দাওয়াত ও তাবলীগের গুরুত্ব ও উলামায়ে কেরামের পৃষ্ঠপোষকতার প্রয়োজনীয়তা

শাইখুল হাদীস মুফতী মনসূরুল হক দা.বা.

আল্লাহ তা‘আলা দুনিয়াতে দু’টি পথ চালু করেছেন। একটি হিদায়াত ও জান্নাতের পথ, অপরটি গোমরাহী ও জাহান্নামের পথ। কুরআনে পাকে আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন,

إِنَّا هَدَيْنَاهُ السَّبِيلَ إِمَّا شَاكِرًا وَإِمَّا كَفُورًا

‘আর আমি তাকে (মানুষকে) পথ দেখিয়েছি, হয়তো সে কৃতজ্ঞ হবে, অথবা অকৃতজ্ঞ। —সূরা দাহর; আয়াত ৩।

দুনিয়া দারুল ইমতেহান তথা পরীক্ষার জায়গা। এখানে বান্দা থেকে পরীক্ষা নেওয়া হবে, সে কি আল্লাহর হুকুম অনুযায়ী চলে, না শয়তানের হুকুম অনুযায়ী চলে। দুনিয়ার পরের জগত হলো বারযাখের জগত, কবরের জগত; যেটা মূলত ওয়েটিং রুম। রেলস্টেশনে কেউ যদি ফার্স্টক্লাসের টিকিট ক্রয় করে, তবে তার জন্য ফার্স্টক্লাস ওয়েটিংরুম থাকবে, সেকেন্ডক্লাসের টিকিট ক্রয় করলে ওয়েটিংরুমও সেকেন্ডক্লাসের হবে। তেমনি যে দুনিয়াতে যতোটা ভালো আমল করে যাবে, তার কবরের যিন্দেগীও ততোটা আরামাদায়ক হবে। যার আমল যতো খারাপ হবে, তার কবরের যিন্দেগীও ততো কষ্টের হবে। আলমে বারযাখের পর আসবে ফলাফল প্রকাশের দিন, কিয়ামতের দিন। সেদিন আল্লাহ তা‘আলা বান্দার পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করবেন।

فَرِيقٌ فِي الْجَنَّةِ وَفَرِيقٌ فِي السَّعِيرِ

(কিয়ামতের দিন) একদল বেহেশতে যাবে, আর একদল দোজখে যাবে। —সূরা শূরা; আয়াত ৭।

দুনিয়ার এ পরীক্ষার হলে যেন মানুষ উত্তীর্ণ হতে পারে, এ জন্য আল্লাহ তা‘আলা লক্ষাধিক নবী-রাসূল পাঠিয়েছেন। ‘আসবাবের’ উপর যে গলদ ইয়াকীন মানুষের অন্তরে পয়দা হয়েছে, তা দূর করে সবকিছু আল্লাহ থেকে হওয়ার ইয়াকীন ও বিশ্বাস সৃষ্টি করার জন্য আম্বিয়া আ. মানুষের দিলের উপর মেহনত করেছেন। কেননা, আসবাবের ইয়াকীন হলো শয়তানের রাস্তা, জাহান্নামের রাস্তা। আর আল্লাহ থেকে হওয়ার ইয়াকীন হলো আল্লাহর সন্তুষ্টির রাস্তা, জান্নাতের রাস্তা। আপনি-আমি দেখছি যে, পিয়ন টাকা দিয়ে যাচ্ছে। আসলে পিয়ন টাকা দিচ্ছে না; বরং আপনার-আমার আত্মীয় যে বিদেশে থাকে, সে টাকা পাঠাচ্ছে। তেমনি যমীন, চাকুরী, ব্যবসা সব আল্লাহর পিয়ন। দিচ্ছেন মূলত আল্লাহ। এক পিয়ন নষ্ট হয়ে গেলে পেরেশানীর কিছু নেই, আল্লাহর আরো অনেক পিয়ন আছে; আল্লাহ তা‘আলা সেই পিয়নদের মাধ্যমে রিযিক দিবেন।

দিল হলো দেহের রাজা; রাজা ঠিক হয়ে গেলে প্রজা ঠিক হয়ে যায়। হাদীসে পাকে নবীজী এ কারণেই বলেছেন,

ألا وإن في الجسد مضغة إذا صلحت صلح الجسد كله، وإذا فسدت فسد الجسد كله، ألا وهي القلب

নিশ্চয় শরীরে একটি গোশতের টুকরা রয়েছে; যদি তা ঠিক হয়ে যায় তবে পুরো শরীর ঠিক হয়ে যাবে আর যদি তা নষ্ট হয়ে যায় তবে সম্পূর্ণ শরীরই নষ্ট হয়ে যাবে। আর তা হলো ‘কলব’ তথা অন্তর। —সহীহ বুখারী; হাদীস ৫২।

আখেরী নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কেরামের দিলের উপর মেহনত করেছেন, সাহাবায়ে কেরামের দিল তৈরি হয়ে গেছে। ফলে যখন মদ হারাম হওয়ার ঘোষণা হয়েছে তখন মদীনার অলিগলিতে মদের বন্যা বয়ে গেছে। কোনো সেনাবাহিনীর দরকার হয়নি, ডাণ্ডা-লাঠিরও দরকার হয়নি। নবীজীর মেহনতের কারণে সাহাবায়ে কেরামের দিল তৈরি হয়ে গিয়েছিলো; ফলে আল্লাহর হুকুম মানাও তাদের জন্য সহজ হয়ে গিয়েছিলো। সারকথা, নবীওয়ালা মেহনতের মূল হলো মানুষের দিলের উপর মেহনত করা।

উম্মতে মুহাম্মাদী : শ্রেষ্ঠত্ব ও দায়িত্ব

আমাদের ভাগ্য বড় ভালো, নবীওয়ালা সে মেহনতের যিম্মাদারী বিনা দরখাস্তে আমাদের দিয়ে দেওয়া হয়েছে। হযরত হারুন আ.-এর জন্য হযরত মূসা আ.-কে দরখাস্ত করতে হয়েছিলো। অথচ আমাদেরকে বিনা দরখাস্তে শেষ নবীর উম্মত হিসাবে নবীওয়ালা মেহনত দেওয়া হয়েছে। চেয়ারম্যান না থাকলে যেমন মেম্বার কাজ করে, তেমনি যেহেতু শেষ নবীর পর আর কোনো নবী আসবে না, তাই এখন যিম্মাদারী আখেরী নবীর উম্মতের উপর ন্যস্ত হয়েছে। এ কাজের কারণে আমাদেরকে খাইরুল উম্মত (শ্রেষ্ঠ উম্মত) উপাধি দেওয়া হয়েছে। এ কাজ না করলে আমরা এ উপাাধির উপযুক্ত হবো না। চোখ দিয়ে যে দেখতে পায় না তাকে বলা হয় অন্ধ, কান দিয়ে যে শুনতে পায় না তাকে বলা হয় বধির। তেমনি আমরা যদি এ মেহনত না করি, তবে আমরা খাইরুল উম্মত হতে পারবো না। কাজেই দাওয়াতের এ কাজ আমাদের জন্য করা আবশ্যক।

দাওয়াতের পদ্ধতির ব্যাপকতা

মনে রাখতে হবে, দাওয়াতের পথ ও পদ্ধতি বিভিন্ন ধরনের। হযরতজী মাওলানা ইলয়াস রহ. বলেছেন,
‘আমাদের এই তাবলীগী আন্দোলন দীনী তা’লীম ও তরবিয়ত বিস্তার করা এবং দীনী যিন্দেগী ব্যাপকভাবে প্রচার করার আন্দোলন। —মালফুযাত ১৩৫।
মাওলানা ইলয়াস রহ.-এর এ মালফুয দ্বারা বোঝা যায় যে, দাওয়াতের মূল লক্ষ্য হলো, প্রত্যেকের কাছে অন্যের দীনী ইলমের যে আমানত রয়ে গেছে তা সঠিকভাবে পৌঁছে দেওয়া। সুতরাং মাকসাদ যদি হয় ইলম এবং দীনী আমানত পৌঁছে দেওয়া, তবে এ পৌঁছে দেওয়ার সকল মাধ্যমই দাওয়াত হিসাবে ধর্তব্য হবে। কাজেই উম্মতের কাছে দীন পৌঁছানোর সকল জায়েয পদ্ধতিই দাওয়াতের অন্তর্ভুক্ত হবে। যেমন, দীনী বইপুস্তক লেখা, দীনী ওয়াজ মাহফিল করা, তালেবে ইলমকে শিক্ষা দেওয়া ইত্যাদি।
সাইয়িদ আবুল হাসান আলী নদবী রহ. তার বিখ্যাত গ্রন্থ দীনী দাওয়াত-এ উল্লেখ করেছেন, দাওয়াত ও তাবলীগের কোনো সাধারণ সাথী যদি দাওয়াতের কাজের প্রতি আলেম সমাজের অনীহা বা অনাগ্রহ সম্পর্কে অভিযোগ করতেন, তাহলে হযরত মাওলানা ইলয়াস রহ. বিরক্ত হয়ে বলতেন,
‘তোমরা ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি-কৃষি ইত্যাদি নিছক দুনিয়াদারী ত্যাগ করে এ কাজে আসতে কত ইতঃস্তত করে থাক; অথচ উলামায়ে কেরাম যেসব কাজ করেন সেগুলো তো দীনেরই কাজ। তারা তাদের কাজ ছেড়ে এত সহজে চলে আসবেন, এমনটা আশা কর কেন? তাদের প্রতি তোমাদের অভিযোগ কেন?
জনসাধারণকে সম্বোধন করে তিনি আরো বলতেন,
‘যদি হাযারাত উলামায়ে কেরাম এই কাজের দিকে মনোযোগ কম দেন কিংবা (সশরীরে) অংশগ্রহণ না করেন তাহলে সাধারণ সাথীরা যেন উলামায়ে কেরামের প্রতি কোন ধরনের প্রশ্ন উত্থাপন না করে। বরং এটা বুঝা উচিৎ যে, উলামায়ে কেরাম আমাদের থেকেও গুরুত্বপূর্ণ কাজে মশগুল আছেন; যার ফলে তারা আমাদেরকে সময় দিতে পারছেন না। তারা তো গভীর রজনীতেও ইলমে দীনের খেদমতে মাশগুল থাকেন যখন অন্যরা আরামের নিদ্রায় বিভোর হয়ে থাকে। —মালফুযাত ৫৪।
সুতরাং দীন পৌঁছানোর সকল জায়েয মাধ্যমই তাবলীগ হিসাবে গণ্য হবে। উলামায়ে কেরাম দীনের যে খেদমতে ব্যস্ত রয়েছেন, সব খেদমতই তাবলীগ হিসাবে ধর্তব্য হবে। কিন্তু দাওয়াতের এ সকল পদ্ধতির পাশাপাশি হযরত মাওলানা ইলয়াস রহ.-এর প্রদর্শিত পদ্ধতিতেও আমাদের আওয়াম-খাওয়াস, জনসাধারণ এবং বিশেষভাবে উলামা-শ্রেণী সকলেরই অংশগ্রহণ করা উচিত। কেননা, এ পদ্ধতিতে উম্মতের সব শ্রেণীর কাছে খুব সহজে দীন পৌঁছানো যায়। এ পদ্ধতিতে জনসাধারণের জন্য যেমন তাদের দাওয়াতের দায়িত্ব আঞ্জাম দেওয়া সহজ, তেমনি উলামায়ে কেরামের জন্যও তাদের ইলমী আমানত উম্মতের সব তবকার কাছে পৌঁছে দেওয়া সহজ। হযরতজী ইলয়াস রহ.-এর উল্লিখিত মালফুয দ্বারা এ কথাও বোঝা যায় যে, দাওয়াতের মাকসাদ হলো ইলম পৌঁছানো; কাজেই আহলে ইলম তথা উলামায়ে কেরামই এ কাজের সবচেয়ে বেশি হকদার হবেন।

দাওয়াত ও তাবলীগের মেহনতে উলামায়ে কেরামের পৃষ্ঠপোষকতা

উলামায়ে কেরাম যেহেতু এ কাজের বেশি হকদার, তাই আল্লাহ তা‘আলা দাওয়াতের এ প্রচলিত পদ্ধতিকেও শুরু করেছেন উলামায়ে কেরামের পৃষ্ঠপোষকতায়। হযরত মাওলানা ইলয়াস রহ. তার এই মোবারক মেহনত শুরু করেছিলেন আমাদের আকাবিরদের পরামর্শ, সমর্থন এবং সহযোগিতা ও পৃষ্ঠপোষকতায়। ফলে এ মেহনত নিযামুদ্দীন থেকে সারা বিশ্বে এমনকি বাংলাদেশেও ছড়িয়েছে উলামায়ে কেরামের তত্ত্ববধানে।
মাওলানা ইলয়াস রহ. দারুল উলূম দেওবন্দের সন্তান। তিনি পুরো দশ বছর মাওলানা রশীদ আহমাদ গাঙ্গুহী রহ. এর সোহবতে কাটিয়েছেন। এরপর দারুল উলূম দেওবন্দে গিয়ে শাইখুল হিন্দ মাহমূদুল হাসান দেওবন্দী রহ.-এর কাছে বুখারী ও তিরমিযী শরীফ পড়েন। শাইখুল হিন্দের নির্দেশক্রমে মাওলানা খলীল আহমাদ সাহারানপুরী রহ.-এর হাতে বাইয়াত হন। পরবর্তীতে হযরত সাহারানপুরী রহ.-এর পরামর্শে এবং হাকিমুল উম্মত থানবী রহ.-এর পৃষ্ঠপোষকতায় তিনি দাওয়াতের এ মোবারক কাজ নিযামুদ্দীনে শুরু করেন। —আবুল হাসান আলী নদবী রহ. কৃত মাওলানা ইলয়াস আওর উনকী দীনী দাওয়াত; পৃষ্ঠা ৪৮, ৫১, ৫২, ৫৯।
মোটকথা, দারুল উলূম দেওবন্দ ও শাইখুল হিন্দ রহ.-এর ফয়য এবং হযরত সাহারানপুরী রহ. ও থানবী রহ.-এর পরামর্শ, পৃষ্ঠপোষকতা এবং দু‘আর বরকতে মাওলানা ইলয়াস রহ. দাওয়াত ও তাবলীগের এ মহান কাজের সূচনা করতে সক্ষম হন।

দাওয়াত ও তাবলীগের মেহনত : হযরত থানবী রহ. এর ভূমিকা

হযরত মাওলানা ইলইয়াস রহ. বস্তি নিযামুদ্দীন-এ পিতা এবং বড় ভাইয়ের উত্তরসূরী হিসাবে দাওয়াত ও তাবলীগের যে মেহনত শুরু করেছিলেন, তা মূলত হযরত থানবী রহ.-এর মশওয়ারা, দু‘আ এবং সমর্থনের মাধ্যমেই উৎকর্ষ লাভ করেছিল। ‘আশরাফুস সাওয়ানেহ’ (আশরাফ চরিত) গ্রন্থে হযরত থানবী রহ.-এর বেশকিছু চিঠিপত্র রয়েছে, যাতে তিনি দাওয়াত ও তাবলীগের সাথীদেরকে এ কাজের ব্যাপারে পরামর্শ এবং সুসংবাদ শুনিয়ে তাদেরকে উদ্বুদ্ধ করেছেন। প্রফেসর আব্দুল বারী রহ. ‘তাজদীদে তা’লীম ও তাবলীগ’ কিতাবে এ মর্মে বলেন, ‘আমি একবার বস্তি নিযামুদ্দীনে হযরত ইলয়াস রহ.-এর কাছে উপস্থিত হলাম। যতদূর মনে পড়ে উপস্থিতির দ্বিতীয় দিন ‘নূহ’ এলাকায় তাবলীগের একটি বড় ইজতেমা ছিলো। হযরত ইলয়াস রহ. আমাকে তাগিদ দিয়ে সাথে নিয়ে গেলেন। দু’-তিন দিন সার্বক্ষণিক হযরতের সোহবতে থেকে তাবলীগের কাজ পর্যবেক্ষণ করার সৌভাগ্য অর্জিত হওয়ার পর যখন দিল্লী থেকে ‘থানাভবনে’ উপস্থিতির সময় হলো তখন হযরত ইলয়াস রহ. বললেন,
এ কাজের বরকত মূলত হযরত (থানবী রহ.)-এর দু‘আরই ফসল!
তিনি আরো বললেন,
‘হযরতের খেদমতে উপস্থিত হয়ে আমার সালাম পেশ করবেন, এখানের কাজের বিবরণ শোনাবেন, এর জবাবে হযরত যা কিছু বলেন তা অবশ্যই আমাকে লিখে জানাবেন!’ আমি যখন হযরতের দরবারে উপস্থিত হলাম এবং হযরতের কাছে বাংলাওয়ালী মসজিদ থেকে নিয়ে নূহ পর্যন্ত দাওয়াত ও তাবলীগের কর্মকাণ্ডের উপর নিজের অভিব্যক্তি পেশ করলাম, তখন হযরত বললেন, ‘আসল কাজ তো এটাই’! —তাজদীদে তা’লীম ও তাবলীগ; পৃষ্ঠা ১৭৩।
থানবী রহ.-এর ইন্তেকালের পর হযরতজী ইলয়াস রহ.-ও দাওয়াত ও তাবলীগের সাথীদেরকে থানবী রহ.-এর জন্য বেশি বেশি কুরআন পাঠ করে তার উদ্দেশ্যে ঈসালে সওয়াবের জন্য, তার কিতাবগুলো পাঠ করার জন্য এবং তার সোহবতপ্রাপ্ত বুযুর্গানে দীনের সংশ্রব গ্রহণ করার নির্দেশ দিতেন। সাথে সাথে এ কথাও বলতেন যে,
‘হযরত মাওলানা থানবী রহ. অনেক বড় কাজ করেছেন। আমার দিল চায় যে, তা’লীম হবে তার তরীকায়, আর তাবলীগ হবে আমার তরীকায়। এভাবে তার তা’লীম ব্যাপক হয়ে যাবে’। —মাকাতিবে হযরত মাওলানা ইলয়াস রহ.; পৃষ্ঠা ১৩৭ মেওয়াতীদের প্রতি প্রেরিত ১ নম্বর চিঠি।

অন্যান্য আকাবিরের পৃষ্ঠপোষকতা

সাইয়িদ আবুল হাসান আলী নদবী রহ. লিখেছেন,
‘হযরত মাওলানার (ইলয়াস রহ.) ধারণায় এই সমস্ত উলামায়ে দীনের প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা এবং তাঁদের পৃষ্ঠপোষকতা অত্যন্ত জরুরী ছিল, যা ছাড়া তিনি এই কাজকে ঝুঁকিপূর্ণ এবং আশঙ্কাজনক মনে করতেন’। —দীনী দাওয়াত; পৃষ্ঠা ৮০।
এ দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই ইলয়াস রহ. দাওয়াতের কাজ শুরু করার পর সর্বপ্রথম যখন আল্লাহর রাস্তায় বের হওয়ার জন্য জামাআত তৈরি হয়, তখন তিনি এ জামাআতকে হযরত মাওলানা মুফতী কেফায়াতুল্লাহ সাহেব রহ.-এর কাছে প্রেরণ করেন, তার পরামর্শ এবং সমর্থন লাভের আশায়। ২৮, ২৯ ও ৩০ নভেম্বর ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দে ‘গোড়গানওয়াঁ’ জেলার নূহ অঞ্চলে এক বিরাট তাবলীগী ইজতিমা হয়, যেখানে মাওলানা হুসাইন আহমাদ মাদানী রহ. মজমায় জুমু‘আর নামায পড়িয়েছিলেন এবং মাওলানা কেফায়াতুল্লাহ সাহেব রহ.-সহ অনেকেই শরীক ছিলেন। —দীনী দাওয়াত; পৃষ্ঠা ১১৫।
বিভিন্ন সময়ে হযরত মাওলানা ইলয়াস রহ. দাওয়াত ও তাবলীগের মেহনতের মশওয়ারার জন্য আকাবিরদের একত্রিত করতেন। সেখানে দারুল উলূম দেওবন্দের মুহতামিম মাওলানা ক্বারী তাইয়েব সাহেব, মাওলানা মুফতী কেফায়াতুল্লাহ সাহেব, দিল্লীর আব্দুর রব মাদরাসার মুহতামিম মাওলানা মুহাম্মাদ শফী’ সাহেব, সাহারানপুর মাযাহিরুল উলূম মাদরাসার নাযেম মাওলানা আব্দুল লতীফ সাহেব, দারুল উলূম দেওবন্দের উস্তাদ মাওলানা ই’যায আলী সাহেব, শাইখুল হাদীস মাওলানা যাকারিয়া সাহেব ও মাওলানা আব্দুল কাদের রায়পুরী রহ.-সহ যুগশ্রেষ্ঠ অনেক আলেম ও বুযুর্গানে দীন উপস্থিত হতেন। —মাওলানা ইলয়াস আওর উনকী দীনী দাওয়াত; হযরত মাওলানা আবুল হাসান আলী নদবী রহ.; পৃষ্ঠা ১২৬-১২৭।
সারকথা, দাওয়াত ও তাবলীগের মেহনতের অধিক যোগ্য এবং হকদার হলেন উলামায়ে কেরাম। তারাই এ মোবারক মেহনতের বাগানে পানি সিঞ্চন করেছেন। তারাই এ কাননের রক্ষাণাবেক্ষণকারী। আর জনসাধারণ যারা এ নূরানী মেহনতের সাথে শরীক হয়েছেন তারাও নূরানী হয়ে গেছেন।

বাংলাদেশে তাবলীগের আগমন ও তত্ত্বাবধান

বাংলাদেশে হযরত মাওলানা ইলয়াস রহ.-এর পদ্ধতিতে দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ মূলত থানবী রহ.-এর এক শাগরেদের মাধ্যমেই আল্লাহ তা‘আলা শুরু করেছিলেন। তিনি হলেন মুজাহিদে আযম মাওলানা শামছুল হক ফরিদপুরী (সদর সাহেব হুযূর) রহ.। সদর সাহেব হুযূরের খাস শাগরেদ, আমাদের উস্তাযে মুহতারাম হযরত মাওলানা আব্দুল মজীদ (ঢাকুবী হুযূর) রহ.-এর কাছে এ ঘটনা একাধিকবার শুনেছি যে, হযরত থানবী রহ.-এর দরবার থেকে বাংলাদেশে আসার পর হযরত সদর সাহেব রহ. মাওলানা আব্দুল আজীজ (কাকরাইলের বড় হুযূর) রহ.-কে হিন্দুস্তানে দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ শিখে আসার জন্য পাঠান। আব্দুল আজীজ রহ. প্রথমত কলকাতা মারকাযে, এরপর দিল্লীর নিযামুদ্দীন মারকাযে হযরতজী ইউসুফ রহ.-এর সোহবতে থেকে এ কাজ শিখে এসে বাংলাদেশে দাওয়াত ও তাবলীগের মেহনত আরম্ভ করেন।
বাংলাদেশে মেহনতের প্রথম মারকায ছিলো খুলনার উদয়পুর মাদরাসার মসজিদ, যার মুহতামিম ছিলেন বড় হুযূর মাওলানা আব্দুল আজীজ রহ.-এর শ্বশুর।
দ্বিতীয় মারকায : ১৯১০ খ্রিস্টাব্দে খুলনা জেলার তেরখাদা থানাধীন বামনডাঙ্গায় বড় হুযূরের নিজ গ্রামে।
তৃতীয় মারকায : দক্ষিণবঙ্গের সবচেয়ে বড় দীনী প্রতিষ্ঠান, ঐতিহ্যবাহী জামি‘আ ইসলামিয়া আরাবিয়া দারুল উলূম খুলনা সংলগ্ন তালাবওয়ালী মসজিদ।
চতুর্থ মারকায : চতুর্থ পর্যায়ে মারকায নির্ধারিত হয় লালবাগ শাহী মসজিদ। তখন সদর সাহেব রহ. লালবাগ জামি‘আ কুরআনিয়ার মুহতামিম ছিলেন।
পঞ্চম মারকায : একসময় লালবাগ শাহী মসজিদে স্থান সংকুলান না হওয়ায় ইজতিমার সুবিধার্থে কেল্লার উত্তর-পশ্চিম দিকে মাঠ সংলগ্ন খান মুহাম্মাদ মসজিদকে মারকায করা হয়।
ষষ্ঠ মারকায : কিছুদিন পর এখানেও জায়গা হচ্ছিল না। সদর সাহেব রহ. শহরের ভেতরে বড় মাঠ সংলগ্ন কোন মসজিদ দেখতে বললেন। তখন রমনা পার্ক সংলগ্ন মোঘল আমলে নির্মিত মালওয়ালী মসজিদের সন্ধান মিলল; কিন্তু আয়তনে খুব ছোট। সদর সাহেব রহ. বললেন, প্রয়োজনে পার্কের জায়গা বরাদ্দ নিয়ে মসজিদ বড় করা যাবে; এটাই মারকায হোক। ছয় উসূলের মেহনতের সেই ষষ্ঠ মারকাযই আজকের ঐতিহাসিক কাকরাইল মসজিদ। এসব মারকাযে তখন মুকীম হিসেবে কেউ থাকতেন না; সবাই আসা-যাওয়া করে কাজ করতেন। একমাত্র বড় হুযূর আব্দুল আজীজ রহ. সব সময় মারকাযেই একা পড়ে থাকতেন।
সারকথা, হিন্দুস্তানে যেমন দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ শুরু হয়েছিলো উলামায়ে কেরামের তত্ত্বাবধানে, তেমনি বাংলাদেশেও (বরং পুরো পৃথিবীতে) তা শুরু হয়েছে উলামায়ে কেরামের তত্ত্বাবধানে।

তাবলীগী মেহনতের মাকসাদ

হযরত মাওলানা ইলয়াস রহ. তার ‘মালফুযাত এবং মাকাতিব’-এর মধ্যে তাবলীগী মেহনতের কয়েকটি উদ্দেশ্য বর্ণনা করেছেন-
১. সকল জায়গায় উলামায়ে কেরাম ও বুযুর্গানে দীন এবং দুনিয়াদারদের মাঝে মেলামেশা ও সৌহার্দ্য, ভালবাসা ও সম্প্রীতি সৃষ্টি করা। —মালফুযাত ১০২।
২. তিন জিনিসকে যিন্দা করা— যিকির, তা’লীম এবং তাবলীগ। অর্থাৎ তাবলীগের জন্য বের হওয়া, যাতে সাথীদেরকে যিকির এবং তা’লীমের প্রতি আরও বেশি ফিকিরমান্দ করে তোলা যায়। —মাকাতিবে হযরত মাওলানা ইলয়াস রহ.; মেওয়াতীদের প্রতি লিখিত ১ নম্বর চিঠি।
৩. তিন তবকার লোকদের নিকট তিন উদ্দেশ্যে বিশেষভাবে যাওয়া উচিত। এক. উলামায়ে কেরাম এবং বুযুর্গানে দীনের খেদমতে দীন শিখা ও দীনের ভাল তাছীর হাসিল করার জন্য।
দুই. নিজ হতে নিম্ন শ্রেণীর লোকদের মাঝে দীনী কথাবার্তা প্রচার করে নিজের দীনের মধ্যে মযবুতি হাসিল করা এবং নিজের দীনকে পরিপূর্ণ করার জন্য। তিন. বিভিন্ন লোকদের নিকট তাদের ভাল গুণাবলী হাসিল করার জন্য। —মালফুযাতে মাওলানা ইলয়াস রহ.; পৃষ্ঠা ৮৬।
৪. সমস্ত মুসলমানকে নবীজীর আনীত দীন অর্থাৎ ইসলামের পুরো ইলমী এবং আমলী নেযামের সাথে উম্মতকে সম্পর্কযুক্ত করে দেওয়া। —মালফুযাতে মাওলানা ইলয়াস রহ.; পৃষ্ঠা ৩৩।

মেহনতের আদব

১. দাওয়াত ও তাবলীগের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ আদব—যা আওয়াম-খাওয়াস, উলামা-জনসাধারণ সকলের জন্যই মনে রাখা আবশ্যক—এ মেহনতের দ্বারা সর্বপ্রথম নিজের হিদায়াতের নিয়ত করা। দ্বিতীয়ত যাকে দাওয়াত দেওয়া হচ্ছে তার হিদায়াতের নিয়ত করা। আজ সমস্ত ‘দীনী তাহরীক’ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হচ্ছে। এর একটি মৌলিক কারণ হলো, মেহনতের দ্বারা অন্যের ইসলাহ এবং সংশোধনের নিয়ত করা হচ্ছে, নিজের সংশোধনের নিয়ত করা হচ্ছে না। পবিত্র কুরআনে সূরা ইয়াসীনে আল্লাহ তা‘আলা এক মুমিন বান্দার ঘটনার মাধ্যমে দাওয়াতের আদব শিক্ষা দিয়েছেন যে, দাওয়াতের ক্ষেত্রে সম্বোধন করতে হবে নিজেকে এবং সর্বপ্রথম মাকসাদ হবে নিজের হিদায়াত। —সূরা ইয়াসীন; আয়াত ২২।
মাওলানা ইলয়াস রহ.-ও বলেছেন যে,
‘আমাদের এই দীনী দাওয়াতের কাজে রত সমস্ত সাথীদের একথা ভালভাবে বুঝিয়ে দেওয়া উচিৎ যে, তাবলীগ জামাআতে বের হওয়ার উদ্দেশ্য শুধু অন্যকে পৌঁছানো ও বাতলানো নয়; বরং এর দ্বারা নিজের ইসলাহ এবং তা’লীম ও তরবিয়তও উদ্দেশ্য।’ —মালফুযাত ১৩৪।
২. হযরত মাওলানা ইলয়াস রহ.-এর মালফুযাত, মাকাতিব খুব বেশি বেশি পড়তে হবে। কেননা তার মালফুযাত এবং মাকাতিবের মধ্যে এ কাজের সঠিক নকশা দেওয়া হয়েছে। উলামা এবং আওয়াম সকলের জন্যই তাতে হিদায়াত এবং দিকনির্দেশনা রয়েছে। বিশেষ করে যখন দাওয়াত ও তাবলীগ নিয়ে ফিতনা হচ্ছে, তখন এ বিষয়ের প্রথম মুরব্বীর দিকনির্দেশনা ছাড়া এ ফেতনা থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়।
৩. বিশেষত উলামায়ে কেরামের জন্য এ মেহনতের সময় একথা মনে রাখতে হবে যে, আমার কাছে সমগ্র উম্মতের দীনী আমানত রয়ে গেছে। আমি ব্যবসায়ীদের জন্য ‘কিতাবুল বুয়ূ’ পড়েছি, কৃষিজীবিদের জন্য ‘কিতাবুল মুযারাআত, মুসাকাত’ পড়েছি, বিচারক ও শাসনকর্তাদের জন্য ‘কিতাবুল হুদূদ, কিতাবুল কাযা’ ইত্যাদি পড়েছি, আমি সরকারি আমীন (জমি পরিমাপকারী)-এর জন্য কিতাবুল ফারায়েয, ‘কিতাবুল কিসমাহ’ পড়েছি। তাই ব্যবসায়ী, কৃষিজীবি, শাসনকর্তা, সরকারী আমীন তথা পুরো উম্মতের আমানত আমার কাছে রয়ে গেছে। সুতরাং আমি উম্মতের দ্বারে দ্বারে যাবো সেই আমানত পৌঁছে দেওয়ার জন্য। উম্মত হিসাবে, ওয়ারিসে আম্বিয়া হিসাবে নিয়াবাতে নবীর দায়িত্ব পালনের জন্য আমি আল্লাহর রাস্তায় বের হবো।
৪. আর জনসাধারণের জন্য দাওয়াতের মেহনত করার ক্ষেত্রে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ আদব রয়েছে-
(ক) দাওয়াত ও তাবলীগের মেহনতের মাধ্যমে কেবল দীনের উপর চলার আগ্রহ সৃষ্টি হবে। এরপর এ আগ্রহকে কাজে লাগিয়ে উলামায়ে কেরামের কাছ থেকে দীনী মাসাইল শিখতে হবে এবং হক্কানী পীর-মাশায়েখের কাছ থেকে আত্মশুদ্ধির মেহনত করতে হবে। মাওলানা ইলয়াস রহ. নিজেই বলেছেন,
‘ইলম ও যিকির হাসিল করার তরীকা হলো, সাথীদেরকে আহলে ইলম এবং আহলে যিকিরগণের নিকট পাঠানো, যেন এরা তাঁদের তত্ত্বাবধানে তাবলীগও করে এবং তাঁদের ইলম ও সাহচর্য দ্বারা উপকৃতও হয়। —মালফুযাত ৫৪।
তিনি শাইখুল হাদীস মাওলানা যাকারিয়া রহ.-কে লেখা এক পত্রে উল্লেখ করেন,
‘আমার দীর্ঘ দিনের আকাঙ্ক্ষা হল, তাবলীগের জামা‘আতগুলো বুযুর্গানে দীনের খানকাগুলোতে গিয়ে খানকার পরিপূর্ণ আদব রক্ষা করে সেখানকার ফয়য-বরকতও গ্রহণ করুক। খানকায় অবস্থানকালীন অবসর সময়ে আশপাশের গ্রামগুলোতে গিয়ে দাওয়াতের কাজগুলোও যেন জারী থাকে।’ —দীনী দাওয়াত।
সুতরাং আল্লাহর রাস্তায় সময় লাগানোর পাশাপাশি উলামায়ে কেরামের সংশ্রবে ইলম শিক্ষা করা এবং পীর-মাশাইখের সোহবতে থেকে আত্মশুদ্ধির মেহনত করাও একান্ত আবশ্যক। এ বিষয়টি খুব ভালোভাবে হৃদয়ঙ্গম করতে হবে। দীনী পরিবেশে যত জায়গায় ফেতনার সৃষ্টি হয়েছে, তার মূল কারণ হলো, দায়িত্বশীল ও সংশ্লিষ্টদের আত্মশুদ্ধি না থাকা।
(খ) দাওয়াতের এ মেহনত উলামায়ে কেরামের পৃষ্ঠপোষকতায় শুরু হয়েছে, এ বিশ্বাস নিজের মধ্যে ধারণ করে দাওয়াত ও তাবলীগসহ সকল দীনী বিষয়ে তাদের নেতৃত্ব মেনে নিতে হবে এবং তাদের সাথে জুড়ে-মিলে থাকতে হবে। মনে রাখতে হবে, ঐ উম্মত ধ্বংস হয়ে গেছে, যে উম্মত তাদের হক্কানী উলামায়ে কেরাম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। এ কারণেই হযরত আলী নদবী রহ. মাওলানা ইলয়াস রহ.-এর দৃষ্টিভঙ্গি উল্লেখ করে বলেন,
আওয়াম ও উলামায়ে কেরামের অপরিচিতি ও দূরত্ব কিছুতেই তাঁর বরদাশত ছিল না। এটাকে তিনি মনে করতেন উম্মতের বিরাট দুর্ভাগ্য, ইসলামের ভবিষ্যতের জন্য বিরাট খাতরা এবং ধর্মহীনতা ও ধর্মদ্রোহিতার পূর্বলক্ষণ। —দীনী দাওয়াত; পৃষ্ঠা ১২২।
(গ) উলামায়ে উম্মতের ব্যাপারে খারাপ ধারণা থেকে বেঁচে থাকা জরুরী। তাদের সাথে মহব্বত রাখা এবং তাদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ না করা অপরিহার্য। কেননা উলামায়ে কেরামের প্রতি বিদ্বেষ সমস্ত মেহনতকে বরবাদ করে দেয়। এই উম্মতের কাছে বিশুদ্ধ দীন পৌঁছিয়েছেন উলামায়ে কেরাম। তারা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নায়েব বা উত্তরাধিকারী। তারা জনগণকে দীন শিক্ষা দেওয়ার জন্য পুরো জীবন ওয়াকফ করে দিয়েছেন। এজন্য উম্মত উলামায়ে কেরামের কাছে ঋণী।
উলামায়ে কেরামের এই সহযোগিতা দুনিয়ার মতো আখেরাতেও কাজে লাগবে। আখেরাতে যে সমস্ত বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন ও মাদরাসা-মসজিদের হিতাকাঙ্ক্ষী নিজের আমল দিয়ে জান্নাতে যেতে অক্ষম হয়ে পড়বে আল্লাহ তা’আলা তাদেরকে জান্নাতে নিয়ে যাওয়ার জন্য হাফেয ও আলেমদের সুপারিশের অনুমতি দিবেন। তারা বেছে বেছে সেইসব মানুষদের জন্যই জান্নাতের সুপারিশ করবেন, যারা দীনের কল্যাণকামিতায় উলামায়ে কেরামকে মহব্বত করে মাদরাসা-মসজিদের উন্নতি-অগ্রগতিতে এবং দীনী মেহনত ও দীনী প্রতিষ্ঠানের বিপদাপদে পাশে ছিলো এবং সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলো। কাজেই জান্নাতে যেতে উলামায়ে কেরামের সাহায্য প্রয়োজন হবে।
যারা দীনের মেহনত করেন—চাই তাবলীগের সাথী হোন বা চরমোনাইয়ের কর্মী, কিংবা মাদরাসা-মসজিদের কমিটি—যদি এই মেহনত করার ফলাফল হিসেবে তাদের মনে উলামাদের প্রতি ইযযত ও আযমত এবং মহব্বত সৃষ্টি না হয় তাহলে বুঝতে হবে তার মধ্যে এখনো দীন আসেনি। দীনের যত বড় থেকে বড় মেহনতকারীই হোক না কেন, দিলের মধ্যে যদি উলামায়ে দীনের প্রতি অভক্তি, ঘৃণা ও বিদ্বেষ থাকে তাহলে তার ঐ মেহনত আর দীনদারীর দুই পয়সাও দাম নেই। ফেতনার সময়, যে কোনো মুহূর্তে তা কচুপাতার পানির মতই নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।
ঠিক তেমনিভাবে দাওয়াত ও তাবলীগের বর্তমান পদ্ধতি—যা হযরত মাওলানা ইলয়াস রহ. শুরু করেছেন—নিঃসন্দেহে দীনের একটি মুবারক এবং বড় মেহনত। কিন্তু যদি এ মেহনতের দ্বারা উলামাদের প্রতি ইয্যত এবং আযমত ও মহব্বত সৃষ্টি না হয়, তবে বুঝতে হবে তার মধ্যে মাওলানা ইলয়াস রহ.-এর তাবলীগ আসেনি; বরং অন্য কোনো তাবলীগ এসেছে। কেননা, মাওলানা ইলয়াস রহ. নিজে দারুল উলূম দেওবন্দের সন্তান এবং সারাজীবন তিনি উলামায়ে কেরামের সাথে পরামর্শ এবং সহযোগিতার মাধ্যমে দাওয়াত ও তাবলীগের এ মুবারক কাজ আঞ্জাম দিয়েছেন। হযরতজী ইলয়াস রহ.-এর শায়খ হযরত মাওলানা রশীদ আহমাদ গঙ্গুহী রহ. বলেন,
‘যারা উলামায়ে কেরামের প্রতি অন্তরে বিদ্বেষ এবং বদগুমানী পোষণ করে তাদের চেহারা কবরে কুদরতিভাবে কেবলার দিক থেকে ঘুরিয়ে দেওয়া হবে। যতই তাদের চেহারা কেবলামুখী করা হোক, তা কেবলার দিক থেকে ঘুরে যাবে!’
সাইয়িদ আবুল হাসান আলী নদবী রহ. বলেন,
‘মাওলানা (ইলয়াস রহ.) দাওয়াত ও তাবলীগের সাথীদের মধ্যে উলামায়ে কেরামের কোন কথা বা কাজ বুঝে না এলে এর সুব্যাখ্যা গ্রহণ এবং সুধারণা পোষণের অভ্যাস গড়ে তুলতেন।’ —দীনী দাওয়াত; পৃষ্ঠা ১২৩।
হযরতজী এটাও বলেছেন যে,
‘একজন সাধারণ মুসলমান সম্পর্কেও কোন কারণ ছাড়া বদগুমানী (খারাপ ধারণা পোষণ করা) মানুষকে ধ্বংসের দিকে নিক্ষেপ করে। আর উলামায়ে কেরামের উপর প্রশ্ন উত্থাপন (বদগুমানী করা) তো এর চেয়ে অনেক বেশী মারাত্মক ও ভয়ঙ্কর।’ —মালফুযাত ৫৪।
(ঘ) দীনী যে কোনো বিষয়ে উম্মতের মাঝে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হলে, দীনী বিষয়ে বিশেষজ্ঞ উলামায়ে কেরামের সিদ্ধান্তকেই যথার্থ এবং আমলযোগ্য মনে করতে হবে। উলামায়ে কেরামের অনুসরণে সকল ফিতনা থেকে হেফাযতের নিশ্চয়তা রয়েছে। অভিজ্ঞতার আলোকে দেখা গেছে, যারা উলামায়ে কেরামের প্রতি অন্তরে আযমত ও মহব্বত লালন করে এবং উলামায়ে কেরামের জামা‘আতের সাথে জুড়ে থেকে তাদের পরিপূর্ণ অনুসরণ করে, তারা ভয়ঙ্কর সব ফিতনা আর দীনের নামে বদদীনী থেকে নিরাপদে ও হেফাজতে থাকে। পক্ষান্তরে যারা উলামায়ে কেরামের নৈকট্য ও অনুসরণ থেকে বিরত থাকে এবং তাদের থেকে দূরত্ব বজায় রাখে তারাই নানা রকম ফিতনা এবং গোমরাহীতে লিপ্ত হয়। হযরতজী বলতেন,
‘প্রত্যেক যুগের সব লোকই নিজেদের বড়দের কাছ থেকে ইলম ও যিকিরের সবক নিতেন এবং তারাও তাদের তত্ত্বাবধানে থেকে, তাদের দিকনির্দেশনায় তা পরিপূর্ণ করতেন। এমনিভাবে আজও আমরা আমাদের বড়দের (উলামায়ে কেরাম ও বুর্যাগানে দীন) মুহতাজ।

ورنہ شیطان کے جال میں پھنس جانے کا بڑا اندیشہ ہے۔

অন্যথায় শয়তানের জালে ফেঁসে যাওয়ার বড়ই আশঙ্কা রয়েছে।’ —মালফুযাত ১৩৪।

পোস্টটি লাইক ও শেয়ার করুন।

একটি মন্তব্য লিখুনঃ

Your email address will not be published. Required fields are marked *