ততক্ষণে আসরের ওয়াক্ত হয়েছে। গাড়ি চলছে স্বাভাবিক গতিতে। বৃষ্টি ভেজা রাস্তা। খুব জোরে গাড়ি চালানো যায় না। কিছুদূর যাওয়ার পর এক অদ্ভুত কাণ্ড ঘটল। আমীরে সফর সাহেব মুদীর সাহেব হুযূরকে জিজ্ঞাসা করলেন,

-আমাদের সাথে তালিবে ইলম কয়জন?

-হুযূর উত্তর দিলেন, ১২জন।

সাথে সাথে হুযূর পকেট থেকে ছয় হাজার টাকা বের করে মুদীর সাহেবকে দিয়ে বললেন,

-তালিবে ইলমদের প্রত্যেককে পাঁচশত টাকা করে দেবেন। তারা এই টাকা দিয়ে কিছু কেনাকাটা করে বাড়ি নিয়ে যাবে।

আমরা সবাই ছাত্র, তাই সবাই ছোটো। বড়ো একখানা নোট পেয়ে আনন্দে আত্মহারা হলাম। নোট পাওয়ার চেয়ে বড়ো আনন্দের ছিল আমাদের তরুণদের বয়সের চাহিদা, আশা-আকাক্সক্ষা, মনের ঝোঁকের ব্যাপারে হুযূরের সজাগ অনুভূতি। হুযূর পীর সাহেব, কিন্তু পুরা সফরে আমাদের স্বাচ্ছন্দ্যের প্রতি খেয়াল করেছেন। সফরে গাড়ির মধ্যে আমাদের গজল শুনতে মনে চাইছিল। কিন্তু সাহস পাচ্ছিলাম না। হুযূর নিজেই আমাদের গজল চালাতে বললেন। আবার সাগর পাড়ে আমরা পানিতে নামব কি না তা নিয়েও দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ছিলাম। আমাদের বুযুর্গদ্বয় উৎসাহ দেওয়ার জন্য জুতা খুলে পানিতে নেমে গেলেন। এ দেখে আমরা আর একধাপ সামনে অগ্রসর হয়েছিলাম। উৎসাহের সাথে হুযূরের সতর্কতাও ছিল। তাই বেশি দূরে যেতে দিলেন না। হযরত হাফেজ্জী হুযূর রহ. বলতেন, ‘দীনের গাড়ির দুই চাক্কা। আমীরের (ধনীর) মাল, আলেমদের চেষ্টা।’ আল্লাহ তা‘আলা আমাদের হুযূরকে একই সাথে দুই চাকা হিসেবে কবূল করেছেন। হুযূর বিভিন্ন মাদরাসায় পাঠদানের মাধ্যমে যেমন তালিবে ইলমদের ধন্য করেন, তেমনি অসংখ্য গরিব অসহায় তালিবে ইলমদের অর্থেরও যোগান দেন। কেউ প্রদান করে আনন্দ পান আর কেউ গ্রহণ করে। প্রদান করার আনন্দটাই মনে হয় বেশি। কারণ হাদীসে পাকে আছে,

দাতার হাত গ্রহণকারীর হাত অপেক্ষা উত্তম। (সহীহ বুখারী; হা.নং ১৪২৭)

আল্লাহ তা‘আলা হুযূরের সব দান কবূল করুন। আর ফী সাবীলিল্লাহ ব্যয় করতে আল্লাহ আমাদেরও তাওফীক দান করুন। আমীন।

আমরা আসরের নামায হোটেলে আদায় করলাম। নামায আদায় করে রওয়ানা হলাম বার্মিজ মার্কেটের উদ্দেশ্যে। উদ্দেশ্য ছিল শুঁটকি মাছ ক্রয় করা। শুঁটকি মাছের দোকানগুলো খুব জৌলুসপূর্ণ এবং আকর্ষণীয়, যেমনটি ঢাকা শহরের কসমেটিক বা ফেব্রিকের দোকান। চট্টগ্রাম বিশেষ করে কক্সবাজারের একটি উল্লেখযোগ্য ঐতিহ্য হলো শুঁটকি মাছ। ছোটো ছোটো কাচকি মাছ থেকে শুরু করে নানা জাতের বিশাল বিশাল মাছের শুঁটকি প্যাকেটে সংরক্ষণ করা আছে। আমরা রূপচাঁদা, কাইক্যা আর লইট্যা শুঁটকি কিনলাম। মাগরিবের সময় হয়ে এসেছে। আমরা সাগর তীরের দিকে গাড়ি হাঁকালাম। তবে বেশ যানজট থাকায় পৌঁছতে একটু বিলম্ব হলো। সাগরপাড়ের সান্ধ্যকালীন দৃশ্য সবচে’ বড়ো আকর্ষণীয় এবং চমৎকার। ঐদিন আকাশে মেঘ থাকার কারণে আসল রূপ হয়ত আর দেখা সম্ভব হবে না। তবুও প্রতিদিনের আচরণের ধারাবাহিকতা কিছুটা হলেও রক্ষা করে। তাই আমরা মাগরিবের বেশ পরে গিয়েও আকাশের পশ্চিমাচল রক্তিম আভা খা খা করে জ্বলতে দেখলাম। মনে হলো, সাগর থেকে লাল রং আকাশের প্রান্ত বেয়ে উঠছে। এই অনিন্দ্য সুন্দর দৃশ্য ফুটিয়ে তোলার কালি আমার কলমে নেই। এতটুকু লেখা যায়, সবাই যেন আল্লাহর এই কারিশমা সেখানে গিয়ে অন্তত একবার হলেও দর্শন করে ঈমান তাজা করেন। এই দৃশ্য দেখে সাথে সাথে একখানা আয়াত হৃদয়পটে ভেসে উঠল। সেই সাথে যবানে উচ্চারিত হলো,

যে দিন আকাশ বিদির্ণ হবে সেদিন তা রক্তে রঞ্জিত চামড়ার রূপ ধারণ করবে। (‘সূরা রহমান’- ৩৭)

কিয়ামতের পূর্ব মুহূর্তের আকাশের ভয়াবহ ভাবমূর্তির নমুনামাত্র সেই দৃশ্যটি। বেশ কিছুক্ষণ সাগর পাড়ে কাটালাম। সকালে পানি যেখানে ছিল এখন তার চেয়ে অনেক নীচে। আমরা লাফালাফি ছুটাছুটি করতে লাগলাম। অনেক দূর থেকে পানি ফুসে উঠে তীরে এসে অনেক উপরে উঠে যায়। এ যেন সাগরের আর্দ্র সম্ভাষণ। আবার মুহূর্তেই তীরের ঢেউগুলো সাগর তলে ফিরে যায়। যাওয়ার সময় আবার কাউকে কাউকে নিয়ে যেতে চায়। এটা হলো সাগরের আর্দ্র আগ্রাসন। অনেক সময় সে হয়ে যায় সফল। যদিও খালি করে দেয় অনেক মায়ের ভারা কোল। এই জন্য সাগরের পানিতে যারা সিক্ত হতে চান তাদের খুব সতর্ক থাকতে হয়। তীরের ঢেউ যখন সাগর গর্ভে ফিরে যায় তখন পায়ের নীচের বালু সরে যায়। তখন যদি অসতর্ক থাকে তাহলে সে আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। পড়ে গিয়ে ঢেউয়ের সাথে চলে যায়। আমরা তীর থেকে উপরে উঠে আসলাম। সেখানে মুক্তা, কড়ি, শামুক, ঝিনুক, শৈবাল, প্রবাল আরো কত নাম না জানা সামুদ্রিক সামগ্রীর পসরা সাজানো। তবে পসারিরা পসরা সামগ্রী ঢেকে কয়েকজন মিলে আড্ডায় লিপ্ত ছিল। রাত হয়ে এসেছে এদিকে মেঘলা আবহওয়া। ক্রেতাদের সমাগম নেই। তাই এখন দোকানিদের অলস সময়। আমাদের দু’চার জনকে দেখে দোকানিরা দোকানের দিকে আসল। পছন্দ হলো অনেক কিছু, কিন্তু দামও অনেক। দাম বলতে ভয় পেলাম। কারণ আমরা ঢাকায় থাকি, ঢাকা শহরে বিক্রেতারা তিন চার গুণ দাম হাঁকে। তাই অনেক সময় দাম বললেই ঠকতে হয়। তবুও দাম বললাম সাহস করে। মনে হলো অল্প দামেই কিনতে পারলাম সবকিছু। কক্সবাজারের দোকানিদের একটু আন্তরিক ও শালীন মনে হলো। কম দাম বললে ঢাকার দোকানিদের মতো রাগ করে না। অনেক কেনাকাটা হলো। এখন যাবার পালা। এক হোটেলে ঢুকলাম, নাম ‘মক্কা হোটেল’। সাগরের রূপচাঁদা খাওয়া হয় নি এখনো। তাই মুদীর সাহেব হুযূর রূপচাঁদার অর্ডার দিলেন। রূপচাঁদার স্বাদ কেউ গরম ভাত দিয়ে আস্বাদন করলাম আর কেউ গরম তন্দুরী দিয়ে। এখানেও মাছের করুণ দশা। ভেজে রাখা ফ্রিজের মাছ খাওয়ার সময় আরেকবার আগুনের সাথে মোলাকাত করে আহারকারীর সামনে পরিবেশিত হয়। স্বাদটা অনেকটা শুঁটকির মতোই ছিল। খানা শেষে হোটেলে ফিরলাম। এশার নামায, তারপর ঘুম। আমাদের পাশের কামরায় দুই মুরুব্বী হুযূর থাকবেন। ঘুমের পূর্বে হুযূরদের কিছুর প্রয়োজন আছে কি না জানতে গেলাম। এই সুবাদে বেশ কিছুক্ষণ তাদের সোহবতে থাকার সুযোগ হলো। দুই হুযূরই ক্লান্ত। বিছানায় গা এলিয়ে দিয়েছেন ঘুমিয়ে পড়বেন বলে। কিন্তু মুদীর সাহেব হুযূর এসে বললেন,

-হোটেল মালিক ইবরাহীম হাসান সাহেব হুযূরের সাথে ফোনে কথা বলবেন, দু‘আ চাইবেন।

হোটেল মালিক ঢাকায় থাকেন। সেখান থেকেই আমাদের প্রতি আন্তরিক মহব্বত প্রকাশ করলেন। হুযূরের কাছে দু‘আ চাইলেন। হুযূরও দু‘আ, ধন্যবাদ জানিয়ে তাকে খুশি করলেন। ঐদিকে মালিক তার ম্যানেজারকে ফোন করে হুযূরের সাথে সাক্ষাৎ করতে বলেছেন। ম্যানেজার আসলেন, তার সাথে একজন কর্মচারী, হাতে আবার মেহমানদারি। জুস আর কেক। খাওয়ার কারো তেমন চাহিদা নেই। তবুও সৌজন্য রক্ষা করতে হলো। ম্যানেজার হুযূরের সামনে শ্রদ্ধা ও ভক্তিতে এক প্রকার নুয়ে পড়লেন। নিজের জন্য, প্রতিষ্ঠানের জন্য এবং মালিকের জন্য দু‘আ চেয়ে বিদায় নিলেন।

পরদিন ফজরের পূর্বেই ফেরার জন্য প্রস্তুতি শুরু হলো। নামায পড়ে আমরা হোটেল থেকে বের হলাম। নীচে এসে রিসিপশনে চাবি জমা দিয়ে হোটেল ভাড়া পরিশোধ করা হলো। মোট ভাড়া হয় অনেক বেশি। কিন্তু পরিচিত বলে শুধু সার্ভিস চার্জ বাবদ আড়াই হাজার টাকা দিতে হলো। কক্সবাজার থেকে আমরা বান্দরবানের উদ্দেশ্যে রওয়ানা করব। তার পূর্বে শেষবারের মতো সাগরের কাছ থেকে বিদায় নিতে গেলাম। সাগরের তরঙ্গগুলোও একের পর এক এসে আমাদেরকে পুনরায় আসার আমন্ত্রণ জানিয়ে বিদায় দিতে লাগল। হুযূর সময় দিয়েছিলেন পাঁচ মিনিট। বিশ মিনিট কেটে গেল কিন্তু পাঁচ মিনিটের মতোই মনে হলো। সাগর পাড় ছেড়ে যেতে মনে চায় না তবু যেতে হবে। সাগরকে টাটা দিয়ে গাড়িতে চড়ে বসলাম।

বান্দরবানের পথে

কলাতলীর মোড়েই ফিলিং স্টেশন। কেক, জুস দিয়ে হালকা নাশতা করে এবং তেল নিয়ে সোয়া ছয়টার দিকে রওয়ানা হলাম বান্দরবানের উদ্দেশ্যে। ফেরার পথ একদিনের পরিচিত। আবার মন ইতোমধ্যেই বান্দরবানের পাহাড়ের গুহায় এবং চূড়ায় উড়ে গেছে। তাই রাস্তার দুই পার্শ্বের নয়নাভিরাম সবুজ শ্যামল দৃশ্যও ততটা আকর্ষণীয় মনে হচ্ছে না। তবুও নয়নপ্রান্ত নয়া কিছুর সন্ধান করছিল। সাঁইত্রিশ কি.মি. পথ অতিক্রম করার পর ডান দিকে ডুলাহাজরা মারকায। মুদীর সাহেব হুযূর বললেন,

-কাকরাইলের মুরুব্বী মাওলানা মুজ্জাম্মিল সাহেবের বাড়ি এখানে।

আরো একটু সামনে রাস্তার ডানে একটা সাইনবোর্ড দেখা গেল। তাতে লেখা ‘বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক’। খানিক বাদে রাস্তার বাম পার্শ্বে একটা স্কুল। চোখে পড়ল, সেখানে ছোটো ছোটো ছেলে-মেয়েরা খেলা করছিল। একজন ছাত্রের মাথায় টুপি দেখে খুব আনন্দিত হলাম। মনে পড়ল ঢাকা ফয়জুর রহমান আইডিয়াল ইনস্টিটিউটের কথা। ছাত্ররা টুপি মাথায় দেয়, নামায পড়ে, তাদেরকে ঈমান, আকায়েদ ও কিছু মাসআলা-মাসাইলও শেখানো হয়। আহ! সব স্কুলগুলোতে যদি এই ব্যবস্থা থাকত কতইনা ভালো হতো!

লোহাগড়ায় আসলাম। সকালের নাশতার জন্য একটা হোটেলের সামনে গাড়ি থামল। নাম ‘আরাকান হোটেল’। বাংলাদেশে আরাকান হোটেল! রহস্য জানার আগ্রহ হলো। হোটেল বয়কে জিজ্ঞাসা করলাম,

-ভাই আপনারা কি আরাকানের না কি?

-না, মালিকের দাদার বাড়ি আরাকানে। সেই হিসেবে হোটেলের নামকরণ করা হয়েছে।

পেট পুরে নাশতা করলাম। একই ধরনের খাবারে কক্সবাজারের তুলনায় বিল আসল অর্ধেক। নাশতা সেরে গাড়িতে উঠব। গাড়ি দেখি আমাদের রেখেই চলতে শুরু করল উলটো দিকে। সাথে অবশ্য আমীরে সফর ছিলেন। অল্প সময় পর ফিরে এলেন। সাথে এল বিশাল এক কাঁদি বাংলা কলা। পিতৃত্ব আর কাকে বলে …! এগুলোকে আমাদের অঞ্চলে রুম্বি কলা বলা হয়। গাড়িতে বসে সবাই কলা খেলাম।

গাড়ি আরো কিছুদূর চলে কেরাণীরহাট পৌঁছল এবং সেখান থেকে ডানে মোড় নিল। এটাই বান্দরবানের রাস্তা, বাইশ কি.মি. দূরত্ব। কিছুদূর অগ্রসর হতেই রাস্তার বাম পার্শ্বে বিজিবি ট্রেনিং সেন্টার ও স্কুল। মনোগ্রামে লেখা ছিল পবিত্র কুরআনের আয়াত,

يا ايها الذين امنوا اصبروا وصابروا ورابطوا.

অর্থ : হে মুমিনগণ! তোমরা ধৈর্য ধারণ কর, ধৈর্যে প্রতিযোগিতা কর এবং সদা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাক। আল্লাহকে ভয় কর যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার। (‘সূরা আলে ইমরান’- ২০০)

লেখাটা অনেক পুরনো হবে। ইসলামী ভাবধারার একটি প্রাচীন নমুনা। অনেক ইসলামী নিদর্শন দিন দিন মুছে গেলেও এখনো কিছু কিছু মোছা যায় নি। এটাও তার একটা। রাস্তা ছিল খুব আকাবাঁকা এবং উঁচুনিচু। পাহাড় কেটে রাস্তা তৈরি করা হয়েছে। পুরো বান্দরবান শহর পাহাড়ের উপর অবস্থিত। নতুন নির্জন পাহাড়ি রাস্তা। অভিজ্ঞতা, আনন্দ, অনুভূতিও নতুন ছিল। তবে সামান্য ভয়ও করছিল। কারণ, শুনেছি পাহাড়ি এলাকায় পাহাড়ি লোকেরা গাড়ি থামিয়ে ছিনতাই করে। কিছুদূর পর রেইচা আর্মি ক্যাম্প, গাড়ি থামাতে হলো। একজন সেনা সদস্য জিজ্ঞাসা করলেন,

-কোথা থেকে এসেছেন, কোথায় যাবেন?

চালক হেলাল ভাই উত্তর দিলেন,

-ঢাকা থেকে এসেছি, যাব বান্দরবান।

-কখন ফিরবেন?

-আজই, কিছুক্ষণ পর।

হেলাল ভাই সোজা সাপ্টা জবাব দিয়ে গাড়ি ছেড়ে দিলেন। আমীরে সফর গাড়ির সামনে বসা ছিলেন, তার চেহারা দেখেই মনে হয় দ্রুত মুক্তি দিল। অবশ্য আমাদের দ্বিতীয় গাড়ি যা আমাদের পিছনে ছিল, তাদের ছুটতে একটু দেরি হলো।

এনাম ভাই পাহাড়ের সাথে সংশ্লিষ্ট কুরআনের আয়াত তিলাওয়াত করলেন। কুরআনের আয়াতের সাথে বাস্তবতার মিল খুঁজে পাওয়ার সুযোগ হলো। বান্দরবান জিরো পয়েন্টে পৌঁছলাম। সেখান থেকে ডানে রাস্তা গেছে ‘শৈল প্রপাত’। দূরত্ব ৭ কি.মি.। এ পথগুলো আরো আনন্দের। রাস্তা হঠাৎ করে শেষ হয়ে যায়। কিন্তু যেখান থেকে রাস্তা শেষ মনে হতো সেইখানটায় একটা মোড় থাকে। মোড়ের কাছে এসে দেখি রাস্তা অন্যদিকে মোড় নিয়েছে। কখনো কখনো মনে হচ্ছিল গাড়ি অনেক উপরে উড়ে যাচ্ছে কোনো পাহাড়ের চূড়ায়। কিন্তু না, কিছুদূর উড়ার পর তা স্বাভাবিক ও সমতল রাস্তা হয়ে যাচ্ছে। ডানে বামে পাহাড় আর পাহাড়ের সমাবেশ। প্রায় প্রত্যেক পাহাড়ের চূড়ায় মানুষের বসবাস। কিছু কিছু জমকালো টিন-কাঠের বাড়িঘর। দেখে মনে হচ্ছে এলাকার মোড়ল মাতব্বরের বাড়ি হবে। যেহেতু অধিকাংশ বাড়িঘর নি¤œমানের। হিমছড়ি বেশ দীর্ঘ পাহাড়। কিন্তু এখানকার পাহাড়গুলো তার থেকে অনেক উঁচু এবং বড়ো। উঁচুনিচু আকাবাঁকা পাহাড়ি রাস্তা বেয়ে ৯ টা ২২ মিনিটে আমরা শৈল প্রপাত পৌঁছলাম। নামতেই দুই তিনটি দোকান। রাস্তার নীচে আরো একটি। প্রথম দোকানটি ছিল মনিহারি বা মুদী দোকান, নাম ‘রামলিয়াবং’। তারপরে একটি খাবার হোটেল বিভিন্ন ধরনের খাবারের ছবি সাইনবোর্ডে দেখা যাচ্ছিল। তার মধ্যে কাকড়ার মতো কিছু অখাদ্য বস্তুর ছবিও দেখা গেল। হোটেলটির নাম ‘তিনুংভা’। পরের দোকানের নাম ‘বিংডি’। এটি কুটির শিল্পের দোকান। বাঁশ, কাঠ এবং তাঁতের তৈরি বিভিন্ন সখের সাজসরঞ্জাম এখানে পাওয়া যায়। একদামের দোকান, দামও একটু চড়া। আমাদের আসাতিযা হযরাত কিছু তাঁত ও বাঁশের তৈরি জিনিস কিনলেন। উদ্দেশ্য ছিল তাদের প্রতি একটু অনুগ্রহ করা। ক্রয় করা আসল উদ্দেশ্য ছিল না। পাহাড় থেকে আহরিত আম, কাঁঠাল এনে রাস্তার নীচের একটি দোকানে জড়ো করেছে পাহাড়িরা। কেউ কেউ ফর্মালিনমুক্ত ফলগুলোও ক্রয় করলেন। এখান থেকে আরো নীচে সিঁড়ি বেয়ে নামতে হয় শৈল প্রপাতে। পর্বত শিখরস্থ সমতল ভূমি। জলধারা প্রবাহিত হচ্ছে বেশ দীর্ঘ স্থান জুড়ে। শুরুটা কোথায় দেখার কৌতূহল। কয়েকজন ছুটলাম পানি প্রবাহের বিপরীত সূত্র ধরে। নির্জন দুই পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে হাঁটছি আমরা কয়েকজন। অশ্রুসিক্ত পাহাড়ের গা ঘেঁষে হাঁটছি। এ কথাই আল্লাহ তা‘আলা কুরআনে পাকে বর্ণনা করেছেন,

وان من الحجارة لما يتفجر منه الانهار …

অর্থ : কতক পাথর এমন রয়েছে যা থেকে নদী-নালা প্রবাহিত হয় এবং কতক পাথর এমন রয়েছে যা বিদীর্ণ হওয়ার পর তা থেকে পানি নির্গত হয়। আবার কতক এমন রয়েছে যা আল্লাহর ভয়ে ধসে পড়ে। (‘সূরা বাকারা’- ৭৪)

পা পিছলে পড়ে যাওয়ার ভয়। পড়লে নির্ঘাত বড়ো ধরনের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা। না, কারো কোনো সমস্যা হয় নি। যত ভিতরে যাচ্ছি নির্জনতা ততই বেশি। পাহাড় থেকে একধরনের পোকার ভয়ংকর ঝিঁঝি শব্দ। তবে ঝিঁঝি পোকা নয় এটা বোঝা যায়। অনেক দূরেই গিয়েছিলাম আমরা। এক স্থানে এসে হাঁটার রাস্তা শেষ। আর সামনে যাওয়া যায় না। আবার অজানা আশঙ্কাও কাজ করছিল। তাই ফিরতে হলো সেখান থেকেই। তবে ফেরার পূর্বে উযূ করলাম ঝর্ণার আরামদায়ক ঠাণ্ডা পানি দিয়ে। আমরা একদল ফিরছি আর কয়েকজনের ছোট্ট দল সেখানে আসছেন। ঠাণ্ডা পানিতে উযূ করে গোসল করার লোভটা আর সামলাতে পারলাম না। গাড়িতে গিয়ে লুঙ্গি-গামছা নিয়ে আসলাম। সময় কম, হুযূর গোসল করতে অনুমতি দিবেন বলে মনে হয় না, তাই সরাসরি নেমে পড়লাম ঝর্ণার পানিতে। মুদীর সাহেব হুযূর দেখলেন, হেসে বললেন,

-তুমি শৈল প্রপাতের হক আদায় করেছ।

আমার দেখাদেখি আব্দুল হাই আর ইবরাহীমও নেমে পড়ল। আগের দিন বৃষ্টি হয়েছিল তাই মনে হয় পানি একটু ঘোলাটে দেখাচ্ছে। তবে পানির শীতলতা ছিল খুবই আরামদায়ক। এর আগে কোনোদিন এত আরামদায়ক এবং আনন্দের গোসল করার সৌভাগ্য হয় নি। এবার ফেরার পালা, তবে পাহাড়ে চড়ার স্বাদ নেওয়ার সুযোগ হলো না। একটা কথা বলা হয় নি, তাহলো, আমরা এখানে মাত্র একজন পুরুষের সাক্ষাৎ পেয়েছিলাম যিনি দোকানদারি করছিলেন। জানা গেল, এখানকার মহিলারাই কঠিন কাজগুলো আঞ্জাম দেয়। তাই টুকরি মাথায় মহিলাদেরকে পাহাড়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখা গিয়েছিল মাঝে মধ্যেই। পুরুষরা মনে হয় গৃহস্থালির কাজ করে। এক দোকানিকে জিজ্ঞাসা করলাম,

-এখানকার অধিবাসীরা কোন ধর্মের অনুসারী?

-ভাঙা বাংলায় উত্তর দিল, খ্রিস্টান, কোনো মুসলামানের বাস এখানে নেই।

আশ্চর্যের বিষয় হলো, বান্দরবান জিরো পয়েন্ট থেকে শৈল প্রপাত পর্যন্ত পুরো ৭ কি.মি. বিস্তৃত এলাকার নাম ‘ফারুক পাড়া’, মুসলমানি নাম। এমনকি বান্দরবান শহরে ‘আলফারুক’ নামে বড়োসড়ো একটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও আছে। তাতে বোঝা যায়, তিনি এখানকার কোনো প্রভাবশালী মুসলমান ছিলেন। তা সত্ত্বেও ইসলামি কোনো নিদর্শন আমাদের চোখে পড়ে নি পুরো এলাকাজুড়ে। একটু পর পর পাহাড়ের উপর খ্রিস্টানদের গির্জা দৃষ্টিগোচর হলেও চোখে পড়ে নি কোনো মসজিদের মিনার। দেখা যায় নি কোনো দাড়ি টুপিওয়ালা মুসলমান। চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার যাওয়ার পথে মসজিদ মক্তবের দৃশ্য দেখে যেমন আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়েছিলাম, আমাদের মন তারচে’ বেশি ভারাক্রান্ত হয়েছিল বান্দরবানের দীন ধর্মহীন পরিবেশ দেখে। আমাদের মুহতারাম আহমাদুল্লাহ সাহেব হুযূর তো নীরবই থাকেন সর্বদা। কিন্তু এ অভিশপ্ত পরিবেশ দেখে হুযূর বললেন,

-‘রাবেতা’র পক্ষ থেকে এখানে কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার দরকার। মাদরাসা কায়েম করার ফিকির করা দরকার।

মুদীর সাহেব এবং ইবরাহীম হাসান সাহেবও সম্মতি দিলেন। এতে উম্মতের প্রতি হুযূরের দরদ ও ভালোবাসার গভীরতাও আঁচ করা গেল। চট্টগ্রাম শহর বড়ো বড়ো দীনী মারকাযের নগরী। তার অদূরে মানুষের এই চরম ধর্মহীনতা আসলে বাতির নীচে অন্ধকারের মতো। আমরা মুসলমান এবং বিশেষ করে নায়েবে নবীরা নিজেদের দায়িত্বে কতটুকু সচেতন তা চিন্তা করে দেখার বিষয়। আমরা আমাদের দায়িত্বে অবহেলা প্রদর্শন করলেও বাতিল কিন্তু বসে নেই। তারা মুসলমানদের এবং বিশেষ করে পার্বত্য অঞ্চলের অধিবাসীদের ধর্মান্তরিত করার বেলায় সোচ্চার। বিদেশি খ্রিস্টান মিশনারির দু’ একটি গাড়িও এই গভীর পাহাড়ে চলতে দেখলাম। আমরা শৈল প্রপাত থেকে সাড়ে দশটার দিকে ফিরলাম। পথে ‘বিগ্রিক্ষিং রেস্তোরা’। তার একটু পরই আমাদের গাড়ি থামল। রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে অনেক নীচে বিস্তীর্ণ উপত্যাকায় মানুষের বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে গেছে অনেক হ্রদ। কোনোটা সচল, কোনোটা আবার অচল। পুরা জনবসতিকে সামনে রেখে হযরত ইবরাহীম হাসান সাহেব হুযূর হাত উঠালেন। আমরাও তার সাথে হাত তুললাম। কেঁদে কেঁদে তাদের হিদায়াতের দু‘আ করলাম। আমরা যেন তাদের কাছে দাওয়াত পৌঁছাতে পারি তার তাওফীকও তাওফীকওয়ালার কাছে কামনা করলাম।

আবার গাড়ি ছাড়ল। এবার এমন কিছু পাহাড় চোখে পড়ল যার সৌন্দর্য সৌষ্ঠব বর্ণনা না করলে বান্দরবানের হক আদায় হয় না। প্রাচীনকালের রাজকীয় প্রাসাদ সাদৃশ খোদাই করা দালানে ক্ষীণ লাল রঙের বাহার। কিছু পাহাড় আবার ধূসর কালো। পাহাড়ের রঙের বিভিন্নতা কুরআনে এভাবে বর্ণিত হয়েছে,

وَمِنَ الْجِبَالِ جُدَدٌ بِيضٌ وَحُمْرٌ مُخْتَلِفٌ أَلْوَانُهَا وَغَرَابِيبُ سُودٌ.

অর্থ : পর্বতসমূহে রয়েছে বিচিত্র বর্ণের শোভাÑ শুভ্র, লাল ও নিকষ কালো। (‘সূরা ফাতির’- ২৭)

গাড়ি সামনে ধায় আর পাহাড়গুলো দৌড়ে পিছনের দিকে যায়। কিন্তু চোখ আটকে থাকে পাহাড়ের গায়ে শিল্পীর কারুকাজের বাঁকে বাঁকে। রাস্তার মোড়ে বেশিক্ষণ আর পিছনের পাহাড়টি দেখা যায় না। তাই আবার সামনের দিকে গ্রিবাদেশ ফিরাতে হয়। কিন্তু কী আশ্চর্য! সাথে সাথেই চোখ নিবদ্ধ হয় তেমনই সুন্দর আরেক পাহাড়ের গায়ে। না, তার চেয়ে বেশি রূপের সমাহার পরবর্তী পাহাড়ে। কুদরতের এই লীলাখেলা দেখে হৃদয়পটে কতকগুলো কথা জড়ো হলো। তার প্রত্যেকটির সাথে মুদীর সাহেব হুযূরের অনুভূতি প্রকাশের কাকতালীয় মিল ছিল। আমি মনে মনে বললাম, আহ! মানবরূপী কোনো শিল্পীর তুলির নৈপুণ্য কি এত হৃদয়গ্রাহী হয়! সাথে সাথে মুদীর সাহেব হুযূরের মুখ দিয়ে হুবহু একই কথা নিঃসৃত হলো। আর সাথে সাথে সূরা লুকমানের প্রথম পৃষ্ঠার শেষের আয়াতগুলো একজনকে তিলাওয়াত করতে বললেন। সেখানে আল্লাহ তা‘আলা নিজ কুদরতের বর্ণনা দিয়েছেন এবং মানুষকে চ্যালেঞ্জ ছুড়েছেন। আবার আমি যখন এই পাহাড়গুলোকে প্রাচীনকালের বাড়ির সাথে মনে মনে তুলনা করছিলাম, তখনও মুদীর সাহেব হুযূর আমার চিন্তাকে শাব্দিক রূপ দিলেন। বড়ো বড়ো পাহাড় দেখে একদিকে যেমন আল্লাহ তা‘আলার বড়ত্ব অন্তরে জাগ্রত হয় তেমনি কিয়ামতের ভয়াবহতা চোখের সামনে ফুটে ওঠে। আশ্চর্য মনে হয় যে, এত বিশাল পাহাড় কীভাবে ধুনিত তুলার ন্যায় উড়তে থাকবে। এ মর্মে কুরআনের অসংখ্য আয়াত রয়েছে। দু’ একটি আয়াত এখানে তুলে ধরা হলো,

وَيَسْأَلُونَكَ عَنِ الْجِبَالِ فَقُلْ يَنْسِفُهَا رَبِّي نَسْفًا. فَيَذَرُهَا قَاعًا صَفْصَفًا. لا تَرَى فِيهَا عِوَجًا وَلا أَمْتًا. (سورة طه ১০৫-১০৭)

অর্থ : তারা তোমাকে পর্বতসমূহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বলো, আমার প্রতিপালক এগুলোকে সমূলে উৎপাটন করে বিক্ষিপ্ত করে দিবেন। অতঃপর তিনি এগুলোকে পরিণত করবেন মসৃণ সমতল ময়দানে, যাতে তুমি বক্রতা ও উচ্চতা দেখতে পাবে না। (‘সূরা ত্বাহা’- ১০৫-১০৭)

يَوْمَ تَمُورُ السَّمَاءُ مَوْرًا. وَتَسِيرُ الْجِبَالُ سَيْرًا. فَوَيْلٌ يَوْمَئِذٍ لِلْمُكَذِّبِينَ.

অর্থ : যেদিন আকাশ আন্দোলিত হবে প্রবলভাবে এবং পর্বত চলবে দ্রুত। দুর্ভোগ সেদিন অস্বীকারকারীদের। (‘সূরা তূর’- ৯-১১)

إِذَا رُجَّتِ الْأَرْضُ رَجًّا. وَبُسَّتِ الْجِبَالُ بَسًّا. فَكَانَتْ هَبَاءً مُنْبَثًّا.

অর্থ : যখন প্রবল কম্পনে প্রকম্পিত হবে পৃথিবী এবং পর্বতমালা চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে পড়বে, ফলে তা পর্যবশিত হবে উৎক্ষিপ্ত ধূলিকণায়। (‘সূরা ওয়াকিয়া’- ৪-৬)

وَتَكُونُ الْجِبَالُ كَالْعِهْنِ الْمَنْفُوشِ.

অর্থ : এবং পর্বতসমূহ হবে ধুনিত রঙিন পশমের মতো। (‘সূরা কারি‘আ’- ৫)

আরেকটু সামনে রাস্তার ডানে পাহাড়ের পাদদেশে মেঘলা চা বাগান, সময় থাকলে যাওয়া যেত। উপর দিয়ে শুধু চোখ বুলিয়েছিলাম।

পটিয়া মাদরাসায় কিছু সময়

বেলা ১১টায় আমরা কেরানিরহাট পৌঁছলাম। এখন গাড়ি চলবে বিরতিহীনভাবে পটিয়া মাদরাসার উদ্দেশ্যে। ১১ টা ৫৭ মিনিটে আমরা পটিয়া মাদরাসার ফটক দিয়ে মাদরাসায় প্রবেশ করলাম। দরসের (ক্লাসের) সময়। বিশাল মাদরাসার সামনে কোনো ছাত্র পাওয়া গেল না। মাদরাসার অফিসে যোগাযোগ করলে একজন হুযূর আমাদের কাছে আসলেন। সালাম মুসাফাহার পর আমরা ইফতা বিভাগে যাওয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করলাম। তিনি আমাদেরকে ইফতা বিভাগে নিয়ে গেলেন। ভিতরে বেশ ছাত্র। সবাই অধ্যয়নে রত। একজন মুরুব্বী হুযূর সামনে বসা। তিনি ইফতা বিভাগের মুশরিফ। পরে নাম জানতে পারলাম। হযরতুল আল্লাম মুফতী মুজাফ্ফর আহমাদ সাহেব, বাড়ি মহেশখালী। পূর্বে শুনেছি পটিয়া মাদরাসায় ইফতা বিভাগে খুব কড়াকড়ি। তার কিছুটা আঁচ করতে পারলাম। ভিতরে ঢুকতে ইতস্তত বোধ করছিলাম। হঠাৎ ভিতরে একজন পরিচিত ছাত্রকে দেখলেন আমাদের মুদীর সাহেব হুযূর। সে রাহমানিয়ায় আমাদের সাথে ২০১১ খ্রিস্টাব্দে মিশকাত জামাআত পড়েছে। নাম হাবীবুর রহমান, ভোলা জেলার অধিবাসী। আসলেই সে ভোলাভালা মানুষ। গত বছর এখানে উলূমুল হাদীস পড়ে এ বছর ইফতা প্রথম বর্ষে পড়ছে। হুযূর তাকে ইশারায় ডাকলেন। আমাদের দেখে সে খুব খুশি, আমরাও আনন্দিত। তার মাধ্যমে অনুমতি নিয়ে আমরা ভিতরে প্রবেশ করলাম। মুফতী সাহেবের সাথে মুলাকাত হলো। হুযূরকে অনেক হাসিখুশি মনে হলো। আমাদের খুব কদর করলেন। তরমুজের রসে আমাদের পেট ভরালেন আর কথার রসে আমাদের হৃদয় জুড়ালেন। মুদীর সাহেব হুযূর কিছু নসীহত করার আবদার করলেন। তিনি অত্যন্ত বিনয় প্রকাশ করলেন। হুযূরের পিড়াপিড়িতে সাদামাটা ভাষায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ নসীহত করলেন। আদর্শ শিক্ষকের গুণাবলি কী তা কুরআনের আয়াত তিলাওয়াত করে ব্যাখ্যা করলেন। আদর্শ শিক্ষকের তিনটি গুণ হুযূর আমাদের আয়াতের মধ্যে দেখিয়ে দিলেন।

لقد جاءكم رسول من انفسكم …

আল্লাহ তা‘আলা প্রত্যেক সম্প্রদায়ের নিকট তাদের মধ্য থেকে একজন নবীকে বাছাই করে পাঠিয়েছেন সম্প্রদায়ের সম্মান রক্ষার্থে। অন্য সম্প্রদায়ের হলে নিজেদের জন্য মানহানিকর মনে হতে পারে। এই আয়াতে বর্ণিত প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যে সকল গুণের কথা বলা হয়েছে সেগুলো থাকলেই আদর্শ উস্তাদ হতে পারো। প্রথম গুণ ‘আযীয’ অর্থাৎ ছাত্রদের দুঃখ-কষ্টে ব্যথিত হওয়া ও কষ্ট দূর করার চেষ্টা করার মনমানসিকতা উস্তাদের মধ্যে থাকতে হবে। আর এই গুণ আমাদের দেওবন্দী উলামায়ে কেরামের মধ্যে পাওয়া যায়। তারা ছাত্রদের সব চাহিদা পূরণ করেন, সুখে-দুঃখে তাদের পাশে থাকেন। ছাত্রদের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করেন। কারণ ছাত্রদের থাকা এবং হালাল খাবারের ব্যবস্থা যদি না করা হয় তবে তো তারা ইলম হাসিল করতে পারবে না। যেহেতু আল্লাহ তা‘আলা নেক আমল করার পূর্ব শর্ত রেখেছেন হালাল ও পবিত্র খাবার গ্রহণ।

يا ايها الرسول كلوا من الطيبات واعملوا صالحا.

অর্থ : হে রাসূল! আপনি পবিত্র রিযিক আহার করুন এবং নেক আমল করুন। (‘সূরা মু’মিনুন’- ৫১)

পটিয়া মাদরাসা এমনভাবে নির্মাণ করা হয়েছে যে ছাত্রদের সারাবছর ছাতার প্রয়োজন হয় না। হুযূর দুই ধনী ছাত্রের উদাহরণ দিলেন, যাদের পিতার টাকা হালাল না হওয়ার কারণে তারা মাদরাসায় টেকে নি।

দ্বিতীয় গুণ হলো ‘হারীছ’ অর্থাৎ ছাত্রদের লেখাপড়া ও উন্নত চরিত্র গঠনের জন্য ‘হারীছ’ তথা আগ্রহী ও অভিনিবিষ্ট হতে হবে। আর এই গুণও কওমী মাদরাসার শিক্ষকদের মধ্যে বিদ্যমান; সরকারি মাদরাসায় নেই।

তৃতীয় গুণ হলো ‘বিলমু’মিনীনা রউফুর রহীম’। অন্যান্য মুমীনদের সাথে ভালো ও সৎ ব্যবহার করতে হবে এবং তাদের প্রতি দয়ার্দ্র ও সহনশীল হতে হবে।

এরপর মুফতী সাহেব পটিয়া মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা মুহতামিম আল্লামা মুফতী আযীযুল হক সাহেবের কিছু মহত্ত্ব বর্ণনা করলেন।

হুযূর একবার হজে গেলেন। হজ থেকে যখন ফিরলেন তখন মাদরাসায় প্রতিবছরের ন্যায় তিনদিন ব্যাপী আসর থেকে মাগরিব পর্যন্ত অনুষ্ঠিত শের বাহাস চলছিল। ছাত্ররা অনেক কবিতা পাঠ করল। অতঃপর হুযূর বললেন, ‘আমি যখন বাইতুল্লাহ এবং রওযার সামনে ছিলাম তখন আমার মানসপটে কিছু কবিতা উদয় হয়েছিল।’ এই বলে ততক্ষণাৎ তিনি আটটি কবিতা পাঠ করলেন

روحى فدى لجزيرة عربية فيها الحرم

والكعبة البيت الشريف طوافها فرض الامم

انوارها طلعت على الافاق وانجلت الدجى

واضائت الاطراف والاكناف وانزوت الظلم

روحى فدى لمدينة مجراها ينابيع الهدى

ولروضة فى مهدها نام النبى المحترم

يأيتها الزوار من فج عميق شاسع

وركعة كل منهما اطالة فوق الديم

অর্থ : আমার প্রাণবায়ু উৎসর্গিত আরব উপদীপের উদ্দেশে, যেখানে বিরাজমান পবিত্র হেরেম এবং কা’বা গৃহ বাইতুল্লাহ। যে গৃহের তওয়াফ-প্রদক্ষিণ মুসলিম উম্মাহর জন্য অবশ্য করণীয়। যে গৃহের আলোক রেখায় আলো ঝলমল হয়েছে দিক দিগন্তের বিস্তৃত জমিন। এবং বিদূরিত হয়েছে তিমির আঁধার। দিগি¦দিক দ্যুতিময় হয়েছে ঘুঁচেছে তমসা নিশি। আমার প্রাণ সমর্পিত পবিত্র ঐ মদীনার তরে যে জনপদের শ্রোতধারা হলো হিদায়াতের উৎস-নালা। উৎসর্গিত ঐ রওযা পাকের তরে যার ক্রোড়ে শায়িত আছেন প্রিয় নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)। যেখানে ছুটে আসে দূর-দূরান্তের দর্শনপ্রার্থী। পবিত্র এ দুটি স্থানে ইবাদত ও উপাসনা হয় অবিরাম বারিধারা থেকেও দীর্ঘস্থায়ী।

একবার পটিয়া মাদরাসার উপর দিয়ে উড়োজাহাজ উড়ল। সব ছাত্র উস্তাদ বাইরে আসলেও মুফতী সাহেব বের হলেন না। তিনি পরে কবিতা পড়ে শোনালেন যে, ‘দুনিয়ার সবকিছুর মজা আমরা কিতাবের মধ্যে পাই’। মুফতী সাহেবকে কখনো মুতালাআ করতে দেখা যেত না। কিন্তু যেকোনো কিতাবের যেকোনো ইবারাত জিজ্ঞাসা করলে মুখস্থ বলতে পারতেন।

হযরত মুফতী সাহেব হুযূর দা.বা. বলেন, ‘নবুওয়াতীর পরে সোহবতের দরজা’। দলীল হিসেবে বললেন, হযরত আবু বকর রাযি.-এর মর্যাদা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরে হওয়ার কারণ হলো সোহবত। সবশেষে মুফতী মুযাফ্ফর সাহেব দা.বা. আমাদের কক্সবাজারের ভ্রমণের কথা শুনে বললেন,

নুনে গুণ বাড়ায় এবং তা পরিবেশবান্ধব। দুনিয়ার সব ময়লা আবর্জনা নদী হয়ে সাগরে পড়ে এবং তা পরিশোধিত হয়ে মেঘ হয়ে আকাশে উড়ে যায় এবং বৃষ্টি হয়ে সারা পৃথিবীতে আবার ছড়িয়ে পড়ে। আর সামুদ্রিক এলাকা তথা লোনা পানির এলাকা মিঠা পানির এলাকা থেকে স্বাস্থ্যকর, তাই ঢাকার তুলনায় চট্টগ্রামের পরিবেশ স্বাস্থ্যকর। এই জন্য বিভিন্ন অঞ্চল থেকে কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকতে লাখ লাখ টাকা খরচ করে মানুষ আসে। তাই আপনারাও এসেছেন।

হুযূরের রসাত্মক বাস্তব বাক্য শুনে আমরা হেসে উঠলাম। নুন পরিবেশবান্ধব হওয়ার আরেকটি ঐতিহাসিক সত্যতা তিনি পেশ করলেন। তা হলো,

ফিরআউন বাহিনীকে লবণাক্ত সাগরে ডুবিয়ে মারা হয়েছে। যদি লবণাক্ত সাগরে না ডোবানো হতো তাহলে পানি নষ্ট হয়ে পরিবেশ নষ্ট হতো এবং মূসা আ. ও তার সঙ্গীদের কষ্ট হতো।

আমরা মুফতী সাহেব হুযূরকে আমাদের মাদরাসায় আসার দাওয়াত দিয়ে মাদরাসা থেকে বিদায় নিলাম। পৌনে একটার সময় আমরা মাদরাসা থেকে বের হলাম। যোহর নামায আদায় করলাম এক সি.এন.জি স্টেশনে। এখন হাটহাজারী মাদরাসার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হব।

হাটহাজারী মাদরাসা

কর্ণফুলী ব্রিজ তারপরে আরেকটি ব্রিজ পার হয়ে গাড়ি পৌঁছল মুরাদপুর। ডান দিকে হাটহাজারী রাস্তা। ডানে বামে রং-বেরঙের মাযার শরীফ। লাল রঙের সামিয়ানা, ঝাড়বাতি আর মাইকে পড়া বাবাদের শানে রচিত গান গজলে অবিরত শিরক বিদ‘আত প্রচারিত হচ্ছে। রাস্তার ডান পাশে আশেকে আউলিয়া ডিগ্রি কলেজ। এইতো অক্সিজেন মোড়। এখানে এসে এক প্রকার অক্সিজেন সংকটে পড়ে গেলাম। গাড়ির দীর্ঘ লাইন তার সাথে প্রচণ্ড গরম। গাড়ির গ্লাস লাগানো। এসির ঠাণ্ডা পিছন পর্যন্ত পৌঁছতে পৌঁছতে আর ঠাণ্ডা থাকে না।

যাই হোক, অনেক কষ্টে দ্বিগুণ সময় ব্যয়ে পৌনে তিনটার দিকে পৌঁছলাম হাটহাজারী মাদরাসার প্রধান ফটকে। ভেপু বাজাতেই দারোয়ান ফটক খুলে দিলেন। মাদরাসার চত্বরে আমাদের জন্য অপেক্ষমান ছিল কয়েকজন ছাত্র। রাহমানিয়া পড়–য়া ত্বলহা আশরাফুজ্জামান, সে হযরত ইবরাহীম হাসান সাহেবের ভাগিনা। আরেকজন হলো মুজাহিদ ভাই, চরওয়াশপুর মাদরাসার সাবেক ছাত্র। তাদের সাথে আরো কয়েকজন রয়েছে। গাড়ি থেকে নামা মাত্র সবাই ছুটে এসে সালাম মুসাফাহা করল। মুদীর সাহেব হুযূরের সাথে তারা পূর্ব থেকেই যোগাযোগ রাখছিলেন। ভাই ত্বলহার বাসা ঢাকায়। আমরা যেদিন রাতে ঢাকা থেকে রওয়ানা করি সেদিন সন্ধ্যায় তিনিও ঢাকা থেকে রওয়ানা করেছিলেন। আমাদের মেহমানদারি করার জন্য আর নিজে মেজবান হওয়ার জন্য আমাদের সাথে আসেননি।

মাদরাসায় পৌঁছে আমরা সর্বপ্রথম আল্লামা মুফতী আব্দুস সালাম চাটগামী সাহেব দা.বা.-এর সাথে সাক্ষাৎ করলাম। হযরত মুফতী ইবরাহীম হাসান সাহেব দা.বা. পাকিস্তানে তার কাছে ইফতা পড়েছেন। সেই সুবাদে আমরা হুযূরের সোহবত লাভে ধন্য হলাম। হুযূরকে দেখা মাত্র ভক্তি শ্রদ্ধায় অন্তর কানায় কানায় পরিপূর্ণ হলো। নূরানী চেহারা। আল্লাহওয়ালাদের চেহারা দেখলে আল্লাহকে স্মরণ হয়। আমাদেরও হুযূরকে দেখে আল্লাহর স্মরণ হলো। হুযূর অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েছেন। কথা স্পষ্ট বোঝা যায় না। তবুও ক্ষীণ আওয়াযে আমাদের অনেক মূল্যবান নসীহত করলেন, যা আমাদের জীবন পথের পাথেয় হিসেবে থাকবে। বিশেষ করে উলূমুল ফিকহের ত্বলাবাদের জন্য তা মেনে চলা অত্যাবশ্যকীয়। প্রথমেই তিনি উসূলে ফিকহ পূর্ণরূপে আয়ত্ত করার কথা বললেন। এর জন্য উকূদু রসমিল মুফতী মুতালাআ করতে বললেন। ফুরূয়ে ফিকহ অর্থাৎ ফিকহের শাখা-প্রশাখার জ্ঞান অর্জনের জন্য ফাতাওয়া হিন্দিয়া এবং বাদায়িউস সানায়ে’ শুরু থেকে একেবারে শেষ পর্যন্ত অধ্যয়নের পরামর্শ দিলেন। সাথে সাথে হাদীসের শরাহ তথা ব্যাখ্যাগ্রন্থও মুতালাআ করতে বললেন। তার জন্য ফাতহুল বারী নাম হুযূর বিশেষভাবে উল্লেখ করলেন। আল্লাহওয়ালাদের দরবার থেকে খালি হাতে অথবা খালি মুখে ফেরা যায় না। এখানেও তার ব্যত্যয় ঘটল না। হুযূর আমাদের সবাইকে তার লেখা মাকবূল দোয়া নামক বইটি হাদিয়া দিলেন। আর আমাদের ইফতা বিভাগ এবং উস্তাদগণকে স্বরচিত আপকে সুওয়ালাত আওর উনকা হল এবং জাওয়াহিরুল ফাতাওয়া হাদিয়া দিলেন।

আমাদের মেহমানদারীর ব্যবস্থা করেছিলেন ভাই ত্বলহা। কিন্তু হুযূর এক প্রকার জোর করেই তার কাছ থেকে মেহমানদারি কিনে নিলেন। ত্বলহাকে খানা খরচ তিনিই দিয়ে দিলেন। দুপুরের খাবার মুরগি বিরিয়ানি। পেটে ক্ষুধা ছিল কম না, তাই গোগ্রাসে উদরপূর্তি করলাম। খানা শেষে নীচে আসলাম। সাক্ষাৎ হলো প্রবীণ আলেমে দীন লালবাগ মাদরাসার প্রাক্তন মুহাদ্দিস হযরাতুল আল্লাম শামসুল আলম সাহেব দা.বা.-এর সাথে। হুযূরের সাথে মুসাফাহা করে হস্তদ্বয় বরকত পরশিত হলো।

আসরের ওয়াক্ত সমাগত। নামাযের তৈরি নিয়ে মসজিদে প্রবেশ করলাম। মাদরাসার দক্ষিণ পার্শ্বে নব নির্মিত মসজিদ। প্রতি তলায় প্রায় আঠারো শত মুসল্লী একসাথে নামায আদায় করতে পারে। আসরের পর হযরাতুল আল্লাম মুফতী কেফায়াতুল্লাহ সাহেব দা.বা.-এর সাথে সাক্ষাৎ করতে গেলাম। তিনি আমাদের আমীরে সফর হযরত মুফতী ইবরাহীম হাসান সাহেব হুযূরের সহপাঠী। হুযূর অসুস্থ, পায়ে ব্যথা। তাই নামায কামরায়ই আদায় করেছেন। আমরা কামরার সামনে দাঁড়িয়ে। হুযূর নামায শেষ করে বেরিয়ে আসলেন। হুযূরকে আমরা দু’ একজন বাদে কেউই চিনি না। মাথায় কালো চুল, দাড়িও কাঁচা। মাঝারি গড়নের এক ব্যক্তিত্ব। হুযূরের বয়সি অন্যান্য সবাইকে দেখলে বৃদ্ধ মনে হয়, শুধু হুযূর ব্যতিক্রম। সালাম মুসাফাহা করে মুআনাকা করলেন প্রথমে ইবরাহীম হাসান সাহেবের সাথে। আমরাও মুসাফাহায় ধন্য হলাম। রুমে গিয়ে বসলাম। হুযূর যেমন মার্জিত পোশাক-আশাকে সজ্জিত, রুমটিও তেমনি পরিপাটি। এক জায়গায় লেখা দেখলাম ‘সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎ শ্রেয়, প্রয়োজনের অতিরিক্ত কথা না বললে ভালো হয়’। কথাটি অনেক মূল্যবান মনে হলো। আমাদের আমীরে সফর সাহেব হযরতের খেদমতে আমাদের জন্য কিছু নসীহতের দরখাস্ত করলেন। হামদ ও সালাতের পর হুযূর সংক্ষেপে অনেক মূল্যবান নসীহত করলেন। প্রসিদ্ধ আছে, হুযূর যখনই কথা বলেন অনেক গভীরে চলে যান। হুযূর বললেন,

সাহাবায়ে কেরামের পরস্পরের সাথে যখন সাক্ষাৎ হতো তখন তারা নসীহত কামনা করতেন। কারণ আমরা যদি কোনো দুর্গম পথের পথিক হই বা অচেনা রাস্তার যাত্রী হই তাহলে আমাদের চিন্তা হয়, ভয় হয়, আমরা হয়ে পড়ি ভীত সন্ত্রস্ত। সারাক্ষণ কেবল একটাই ফিকির একটাই যিকির কীভাবে পার হব। কীভাবে অতিক্রম করব। কীভাবে পথ পাড়ি দেব। যে রাস্তাই হোক না কেন। স্থলের রাস্তা হোক, সমুদ্রের পথ হোক বা কোনো পাহাড় মরুভূমির রাস্তা হোক, সবখানেই ভয় কাজ করে। চিন্তা পেরেশানি আসতে থাকে। ঐ সময় ঐ পথ সম্পর্কে যে জানে, যে চেনে, যে অবগত তার থেকে আমরা পথ চিনে নিই। পরিচয় গ্রহণ করি। নসীহত তলব করি। পাথেয় সংগ্রহ করি। এই জন্য নয় যে এই ব্যক্তি অনেক বড়ো বুযুর্গ, নসীহত তলব করলে দু‘আ দিবে, তাওয়াজ্জুহ দিবে, সওয়াব হবে। সওয়াব হোক বা না হোক তা অন্য কথা। তাছাড়া সাহাবায়ে কেরামের সামনে বর্বরতার যুগ ছিল। নতুন মুসলমান হয়েছেন। কুরআনে কারীমের ঐ সমস্ত আয়াত তাদের সামনে ছিল, যাতে কবরের আযাব, জাহান্নামের শাস্তির বিবরণ বিশদভাবে বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন,

اقْتَرَبَ لِلنَّاسِ حِسَابُهُمْ وَهُمْ فِي غَفْلَةٍ مُعْرِضُونَ.

অর্থ : মানুষের হিসাব-নিকাশের সময় আসন্ন, কিন্তু তারা উদাসীনতায় মুখ ফিরিয়ে রয়েছে। (‘সূরা আম্বিয়া’- ১)

তাই সদা সর্বদা সাহাবায়ে কেরামের অন্তরে ভয়ভীতি ছিল। কীভাবে জাহান্নাম থেকে বেঁচে জান্নাতে যাওয়া যায়। এই শঙ্কায় একে অপরের নিকট নসীহত কামনা করত, ছোটো বড়ো সকলের নিকট। সবচেয়ে বড়ো নসীহত হলো আল্লাহকে ভয় করা।

فمن يعمل مثقال ذرة خيرا يره.

অর্থ : কেউ অণু পরিমাণ সৎকর্ম করলে সে তা দেখতে পাবে এবং কেউ অণু পরিমাণ অসৎ কর্ম করলে সে তাও দেখতে পাবে। (‘সূরা যিলযাল’- ৭, ৮)

আখেরাতে হিসাব হবে দুই জিনিসের, ভালো এবং মন্দের। যখন অন্তরে আল্লাহ তা‘আলার ভয় থাকে না তখন বেশি বেশি গুনাহ হয়। আর যখন ভয় থাকে তখন নেক আমল হয় বেশি। التقوى يزيد وينقص (খোদাভীতি কখনো বেড়ে যায় কখনো কমে যায়)। সাহাবায়ে কেরাম অপরকে নসীহত এভাবে করতেন, اوصيكم بتقوى الله। ঈমানের দালায়েল বা প্রমাণাদি কুরআন পাকে রয়েছে। ঈমান আসার জন্য শর্ত হলো ইলম। কিন্তু মানুষের মাঝে ইলম কম। العلم قبل العمل আমলের পূর্বে ইলমের স্থান। যেমন আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন, فاعلم انه لا اله الا الله …

তুমি শেখো যে, তিনি ছাড়া কোনো মা’বূদ নেই। (‘সূরা মুহাম্মদ’- ১৯)

ইলম ছাড়া বান্দা তো মুকাল্লাফই হয় না। আর পাগলের উপর কোনো বিধান আরোপ হয় না। افحسبتم انما خلقناكم عبثا তোমরা ভেবেছ যে তোমাদের সৃষ্টি করা হয়েছে অনর্থক? (সূরা মু’মিনুন- ১১৫) অর্থাৎ (মানব সৃষ্টি) عبث (অনর্থক) হিসেবে না। তো بعث প্রমাণিত হলো। যারা বলেন, মৃত্যুর পর মানুষ মাটি হয়ে যাবে, আল্লাহ তা‘আলার কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে না, আখেরাত বলতে কিছু নেই, তাদের এ ধারণা ভুল। কারণ আল্লাহ তা‘আলা পরবর্তী আয়াতে ইরশাদ করেন, فتعالى الله الملك الحق

আল্লাহ পাক সব দোষ-ত্রুটি থেকে মুক্ত। عبث (অনর্থক) এর দোষ থেকেও মুক্ত হবেন। কারণ (আরশ) عرش এর অর্থ টেবিল, যে টেবিল থেকে ফয়সালা সঠিক আসে, ন্যায়ের হয় সেই টেবিল কারীম হয়। আল্লাহ তা‘আলার আরশ বা টেবিল কারীম। এর দ্বারা সুবিচারের প্রতি ইশারা। পুনরুত্থানও হবে হিসাবনিকাশও হবে। বিচার ও ফয়সালা ন্যায়ের হবে, সুবিচার হবে। এসব সত্য সূর্যের মতো স্পষ্ট। প্রথমত এসব বিষয়ের প্রতি ঈমান আনা আবশ্যক। যখন এসব বিষয় সবিস্তারে অবগত হবে তখনই ঈমান অর্জন হবে; অন্যথায় নয়। বোঝা গেল, ইলমের উপর ঈমান নির্ভরশীল। জ্ঞান সকলের রয়েছে, কিন্তু জ্ঞানের স্তরের পরিমাণ সকলের এক নয়। জন্মগতভাবেই আল্লাহ পাক সবাইকে ইলম দিয়ে রেখেছেন। আর সেই ইলমের কারণে বান্দা ঈমানের মুকাল্লাফ হয়। যার ইলম যত বেশি তার ঈমান তত পাকাপোক্ত আর তত মজবুত বা বেশি। যেমন ইরশাদ হয়েছে,

يرفع الله الذين امنوا …

অর্থাৎ, ইলমের বিভিন্ন স্তর রয়েছে। যার ইলম যে স্তরের তার ঈমান সে স্তরের হবে।

আমি কে, আমার স্রষ্টা কে, তার সাথে সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিৎ, সেই সম্পর্কের তাকাযা বা চাহিদা কী? প্রথমে এগুলো জানতে হবে, শিখতে হবে, বুঝতে হবে। তারপর ঈমান আসবে। মূর্খ লোকেরও আকল-জ্ঞান আছে। কমপক্ষে জানোয়ার থেকে তো বেশি। فاعتبروا يا اولى الابصار.

ঈমান শুরু হয় ইলম থেকে এবং ঈমানের স্তর বুলন্দ হবে ইলমের মাধ্যমেই। আখলাকের ইলম, আ’মালের ইলম, উসূলাতের (মৌলিক) ইলম, ফুরূ‘আতের (শাখা-প্রশাখা) ইলম যার যত বেশি হবে ঈমানও তার তত বুলন্দ হবে। فروعات ও جزئيات-এর ইলম অর্জন করবেন? এরও মূল ভিত্তি ঈমান। কারণ যদি এসব ইলমের দ্বারা ঈমান বাড়ে আখলাক সুন্দর হয় তাহলে ইলম সঠিক; অন্যথায় সঠিক নয়।

এসব ইলম امنوا এবং اتقوا الله কেই বৃদ্ধি করবে। ইলমের অনেক মারাহিল বা স্তর রয়েছে। কিছু মাসাইল বৃক্ষের কাণ্ডের মতো আর কিছু মাসাইল ডালপালা শাখা-প্রশাখার মতো। আবার কিছু মাসাইল আছে পাতার মতো। এখন কেউ যদি মনে করে যে, গাছের মাকসাদ কেবল তার পাতাই, তাহলে বলব, সে গাছের আসল উদ্দেশ্যই বোঝে নি। বলতে পারে পাতাও তো বিক্রি হয়। আমার বাপ-দাদাকে পাতা বিক্রি করতে দেখেছি, গাছের মাকসাদ পাতা। তাহলে আসলে বড়ো ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হবে। গাছের আসল উদ্দেশ্য তো ফল। ফল বিক্রি করবে লক্ষ কোটি টাকা। এমন ফল যা দর্শকের নয়ন সহজেই কাড়ে। রসে টইটম্বুর, ঘ্রাণে বিমোহিত করে। ইলমের অনেক স্তর রয়েছে যা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ তাকে প্রথমে গ্রহণ করতে হবে।

রাসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র অভ্যাস অনুযায়ী হযরত মুফতী সাহেব আমাদেরকে বয়ানের শেষ দিকে এসে পূর্ণ বয়ানের সার সংক্ষেপ বলে দিলেন যা মূলত দুটি বিষয় ছিল। কথা দুটি হুযূরের ভাষায়,

এক নম্বর কথা হলো, تقوى অর্জন করা। দুই নম্বর, علم التقوى বা তাকওয়ার ইলম অর্জন করা। ঈমানের ইলম সর্বপ্রথম শেখা। এখন তো উলটো হয়ে গেছে। মৌলিক ইলমের পরিবর্তে শাখাগত ইলমের পেছনে দৌড়ায়, এটা ঠিক নয়।

সময়ের স্বল্পতার কারণে হুযূর এখানেই বয়ান শেষ করে দিলেন। দেখতে নবীন প্রবীণ এই প্রথিতযশার মুখ নিসৃত জ্ঞানগর্ভ আলোচনা আমরা সবাই মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় শুনছিলাম। এই স্বল্প সময়ের মধ্যে হুযূরের খাদেমগণ রং-বেরঙের নাশতা দিয়ে দস্তরখানা সজ্জিত করে ফেললেন। নাশতা সেরে হুযূরের কাছ থেকে বিদায় নিলাম। সময়ের স্বল্পতার কারণে মাদরাসা পুরোপুরি ঘুরে দেখা হলো না। তেমন কোনো তথ্যও সংগ্রহ করা গেল না। তবে মাদরাসার প্রধান ফটকের একপার্শ্বে মৌলিক কিছু তথ্য লিখিত পেলাম। তাহলো, প্রতিষ্ঠাতা হলেন হযরত হাবীবুল্লাহ রহ.। প্রতিষ্ঠাকাল ১৯০১ খ্রিস্টাব্দ, জমির পরিমাণ প্রায় সোয়া চার একর।

মেখল মাদরাসায় কিছুক্ষণ

মাগরিব ছুঁই ছুঁই, আযানের পাঁচ ছয় মিনিট বাকি। ঐদিকে মেখল মাদরাসা যিয়ারত এখনো বাকি রয়ে গেছে। ফেরার সময় পরিচিত অনেক ছাত্র এসে আমাদের উস্তাদগণের কাছে দু‘আ মুসাফাহার জন্য ভিড় জমালো। সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে জামি‘আ আহলিয়া মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারীর গেট পার হলাম গাড়িতে চড়ে। গাড়ি দ্রুত হাঁকাতে চাইলেন ড্রাইভার হেলাল ভাই, কিন্তু সম্ভব হলো না। কারণ আমাদের মতো আরো অনেক গাড়ি একই সাথে আগে যেতে চায়। ফলে যানজটের সৃষ্টি হয়। যাহোক, এক পা সামনে দুপা পিছনে করতে করতে বান্দরবানের রাস্তা হয়ে গাড়ি দুর্দান্ত বেগে ছুটতে লাগল। কিছুদূর গিয়ে ডানে আকাবাঁকা সরু রাস্তা চলেছে মেখলের দিকে। মনে হলো পুরান ঢাকার গলি দিয়ে চলছি। আমরা পথ চিনি না। রাহবার মুজাহিদ ভাই দিক নির্দেশনা দিচ্ছেন। মেখল মাদরাসায় পৌঁছে দেখলাম ছাত্ররা মাগরিব আদায় করে মসজিদে পড়াশোনায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। জরুরত সারলাম। নামায আদায় করলাম। নামাযান্তে হযরত মুহতামিম সাহেবের সাথে মুলাকাত করতে গেলাম। মুফতী নো’মান আহমাদ সাহেব। মুফতীয়ে আযম ফয়যুল্লাহ রহ.এর দৌহিত্র। একই সাথে মুফতী সাহেব রহ. মুফতী নো’মান সাহেবের দাদা অর্থাৎ দাদার ভাই। মুফতী নো’মান সাহেবের আব্বাজান চাচাত বোন বিয়ে করেছেন। হুযূরের অনুমতি নিয়ে কামরায় প্রবেশ করলাম। অপরূপ সৌন্দর্যের সমন্বয় ঘটেছে কামরাটিতে। কামরার প্রত্যেকটি বস্তু স্ব-স্ব স্থানে অত্যন্ত পরিপাটি করে রাখা। হুযূরের উন্নত চরিত্রের পরিচয় ফুটে উঠল আমাদের সামনে এ অল্প সময়েই। হুযূরের হাস্যোজ্জ্বল চেহারা, অমায়িক হৃদ্যতা, সরল আলাপচারিতা প্রথম সাক্ষাতেই যে কাউকে তার ভালোবাসার ডোরে বেঁধে ফেলে। আমাদের ঢাকায় ফেরার তাড়া। তবুও অনেকক্ষণ হুযূরের মালফূযাত শ্রবণ করলাম। হুযূর মাদরাসা এবং মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা হযরত মুফতীয়ে আযম রহ.এর বর্ণাঢ্য জীবনের একটুখানি ঝলকে আমাদের আলোকিত করলেন।

মেখল মাদরাসাটি একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত মাদরাসা। হযরত মুফতী সাহেব রহ. নিজ জায়গাতেই মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন, কারো কাছে কখনো হাত পাতেন নি। প্রথমে তিনি দরস শুরু করেন পুকুরের পাড়ে গাছের নীচে। ছাত্ররা পুকুরের চারপাশে সবক ইয়াদ, তাকরার, মুতালাআ করত।

মাদরাসার কোনো বোর্ডিং ছিল না; আজও নেই। নেই কোনো বাবুর্চি। বাবুর্চি মাদরাসার ছাত্ররাই। ২০/২৫ জনের এক একটা গ্রুপ করা আছে। তাদের রান্না-বান্না যে গরিব ছাত্রটি করে দেয় তার খাবারের ব্যবস্থা এ সকল ছাত্রদের সাথে হয়ে যায়। মাদরাসার গতানুগতিক কোনো কালেকশন নেই।

কুরবানীর সময় ছাত্ররা কুরবানীর পশুর চামড়া সংগ্রহ করে পাঠিয়ে দেয় হাটহাজারী মাদরাসায়। হযরত মুফতী সাহেব হুযূর চালু করে গেছেন এই কর্মধারা। হুযূর বলতেন, আমার গায়ের চামড়া হাটহাজারী মাদরাসায় দিয়ে দিলেও ঋণ পরিশোধ হবে না। এইজন্য সারাজীবন তিনি হাটহাজারীর জন্য সর্বস্ব কুরবান করে দিয়েছেন। তিনি জীবদ্দশায় মেখল থেকে পায়ে হেঁটে গিয়ে হাটহাজারী মাদরাসায় দরস দিতেন। ফতওয়ার শেষে বা অন্য কোথাও যখন দস্তখত করেছেন তখন মুফতী ফয়যুল্লাহ হাটহাজারীই লিখতেন; কখনো মেখল লিখতেন না। হুযূর বলতেন, আমি বড়ো হয়েছি হাটহাজারীর কারণে। আমার ভিন্ন কোনো অস্তিত্ব নেই, তাই হাটহাজারীর নাম ছাড়া মেখল লিখা আমার জন্য সমীচীন নয়। যতদিন হুযূর জীবিত ছিলেন হাটহাজারী ছাড়া কিছুই বুঝতেন না। আর হাটহাজারী মাদরাসার কর্তৃপক্ষও হুযূরের কথার পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুসরণ করতেন; এক চুলও ব্যতিক্রম করতেন না। একবার মুফতী সাহেবের মর্জির খেলাপ একটি সিদ্ধান্ত কর্তৃপক্ষ নিলে হুযূর হাটহাজারী থেকে চলে আসেন। তখনকার মুহতামিম সাহেব বুঝতে পেরে হযরতের খেদমতে মেখল চলে আসেন। হুযূর বললেন, আজ থেকে আমি আর হাটহাজারী যাব না। মুহতামিম সাহেব বললেন, তাহলে আমিও আর হাটহাজারী যাব না। অতঃপর অনেক অনুরোধের পর তিনি হাটহাজারী যান।

আমাদের হুযূর মুফতী নো’মান আহমাদ সাহেবকে জিজ্ঞাসা করলেন,

-কালেকশন না থাকলে বোর্ডিং, মাদরাসা কীভাবে চলে?

তিনি ভাব গাম্ভীর্যের সাথে হৃদয় নিংড়ানো ইখলাসের সাথে বললেন,

ইখলাস থাকলে সম্ভব। হেদায়া পর্যন্ত জামাত, প্রায় আড়াই হাজার ছাত্র। আমাদের এখানে ছাত্ররা নিজেরাই খোরাকি খরচ বহন করে। অনেক গরিব ছাত্র আছে যারা অনেক সময় তিন চার দিন না খেয়ে ক্লাস করে। কোনো ছাত্র এসে হয়তবা আমাদের অবগত করে। আমি অনেক সময় নিজেই তাদের মেহমানদারি করি, অনেক সময় দান সদকার কিছু টাকা থাকে তা দিয়ে ব্যবস্থা করি। তবে বিষয়টার ব্যাপকতা ঘটাই না; তাতে আমরা কুলিয়ে উঠতে পারব না। আর উস্তাদদের বেতন বাবদ কিছু লোক টাকা দিয়ে যান, তাতে বেতন আর বকেয়া পড়ে না। আমরা যে ভবনটিতে বসেছিলাম সেটি এক ব্যক্তি নিজ অর্থে করে দিয়েছেন। ছাত্রদের উন্নত আমল-আখলাক, নিরলস অধ্যাবসায়ের সাথে তাবলীগের সাথে সংশ্লিষ্টতার মাত্রা বিষ্ময়কর। প্রতি সপ্তাহে চব্বিশ ঘন্টার জামাত বের হয়। সপ্তাহে প্রায় ৫০/৬০টি জামাত ছাত্রদের মাধ্যমেই পরিপূর্ণ হয়।

কথার মাঝে আমাদের সামনে অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে হুযূর মেহমানদারি পেশ করলেন। বাংলা কলা, বিস্কুট, চানাচুর আর ঠাণ্ডা কোমল পানীয়তে উদর শান্ত হলো। আর হুযূরের উদারতা ও মহানুভবতায় হৃদয় প্রশান্ত হলো। পরিশেষে মরহুম মুফতী হুযূরের কিছু কুরবানীর কথা উল্লেখ করলেন। হযরত মুফতী সাহেব রহ.এর ত্যাগ তিতিক্ষা ও ইখলাসে ভরপুর কুরবানীর বরকতে ঐ এলাকা এখন প্রায় বিদআতমুক্ত। অধিকাংশ মসজিদ এখন হক্কানী উলামাদের হস্তগত। হযরতের রূহানী ফয়েয এবং তার যোগ্য উত্তরসূরির প্রচেষ্টায় তার স্বপ্ন দিন দিন পরিপূর্ণতায় পৌঁছাচ্ছে।

ঢাকার পথে

রাত প্রায় আটটা। আমরা মাদরাসা থেকে বের হলাম। মাদরাসা থেকে আনুমানিক একশ গজ উত্তরে মুফতী সাহেব রহ.এর নামে নির্মিত গ্রামের মসজিদের পাশে তিনি সুখ নিদ্রায় শায়িত আছেন। চালকের তাড়ার কারণে গাড়ি থেকে নামার সুযোগ হলো না। গাড়িতে বসে কয়েকখানা আয়াত, দু‘আ-দুরূদ পড়ে হযরতের রূহে বখশিশ করে নিজেদেরকে ধন্য করলাম। তবে একধরনের অপূর্ণতা ও অতৃপ্তির অনুভূতি অনেকক্ষণ আমাদের অন্তরে বিরাজ করছিল হুযূরের শিয়রে গিয়ে দাঁড়াতে না পেরে। এতক্ষণে দায়িত্ব থেকে অব্যহতি পেয়ে গাড়ি এবং গাড়ির ড্রাইভারদ্বয় মনে হয় স্বস্তির দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। গাড়ির মুক্ত গতি এবার সরাসরি ঢাকার দিকে। সামনে রাউজান মহাসড়ক হাটহাজারী মাদরাসা সড়কের মিলনস্থলে রাহবার ভাই মুজাহিদকে নামিয়ে দেওয়া হলো। আমরা তাকে অনেক শুকরিয়া জানালাম। হুযূরগণ সাথে সাথে অনেক দু‘আও করলেন তার জন্য। গাড়ি চট্টগ্রাম শহরে ঢুকবে না। সন্ধ্যার পরে শহরে প্রচণ্ড যানজট থাকে। তাই বাইপাস রুটে ক্যান্টনমেন্টের ভিতর দিয়ে গাড়ি প্রবেশ করল। সামনে সেনা চেকপোস্ট, গাড়ি থমল। একজন সেনা গার্ড ড্রাইভারের জানালা দিয়ে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন,

-কোথা থেকে এসেছেন, কোথায় যাবেন?

-হাটহাজারী থেকে এসেছি, ঢাকায় যাব।

সহজ প্রশ্ন সহজ জওয়াব। এরপর তিনি আহমদ শফী সাহেব মাদরাসায় এসেছেন কি না জানতে চাইলেন। হুযূর অসুস্থ অবস্থায় ঢাকার এক হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। আমাদের প্রতি সন্দেহ, না কি হুযূরের প্রতি সহমর্মিতা আর মহব্বতের কারণে জিজ্ঞাসা করলেন জানি না। উত্তর দিলাম,

-হুযূর কিছুটা সুস্থ, মাদরাসায় এসেছেন।

আমাদেরকে ছেড়ে দিলেন। রাস্তার দুই পাশে পাহাড় আর পাহাড়। সেনাদের জন্য উপযুক্ত ঘাঁটি। পাহাড়ের উপর অল্পস্বল্প জনবসতিও রয়েছে। দরজা, জানালা অথবা বেড়ার ফাঁকা দিয়ে ঘরের ভিতরের জ্বলন্ত বাতির ক্ষীণ আলো পরিলক্ষিত হচ্ছে মাঝে মাঝে দু’ একটি পাহাড় থেকে। দ্বাদশ রজনীর চাঁদের স্নিগ্ধতায় ঘন সবুজের পাহাড় চমৎকার লাগছিল। তবে হঠাৎ হঠাৎ নির্জনতা এক অজানা ভীতির সঞ্চার করছিল মনের মাঝে। আকাবাঁকা পথ অতিক্রম করে কলাতিয়া হয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে এসে উঠল আমাদের গাড়ি। ঈশার নামায এখনো আদায় করা হয় নি। ছাগলনাইয়ায় এক ফিলিং স্টেশনে আমরা নামলাম। রাত তখন এগারোটার বেশি। নামায আদায় করে আরো একটু পথ অতিক্রম করলাম। বেশিক্ষণ চলার শক্তি নেই, পেটে ক্ষুধা সবার। রাস্তার ডানে একটা হোটেল দেখে গাড়ি থামানো হলো। সবজি, মাছ, ডাল দিয়ে সান্ধ্যকালীন ভোজ মধ্যরাতে সারলাম। এবার ঊর্ধ্বশ্বাসে গাড়ি ঢাকার উদ্দেশে দৌড়াতে লাগল। মনে হয় এক দৌড়ে ঢাকায় গিয়ে পৌঁছবে। কিন্তু দেশের সর্বাধিক ব্যস্ততম সড়কে তার আর জো নেই। ওভারটেকিংয়ের তেমন সুযোগ নেই। আবার মাঝে মাঝেই জ্যামের কারণে গাড়ি বন্ধ করে বসে থাকতে হয় দীর্ঘ সময়। গাড়ি কখনো চলছিল, কখনো থামছিল আর আমরা চোখ বুজে বসে বসে ঝিমিয়ে চক্ষু লাল করছিলাম। একসময় আমাদের গাড়ি যখন কাঁচপুর ব্রিজের কাছে পৌঁছল, তখন মুয়াযযিন সাহেবের ‘আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার’ … ‘আস্সালাতু খাইরুম মিনান নাউম’ ধ্বনিতে ঘুমন্ত রজনীর নীরবতার ঘোর কাটিয়ে পৃথিবীর সবকিছু চোখ মলতে মলতে জাগ্রত হতে লাগল।

ফজরের জামাআতের মিনিট দশেক পূর্বে আমাদের গাড়ি বাইতুল মুয়াজ্জম মসজিদের সামনে এসে থামল। হযরত আমীরে সফর নেমে বাসায় গেলেন। অতঃপর হযরত আহমাদুল্লাহ সাহেব হুযূরকে হুযূরের বাসার সামনে নামিয়ে দিলাম। দু’ চার মিনিট পর বুদ্ধিজীবী সেতু আমাদের চোখে উদ্ভাসিত হলো। মুদীর সাহেব হুযূরের তালকীনে সফর শেষের দু‘আ (ائبون تائبون عابدون لربنا حامدون) পড়ে নিলাম। মাদরাসায় নামায পড়ে একটানা ঘুম, ১০টা পর্যন্ত। পেটের ক্ষুধায় ঘুম আর দীর্ঘায়িত করা গেল না। হোটেল থেকে নাশতা এনে খেয়েদেয়ে আবার ঘুম দিলাম যোহর পর্যন্ত। সফরের ক্লান্তি কাটতে আরো দুই দিন লেগে গেল।

সফরের পর মাদরাসায় এসে সাগর তীর থেকে কিনে আনা প্রত্যেকের সখের জিনিসগুলো নিজের চারপাশ দিয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দিয়ে শুরু হলো তার পৌনঃপুনিক গণনা। নাড়াচাড়া আর প্রিয় মানুষদের জন্য তার বণ্টন। বণ্টন করতে গিয়ে অনেক জিনিসের স্বল্পতা অনুভব করলাম। সামান্য আফসোস ও আক্ষেপও হলো। কেন অমুক জিনিসটা কিনলাম না, কেন অমুকের জন্য কিছু আনলাম না? পরক্ষণে আন্তরিকভাবে লজ্জিত ও অনুতপ্ত হলাম যে, পার্থিব সামান্য নুড়ি-পাথর আর শামুক-ঝিনুকের জন্য যদি আফসোস হয়, কিয়ামতের দিন সওয়াব এবং নেক আমলের স্বল্পতার কারণে কতখানি আফসোস হওয়ার কথা! এবং তার জন্য আক্ষেপ হওয়া তো যুক্তিযুক্ত। পরকালে যাতে নেক আমলের অনটনে পড়তে না হয় সেজন্য সবার তরে দু‘আ চেয়ে আজ এখানেই বিদায় নিচ্ছি। খোদা হাফেয।

লেখক :

মুহতামিম, বাইতুস সুন্নাহ মাদরাসা, কালিগঞ্জ, মাদারীপুর।

পোস্টটি লাইক ও শেয়ার করুন।

একটি মন্তব্য লিখুনঃ

Your email address will not be published. Required fields are marked *