মাওলানা আব্দুল মালেক সাহেব দা.বা.
হামদ সালাতের পর,
الٓمٓ ذٰلِكَ الْكِتَابُ لَا رَيْبَ فِيهِ هُدًى لِّلْمُتَّقِينَ
আমরা তাকওয়া এবং মুত্তাক্বী সম্পর্কে আলোচনা করছিলাম। কুরআনুল কারীমের আলোকে তাকওয়ার গুরুত্ব, মুত্তাকী কারা? তাদের গুণাবলি? এ বিষয়ে কথা হচ্ছিল। তাকওয়া এমন গুরুত্বপূর্ণ একটা গুণ যা না হলে ঈমানই হয় না। প্রত্যেক নবী তাওহীদের দাওয়াত নিয়ে এসেছেন। তাওহীদের দাওয়াতের ভাষ্য ছিল, একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করো, তাকওয়া অবলম্বন করো এবং নবীর আনুগত্য করো। আল্লাহ একমাত্র মা’বূদ, ইবাদত একমাত্র আল্লাহর জন্য। আল্লাহরই ইবাদত করো— এ কথাটাকেই নবীগণ দুইভাবে বলতেন। আল্লাহ ব্যতীত কারো ইবাদত করো না আর আল্লাহকে ভয় করো। কুরআন কারীমে নবীদের যে দাওয়াতের কথা বলেছে তা ছিল এই, একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করো, একমাত্র আল্লাহকে ভয় করো, তাকওয়া অবলম্বন করো আর নবীর আনুগত্য করো। সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খাতামুন্নাবিয়্যীন, সর্বশেষ নবী, শ্রেষ্ঠ নবী এবং বিশ্ব নবী। সব নবীই শ্রেষ্ঠ; কিন্তু আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদের নবীকে সকল নবীর ইমাম বানিয়েছেন, তাকে সায়্যিদুল মুরসালীন বানিয়েছেন। নবীর আনুগত্য, আল্লাহ ইবাদত ও তাকওয়া— এটার নাম হল ঈমান। কুরআনুল কারীমে প্রথম সূরা ‘সূরা ফতিহা’ এরপর দ্বিতীয় ‘সূরা আলিফ লাম মীম’। আলিফ লাম মীমের মধ্যে প্রথমেই আল্লাহ বলেছেন, কুরআনুল করীম এতে কোনো ধরনের কোনো সন্দেহ নেই। এটা আল্লাহর কালাম। এতে কোনো সন্দেহ নেই। এটাতে যা আছে সব নূর এবং হিদায়াত। এতেও কোনো সন্দেহ নেই। এ কিতাবকে আল্লাহ কেয়ামত পর্যন্ত সংরক্ষণ করবেন, হেফাযতে রাখবেন। এতেও কোনো সন্দেহ নেই। لا ريب فيه এতে কোনো সন্দেহ নেই।
এখন এ কিতাব তো হিদায়াত। কার জন্য হিদায়াত? هُدًي لِّلمتقين মুত্তাকীদের জন্য হিদায়াত। তাকওয়ার যিন্দেগী কুরআন থেকেই শিখবে; কিন্তু তাকওয়া যদি না থাকে তাহলে কুরআন থেকে উপকৃত হতে পারবে না। যার মধ্যে আল্লাহর ভয় নেই, আখেরাতের বিশ্বাস নেই সে কি কুরআনুল কারীমের হিদায়াত গ্রহণ করবে? কখনো গ্রহণ করবে না। কুরআনুল কারীম পুরোটাই হিদায়াত। যদি গুমরাহী থেকে বাঁচতে চাই, হিদায়াত পেতে চাই, তবে একমাত্র পথ কুরআনে কারীম। যদি অন্ধকার থেকে বাঁচতে চাই, আলো গ্রহণ করতে চাই, তাহলে উপায় হল কুরআনে কারীম। আলোকিত মানুষ কেমন হয় তা কুরআন থেকে নিতে হবে। আলোকিত মানুষ চাই আর কুরআনের সাথে কোনো সম্পর্ক নেই, তাহলে আলোকিত মানুষ পাবেন না। আলোকিত মানুষ হতে হলে তাকওয়া থাকতে হবে। তাকওয়া কাকে বলে? তাকওয়ার জীবন কেমন হয়? এটা বুঝতে হলে কুরআনের দ্বারস্থ হতে হবে, কুরআনের দিকে আসতে হবে। هدي للمتقين হিদায়াত মুত্তাকীদের জন্য।
আজকাল ঈমানের বিষয়ে আমাদের ফিকির একটু কম। ঈমান কাকে বলে? ইসলাম কাকে বলে? এটা নিয়ে আমাদের ফিকির একটু কম। ফিকির বাড়াতে হবে। কাকে বলে ঈমান? কাকে বলে ইসলাম? কাকে বলে তাকওয়া? কালিমা একবার পড়েছি তো ঈমান আনা হয়ে গেল। কিন্তু ঈমান কি এমন জিনিস যে ঈমান আনলাম আর রেখে দিলাম! কখনো না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন (সূরা ইবরাহীম; আয়াত ২৪),
اَلَمْ تَرَ كَيْفَ ضَرَبَ اللهُ مَثَلًا كَلِمَةً طَيِّبَةً كَشَجَرَةٍ طَيِّبَةٍ اَصْلُهَا ثَابِتٌ وَفَرْعُهَا فِي السَّمَاءِ
কালিমায়ে তায়্যিবার মাধ্যমে আমি ঈমান এনেছি। ঈমান কী জিনিস আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে বুঝিয়েছেন যে কালিমায়ে তায়্যিবা হল شَجَرَةٍ طَيِّبَة তথা একটা পবিত্র গাছের মত। ঈমানের কালিমা আমি পাঠ করলাম, অন্তর থেকে বিশ্বাস করলাম— এর অর্থ হল, আমি একটা গাছ রোপন করলাম। কালিমার মাধ্যমে আমি যে পবিত্র গাছ রোপন করেছি তা কোথায়? কলবের যমীনে। এমনি যদি কোনো গাছ রোপন করি, তাহলে তার যত্ন নিতে হয়, পানি দিতে হয়। যে গাছের যেভাবে যত্ন নেওয়ার দরকার সেভাবে যত্ন নিতে হয়, আগাছা পরিষ্কার করতে হয়, এটাকে হেফাজত করতে হয়। ঈমান নামক যে বৃক্ষ এটারও হেফাজত করতে হবে, যত্ন নিতে হবে; তাহলে তা কলবের যমীনে মজবুত হয়ে বসবে। আল্লাহ বলেন, اَصْلُهَا ثَابِتٌ وَفَرْعُهَا فِي السَّمَاءِ। গাছ যত সুন্দর ও মজবুত হবে, এটার যত বেশি যত্ন নেওয়া হবে, এটার ফলও তেমন আসবে, এটার ডালগুলো খুব ছড়াবে। ঈমান নামের বৃক্ষের ফল কী? নেক আমল, তাকওয়ার যিন্দেগী, গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা, অপরাধ থেকে বেঁচে থাকা, সমস্ত ফেতনা থেকে দূরে থাকা। এগুলো হল ঈমান নামক বৃক্ষের ফল। এ ফল আসতে থাকবে যদি আমি ঈমানকে মজবুত করতে থাকি। যত বেশি নেক আমল হবে তত বেশি এ গাছ মজবুত হবে, তত বেশি নেক আমল আসতে থাকবে। যত গুনাহ থেকে বাঁচব ঈমানের গাছটা তত বেশি শক্তিশালী হবে, গুনাহ থেকে তত বেশি বাঁচা সহজ।
ঈমান কিসের নাম? যে আক্বীদাগুলো আমরা জানি সে আক্বীদাগুলো তো আছেই,
اٰمَنْتُ بِاللهِ وملائكتهٖ وَكُتُبِه وَرَسُوْلِه وَالْيَوْمِ الْاٰخِرِ وَالْقَدْرِ خَيْرِه وَشَرِّه مِنَ اللهِ تَعَالٰى وَالْبَعْثِ بَعْدَالْمَوْتِ
অনেকগুলো আক্বীদা এই ঈমানের মধ্যে রয়েছে। ঈমানে মুফাস্সাল যেটা আমারা মকতবে পড়ে এসেছি অনেক আক্বীদা তার মধ্যে আছে। কিন্তু আক্বীদাগুলো বুঝতে হবে। এক এক আক্বীদার অধীনে কতগুলো ঈমানী কথা আছে এবং কোন আক্বীদার বিপরীত কী কী কাজ, কী কী কথা, যে সব কাজ, কথা ও চিন্তা ঈমানী আক্বীদার বিপরীত পরিপন্থি, যেকথা বললে, যেকাজ করলে ঈমান ও আক্বীদা থাকে না, কালিমা শেষ হয়ে যায়, সেগুলো জানা দরকার। কে জানবে? মুত্তাকীরা জানবে। তাকওয়া থাকলে তখন জানার ফিকির হবে। তখন সেটা নিজের মধ্যে, নিজের দিলের মধ্যে, নিজের আমলের মধ্যে বাস্তবায়ন করার চিন্তা আসবে।
ঈমানের প্রথম কথা لَا الٰهَ الَّا الله। সব ধরনের শিরক থেকে বেঁচে থাকতে হবে। একমাত্র আল্লাহ হলেন মা‘বুদ, একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করতে হবে। اِيَّاكَ نَعْبُدُ وَاِيَّاكَ نَسْتَعِينُ হে আল্লাহ আমরা একমাত্র আপনারই ইবাদত করি এবং একমাত্র আপনার কাছেই সাহয্য চাই। প্রার্থনার হাত একমাত্র কার দরবারে উঠবে? আল্লাহর দরবারে উঠবে। এই কপাল কার সেজদা করবে? একমাত্র আল্লাহকে সেজদা করবে। সেজদা একমাত্র আল্লাহর হক। প্রার্থনা একমাত্র আল্লাহর হক।
দ্বিতীয় কথা مُحَمَّدٌ رَّسُوْلُ اللهِ। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসূল। তিনি সর্বশেষ নবী, শ্রেষ্ঠ নবী, বিশ্ব নবী। তাকে আল্লাহ তা‘আলা যে শরীয়ত দান করেছেন মুক্তি, সফলতা একমাত্র ঐ শরীয়তের অনুসরণের মধ্যে রয়েছে।
আল্লাহ যে দীন তার বান্দাদের জন্য চেয়েছেন, পছন্দ করেছেন তা হল ইসলাম। দীনের জন্য একটা শরীয়ত লাগবেই। শরীয়ত বিহীন দীন; দীন নয়। অনেকে দীন মানে, কিন্তু শরীয়ত মানে না, আল্লাহর কাছে এটা গ্রহণযোগ্য নয়। আল্লাহ যে দীন আল্লাহর বান্দাদের জন্য পছন্দ করেছেন সেটা হল ইসলাম। ইসলামের একটা শরীয়ত থাকবেই। একথা আল্লাহ বলছেন, এই দীন ও ইসলামের একটি শরীয়ত আপনাকে দান করেছি এবং সেই শরীয়তের উপর আপনাকে প্রতিষ্ঠিত করে দিয়েছি, فَاتَّبِعْهَا আপনি সেই শরীয়তের অনুসরণ করুন। নবীকে আল্লাহ বলছেন, এ শরীয়ত মেনে চলুন। তাহলে নবীর উম্মতদের এই শরীয়ত মেনে চলতে হবে কি না? অবশ্যই মেনে চলতে হবে।
যাদের কাছে ওহির ইলম নেই, চাই সে হোক বড় পণ্ডিত, দুনিয়া অনেক ভালো বুঝে তাতে কিছু যায় আসে না। যাদের কাছে ওহীর ইলম নেই, ওহীর জ্ঞান নেই, তাদের খেয়াল খুশির অনুসরণ করবেন না— হে নবী! এটা হল তাকওয়া, এটা হল ঈমান ও ইসলাম। ইসলামের শরীয়ত আপনাকে দান করলাম এই কুরআনের মাধ্যমে হাদীসের মাধ্যমে। হে নবী আপনার সুন্নাত, আপনার জীবন এটাই উম্মতের জন্য আদর্শ।
যার আখেরাতের প্রতি ঈমান আছে, আল্লাহ প্রতি ঈমান আছে, যে আল্লাহর রহমত পেতে চায়, আখেরাতে শান্তি চায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনাদর্শ তার একমাত্র অবলম্বন। ওটাকেই গ্রহণ করতে হবে। সুন্নাত ও শরীয়তের মাঝেই মুক্তি ও সফলতা। যাদের কাছে ওহীর জ্ঞান নাই তারা যা বলবে, তারা যেই নির্দেশনা দিবে সেভাবে মুসলমান চলবে, আল্লাহর বান্দারা সেভাবে চলবে— এটা আল্লাহ চান না। এভাবে চললে তারা শান্তি, সফলতা ও মুক্তি পাবে না।
তারা আখেরাতে কাজে আসবে না যাদের কাছে ওহীর ইলম নেই; কিন্তু তারাই আমাদের রাহবার হতে চায়, আমাদেরকে রাহবারী করতে চায়। দেখেন না, পশ্চিমা বিশ্ব এখন পুরা বিশ্বের নেতৃত্ব দিতে চায়। তারা সব ধর্মের নেতৃত্ব দিতে চায়। আল্লাহ তা‘আলা ঘোষণা করে দিয়েছেন لَنْ يُغْنُوا عَنْكَ مِنَ اللهِ شَيْئًا এরা তোমাদের কাজে আসবে না। কবরে হাশরে এরা তোমাদের কাজে আসবে না। দুনিয়াতেও কাজে আসবে না। দুনিয়ার যিন্দেগি সফল হতে হলে এদের পিছনে চললে সফলতা পাওয়া যাবে না। কিন্তু দুনিয়াতে তো আর বুঝে না মানুষ। চোখ বন্ধ হলে যে চোখ খোলে তা হল আখেরাতের চোখ। সেটাতো এখন খোলেনি। এখন তো সহজে বুঝে আসে না। এখন মনে হয় ওরা যেভাবে আমাদের রাহবারী করবে, লিডারি করবে ওদের লিডারি অনুসারে চললে ফায়দা হবে। কিন্তু না, তাতে উপকার হবে না। لَنْ يُغْنُوا عَنْكَ مِنَ اللهِ شَيْئًا এরা আপনার উপকারে আসবে না।
وَاِنَّ الظَّالِمِينَ بَعْضُهُمْ اَوْلِيَاءُ بَعْضٍ অত্যাচারীরা একে অপরের বন্ধু। الكفر ملة واحدة মুশরিক এবং কাফের অমুসলিম যত গ্রুপ আছে সকল গ্রুপেরা এক। তাদের সবার দুশমনী ইসলামের সাথে। ইসলামের সাথে কারো দোস্তী নেই। কিন্তু আমি মুসলিম, আল্লাহ আমাকে কালিমার নিয়ামত দান করেছেন, ইসলামের নিয়ামত দান করছেন আমাকে বুঝতে হবে, আমার সফলতা আল্লাহর দেওয়া শরীয়তের মধ্যে, সর্ব শেষ নবী শ্রেষ্ঠ নবী বিশ্ব নবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাতের মধ্যে এবং তাঁর হাদীসের অনুসরণের মধ্যে। কুরআন-সুন্নাহ ও আল্লাহর দেওয়া শরীয়ত এবং আল্লাহর নবীর সুন্নাতের বাইরে গিয়ে আমরা সফলতা পাব না, মুক্তি পাব না।
এখন যারা আমাদের পরিচালনা করতে চায় তাদের পিছনে চললে আমাদের দুনিয়াও বরবাদ আখেরাতেও বরবাদ। দুনিয়া যে বরবাদ এটা হয়তো কখনো টের পাওয়া যাবে আবার কখনো টের পাওয়া যাবে না। আখেরাতের বরবাদি চোখ বন্ধ হওয়ার সাথে সাথেই শুরু হবে। তখন কোনো লিডারদেরকে খুঁজে পাওয়া যাবে না।
তারা আমাদের বন্ধু হতে পারে না। তারা একে অপরের বন্ধু। আমাদের অভিভাবক ও বন্ধু একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা যদি তাকওয়া অবলম্ভন করা হয়। وَاللهُ وَلِيُّ الْمُتَّقِينَ মুত্তাকীদের অভিভাবক একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা। তাই তাকওয়ার যিন্দেগী অবলম্বন করা কর্তব্য। শরীয়ত ও সুন্নাত মানা ছাড়া তাকওয়া অর্জন করা যাবে না। আল্লাহ তা‘আলা শরীয়তের অনুসরণের নির্দেশ দিয়েই বলছেন; وَاللهُ وَلِيُّ الْمُتَّقِينَ। যার কাছে ঈমান, ইসলাম, শরীয়ত, সুন্নাত ও ওহীর জ্ঞান নেই তাকে আমি বন্ধু বানাবো! তাকে আমি আমার রাহবার বানাবো! তাদেরকে রাহবার বানালে কোনো ফায়দা হবে না।
আল্লাহর দেওয়া এই শরীয়ত যে কুরআনে আছে যে হাদীসে আছে এগুলো হল মানুষের জন্য بَصَائِرُ অর্থাৎ আমি যদি পথ খুঁজে পেতে চাই, নির্দেশনা পেতে চাই তাহলে নির্দেশনা এই কুরআন ও হাদীসের মাঝে রয়েছে।
যদি আমি আল্লাহর প্রতি, আখেরাতের প্রতি বিশ্বাসী হয়ে থাকি, তাহলে আমার পথ পশ্চিমারা যেটা দেখায় সেটা নয়। ইয়াহুদী, খ্রিস্টান, অমুসলিমরা যেটা দেখায় সেটা নয়। আমার পথ আল্লাহ তা‘আলার দেখানো পথ। আখেরী নবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দেখানো পথ।
اَمْ حَسِبَ الَّذِينَ اجْتَرَحُوا السَّيِّئَاتِ اَنْ نَجْعَلَهُمْ كَالَّذِينَ اٰمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ سَوَاءً مَحْيَاهُمْ وَمَمَاتُهُمْ سَاءَ مَا يَحْكُمُونَ
যারা অপরাধী, পাপী, অশ্লীলতা ও দুর্নীতি যাদের মাঝে রয়েছে তারা কি ভাবছে আমি তাদেরকে ঐ লোকদের মত (আমার ঐ বান্দাদের মত) ধরে নিব যারা ঈমান এনেছে নেক আমল করেছে? আল্লাহ বলছেন, যে ঈমান আনে, নেক আমল করে, আল্লাহর শরীয়ত মেনে চলে তার হিসাব হবে একরকম। আর যে অপরাধী; পাপী, অন্যায় অবিচার যার মাঝে রয়েছে তার হিসাব হবে অন্যরকম। এই দুই পক্ষকে আমি এক বানিয়ে দিব! মুমিনদেরকে যে পুরস্কার দিব অপরাধীদের একই পুরস্কার দিব! তা কখনো সম্ভব নয়।
সমতা আর বৈষম্য কার কাছে শিখবেন? কুরআন থেকে শিখবেন। কোনটা বৈষম্য, কোনটা সমতা সেটাতো আল্লাহ ভালো জানেন। কুরআন সুন্নাহ বাদ দিয়ে সমতা প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব নয়। এর দ্বারা সমতার নামে বৈষম্য হবে। সমতা জানতে চাইলে বুঝতে চাইলে এবং আল্লাহ বান্দাদের মাঝে সমতা প্রতিষ্ঠিত করতে চাইলে কুরআন থেকে হিদায়াত নিতে হবে। তাকওয়ার যিন্দেগী প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। কুরআনের শিক্ষা ও নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহকে অবজ্ঞা করে সমতা প্রতিষ্ঠিত করতে গেলে বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনের প্রতি অবিচার হবে। এ আন্দোলনে যারা শহীদ হয়েছে, রক্ত দিয়েছে তাদের প্রতি অবিচার হবে। কারণ সমতার শিক্ষা কুরআন সুন্নাহর বাহিরে পাওয়া যাবে না।
লক্ষ করুন, আল্লাহ তা‘আলা ভাগ করে দিয়েছেন। যারা মুমিন আর যারা মুমিন নয় তারা কখনোই সমান নয়। একজন নেক আমল করে আরেকজন অপরাধ করে, তারা কখনোই সমান হবে না। যদি সমান হত তাহলে আন্দোলন করে কাউকে দেশ থেকে তাড়ানোর প্রয়োজন হত না। এর মানে, ইনসাফ আর যুলুম এক হতে পারে না। ঈমান আর মুনাফেকি এক হতে পারে না। আমানত এবং খেয়ানত এক হতে পারে না। আমানত, সততা সত্যবাদিতা আর দুর্নীতি এক হতে পারে না। তাই সমতা ও বৈষম্য কুরআন ও সুন্নাহ থেকে শিখতে হবে।
سَوَاءً مَحْيَاهُمْ وَمَمَاتُهُمْ
তাদের হায়াত ও মউত এক রকম হবে? যে ঈমান ছাড়া মারা গিয়েছে তার কবরের যিন্দেগী এবং যে ঈমান নিয়ে মারা গিয়েছে তার কবরের যিন্দেগী এক হবে না। তার হাশরের যিন্দেগীও এক হবে না। জীবদ্দশায়ও ঈমানওয়ালা ও সুন্নাতওয়ালার যিন্দেগী যতটুকু শান্তিময় হয় একজন অমুসলিমের জীবন ততটুকু শান্তিময় হতে পারে না। অথচ আল্লাহ তা‘আলা আল্লাহর প্রতি ঈমান না থাকা সত্ত্বেও তাকে আল্লাহর যমীনে থাকতে দিচ্ছেন। তিনি কাউকে মুসলিম হতে বাধ্য করছেন না। আল্লাহ তা‘আলা শরীয়তে কাউকে বাধ্য করে মুসলমান বানানোর বিধান দেননি।
আল্লাহ ঈমানের দাওয়াত দিয়েছেন। বলেছেন সবাই ঈমান আন। ঈমানের মাঝে শান্তি আছে। ঈমান ছাড়া যদি মারা যাও তাহলে আখেরাতে ধরা আছে। তবে আল্লাহ তা‘আলা একথা বলেননি যে বাধ্য করে কাউকে মুসলামান বানাও। এর অর্থ হল সকল অমুসলিমকে আল্লাহ তা‘আলা আল্লাহর যমীনে নিরাপদে থাকতে দিচ্ছেন। তাদের জান মালের নিরাপত্তা, ইজ্জতের নিরাপত্তা আল্লাহ দিয়েছেন। যদিও তারা আল্লাহর বিদ্রোহী। তারা আল্লাহর দেওয়া আবহাওয়া গ্রহণ করছে, আল্লাহর নিয়ামতে ডুবে আছে কিন্তু তারা আল্লাহকে মানে না। আল্লাহর দেওয়া শরীয়তকে বিশ্বাস করেনা আখেরাতকে বিশ্বাস করে না। তাদের জিজ্ঞাসা করে দেখেন তাদের মাঝে শান্তি আছে কি না?
অমুসলিমরা যদি জানত একজন মুসলিম ঈমানের কারণে কি পরিমাণ শান্তিতে থাকে, তাহলে তারা সকলে একসাথে ঈমান নিয়ে আসত। কিন্তু আমরা ঈমানওয়ালারা, যাদেরকে আল্লাহ ঈমানের নিয়ামত দান করেছেন তাদের ঈমান তেমন হবে। আমাদের ঈমান মজবুত হতে হবে। ঈমান যত মজবুত হতে হবে, সুন্নাতের অনুসরণ যত বেশি হবে প্রশান্তির পরিমাণও বেশি হবে। কষ্ট হতে পারে। মানুষের যিন্দেগীতে কষ্ট আসতে পারে। মানুষ সব সময় সুস্থ থাকে এমন নয়। অসুস্থতা আসে, রোগ-ব্যাধি হয়। কিন্তু এই কষ্ট, পেরেশানী, রোগ-ব্যাধির মাঝেও রয়েছে আত্মার প্রশান্তি। এমনটা কিসের কারণে হয়? ঈমানের কারণে।
সুতরাং একজন মুসলিম ও অমুসলিমের যিন্দেগী একরকম হতে পারে না। কারণ মুসলিমের কাছে শরীয়তের আলো আছে অমুসলিমের কাছে তা নেই। এখন যাদের কাছে শরীয়তের আলো আছে তারা শান্তি খোঁজে কাদের কাছে! অমুসলিমদের কাছে, যাদের কাছে শরীয়তের আলো নেই। যাদেরকে আল্লাহ আলো দান করেছেন তারা যারা অন্ধকারে ডুবে আছে তাদের কাছে আলো খোঁজে। এটা কি ভালো কথা? শান্তি তো দিতে পারে ইসলাম। তাই শান্তি আসবে ইসলামের অনুসরণের দ্বারা এবং সমতা ও বৈষম্যের শিক্ষা শরীয়ত থেকেই গ্রহণ করতে হবে।
সংস্কার ভালো। কিন্তু সংস্কারের শিক্ষা ইসলাম থেকে নিতে হবে। সংস্কারের কথা হাদীসে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ১০ হিজরীতে বলে গেছেন। প্রতি শতাব্দিতে আল্লাহ তাঁর কিছু নেক বান্দাকে— যাদের কাছে সহীহ ইলম আছে, তাকওয়া আছে— দাঁড় করান। হিম্মত ও তাওফীক দেন। তারা এই দীন ও শরীয়ত যা অন্ধকার থেকে বাঁচার আলো, বিপদ থেকে বাঁচার জন্য শান্তির বার্তা- এর মধ্যে সংস্কার করেন। তাদের বলা হয় মুজাদ্দিদ। সংস্কার হলো প্রত্যেক জিনিসকে সুন্নাতের উপর নিয়ে আসা, হিদায়াতের উপর নিয়ে আসা। যারা গোমরাহীর পথ দিয়ে যাচ্ছে বিদআতের পথ দিয়ে যাচ্ছে। তাদেরকে সুপথে ফিরিয়ে আনার নাম হল সংস্কার।
বর্তমানে আমাদের এ দেশ খুব কঠিন ও স্পর্শকাতর একটা অবস্থায় আছে। বৈষম্যের বিরুদ্ধে আমরা আন্দোলন করেছি সমতা প্রতিষ্ঠিত করার জন্য। সে জন্য আমাদেরকে সংস্কার করার প্রয়োজন হচ্ছে বিভিন্ন সেক্টরে। এখন এই সংস্কারের মধ্যে যদি ভুল হয় এবং সমতা সৃষ্টি করতে গিয়ে যদি সমতার নামে বৈষম্য সৃষ্টি করা হয় তাহলে এটা হবে অন্যায়, যুলুম ও আল্লাহর নাফরমানী। সেই সাথে জুলাই-আগষ্ট ২৪ এর শহীদদের সাথে হবে গাদ্দারী। একথা মনে রাখতে হবে এবং প্রকৃত সংস্কার যদি চাই তাহলে তার উৎস হল, কুরআন সুন্নাহ; পশ্চিমারা নয়। কিছুদিন বৃটেনের তালে চললাম, কিছুদিন আমেরিকার তালে চললাম, আবার কিছুদিন রাশিয়ার তালে! না, এ সবকিছুর পরীক্ষা হয়ে গেছে।
المجرب لا يجرب পরীক্ষিত জিনিসের আরেকবার পরীক্ষা করতে হয় না। একথা বলা যাবে না যে, আচ্ছা, পরীক্ষা করে দেখি না, এখানে শান্তি আছে কি না। এতদিন এরাস্তায় চললাম শান্তি পেলাম না, এখন আরেক রাস্তায় চলে দেখি শান্তি আছে কি না। আরে ভাই! শান্তির রাস্তা আল্লাহ দিয়ে দিয়েছেন কুরআনে। যদি মুসলিম হয়ে থাকি; আখেরাতের প্রতি বিশ্বাসী হয়ে থাকি, তাহলে কুরআনে আল্লাহ শান্তির পন্থা দিয়ে দিয়েছেন। আর সেটা হল আল্লাহর দেওয়া শরীয়ত। যে কোনো সংস্কারের আগে, সমতার নামে কোনো কিছু প্রতিষ্ঠিত করার আগে আল্লাহর ওয়াস্তে আপনারা জেনে নিবেন, আল্লাহ তা‘আলা কী বলেছেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কী বলেছেন। যদি জেনে না নেই, আর সমতার নামে এ দেশে পশ্চিমা সভ্যতা প্রতিষ্ঠিত করি তাহলে গজবের অপেক্ষায় থাকতে হবে। খএইঞছ এটা কি সমতা? না কি বৈষম্য? আমরা কী দেখছি! কী শুনতে পাচ্ছি এসব! সংস্কার পশ্চিমা সভ্যতার নাম না, সংস্কার পতিতালয়কে স্বীকৃতি দেওয়া, সমকামিতাকে স্বীকৃতি দেওয়ার নাম নয়, পুরুষকে নারী বানানো আর নারীকে পুরুষ বানানোর নাম নয়। এটা করা হলে তো একশভাগের একশভাগ বৈষম্য হল। পুরুষকে মেয়ে বানিয়ে দিবে মেয়েকে পুরুষ বানিয়ে দিবে এটা একশভাগের একশভাগ বৈষম্য।
আল্লাহর এ যমীনে, তাউহীদের এ যমীনে, মুসলিম উম্মাহর এ যমীনে আমরা চাই সকল অমুসলিম শান্তিতে থাকুক। কারো প্রতি কোন ধরনের বৈষম্য না হোক, কিন্তু ষোল আনার ষোল আনাই বৈষম্য, আল্লাহর দৃষ্টিতে বৈষম্য, শরীয়তের দৃষ্টিতে বৈষম্য, সাধারণ বিবেক বুদ্ধির আলোকেও যেটা বৈষম্য ওটাকেই যদি সমতার নাম দিয়ে এ যমীনে কেউ প্রতিষ্ঠা করতে চায় তাহলে আমরা তার কাছে ক্ষমা চাই, আল্লাহর ওয়াস্তে আল্লাহকে ভয় করুন। আল্লাহ রব্বুল আলামীন আমাদেরকে হিদায়াতের উপর প্রতিষ্ঠিত করুন। আমীন!
