সাগর তীরে শুভ্র মিছিল

আব্দুল্লাহ আল ফাহাদ

ভূমিকা
মা’হাদুল বুহুসিল ইসলামিয়ার দারুল ইফতায় ভর্তি হওয়ার পর কিছুদিন যেতেই দ্বিতীয় বর্ষের বড় ভাইদের কাছ থেকে জানতে পারলাম, মা’হাদের পক্ষ থেকে উস্তাদদের তত্ত্বাবধানে ইফতা বিভাগের ছাত্রদের জন্য দু’বছর অন্তর ইলমী সফরের ব্যবস্থা করা হয়। এ সংবাদ প্রথমবার যখন শুনলাম, মনের মধ্যে অন্যরকম এক আনন্দের ঢেউ খেলে গেলো। মনে হলো; এ ইলমী সফর ইনশাআল্লাহ আমাদের জন্য হবে نعمت غیر مترقبہ তথা অপ্রত্যাশিত একটি নিয়ামত। মা’হাদে এসে এমন সৌভাগ্যও আমাদের অর্জন হবে ভাবিনি কখনো!
সময় ছুটে চলে আপন গতিতে কাল, অনন্তকালের দিকে! আমরা যখন ভর্তি হই তখন জানতে পারি, মা’হাদের ইলমী সফর সাধারণত বার্ষিক পরীক্ষার বিরতিতে অনুষ্ঠিত হয়। তাই সফর নিয়ে এখন কোনো ভাবনা নেই। কারণ এ সফরের দেখা মিলবে বছরের শেষে।
মতবিনিময় মজলিস
দেখতে দেখতে আমাদের দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষা সন্নিকটে চলে এলো। একদিন রাতে ইশার পর উস্তাদদের পক্ষ থেকে আমাদের বসতে বলা হলো। তখন হযরত মুদীর সাহেব হুযূরের রুমে হযরত মুদীর সাহেব, হযরত নাযেম সাহেব এবং হযরত খুলনার হুযূর দা.বা. পরামর্শ করছেন। কে জানে, কী বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে! অবশ্যই কোনো গুরুত্বপূূর্ণ বিষয় হবে। তা না হলে এমন সময় মুরুব্বী উস্তাদদের পরামর্শ হওয়ার কথা নয়। এ নিয়ে আমাদের একেক জনের একেক রকম ভাবনা। দুর্ভাবনাও এলো অনেকের…।
উস্তাদদের পরামর্শ শেষে হযরত নাযেম সাহেব হুযূর দা.বা. ও হযরত খুলনার হুযূর দা.বা. আমাদের নিয়ে বসলেন। হযরত নাযেম সাহেব হুযূর দা.বা. হামদ ও সালাতের পর বললেন, মা’হাদের উদ্যোগে ইফতার ছাত্রদের জন্য ইলমী সফরের ব্যবস্থা করা হয়ে থাকে। মা’হাদের শুচনাকাল থেকে এ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। হুযূর আরো বললেন, আমাদের এটি কোনো ট্যুর বা বিনোদন নয়। আমাদের এ সফর হলো ইলমী সফর। আমাদের সফরের উদ্দেশ্য হলো উলামায়ে কেরাম ও বড় বড় মাদরাসাগুলোর যিয়ারত এবং আল্লাহর সৃষ্টি ও কুদরত দর্শন। এরপর হযূর বললেন, আমাদের সফর কোথায় হবে তা উস্তাদদের সিদ্ধান্ত ক্রমেই নির্ধারণ হবে। তবে এ ব্যাপারে তোমাদের কাছ থেকেও মতামত জানতে চাচ্ছি। তোমরা খেয়াল পেশ করো, আমাদের ইলমী সফর কোথায় হতে পারে?
হুযূরের কথা শুনে আমরা সবাই অনেক খুশি! হযরত নাযেম সাহেব ও হযরত খুলনার হুযূর আমাদের সকলের কাছ থেকে মতামত নিচ্ছেন। সানন্দে প্রত্যেকে নিজ নিজ পছন্দের ও আগ্রহের পর্যটনকেন্দ্রের কথা বলছে। মতামতে আসে- সিলেট, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, সেন্টমার্টিন, কুয়াকাটা প্রভৃতি অঞ্চল। নাযেম সাহের হুযূর আমাদের প্রস্তাবিত নামগুলো টুকে নিচ্ছেন আর লক্ষ করছেন কোনটির পক্ষে কয়টি মতামত আসছে! সাথীদের কেউ কেউ বান্দরবানের মতামত দিল। উস্তাদদ্বয় বললেন, এখন বান্দরবানে সেনা অভিযান চলছে। একমাস পর্যন্ত এ অভিযান চলবে। এখন ওখানে পর্যটকদের যাওয়া সম্পূর্ণ নিষেধ। মতামত গ্রহণের পর হুযূর বললেন, তোমাদের কাছ থেকে মতামতগুলো নেওয়া হলো। আমরা তোমাদের মতামত নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে একটি সিদ্ধান্তে আসবো ইনশাআল্লাহ। হযরত খুলনার হুযূর বললেন, আমরা চাচ্ছি কয়েকদিনের মধ্যেই আমাদের এ ইলমী সফরের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে। কারণ সামনে নভেম্বর মাস। নভেম্বরের মাঝামাঝি সময় থেকেই সমুদ্র সৈকতে পর্যটকদের আসা-যাওয়া বেড়ে যায়। তখন গুনাহের পরিবেশও বেড়ে যায়। উস্তাদদ্বয় আরো কিছু কথা বললেন।
আসাতিযা কেরামের কথাগুলো মন ছুঁয়ে গেল। আমরা যেন পর্যটনকেন্দ্রে গিয়ে গুনাহের সম্মুখীন না হই, সে বিষয়ে উস্তাদগণ বেশ গুরুত্ব দিচ্ছেন ভেবে আমাদের ভালোলাগার মাত্রাটা বহুগুণে বেড়ে গেল। এভাবে ইলমী সফরের প্রাথমিক বার্তা পেয়ে গেলাম আমরা। মনের মধ্যে অন্যরকম এক ভালোলাগা কাজ করছে তখন থেকেই। সাথীদের মাঝে দীর্ঘ দিনের প্রত্যাশিত সফরের আলোচনা ও উদ্দীপনা বেড়ে গেলো। তবে এখনো দিন-তারিখ ঠিক হয়নি। সামনে আবার আমাদের দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষা। এরই মাঝে আমাদের অনেকে উস্তাদদের কাছে সেন্টমার্টিন সফরের আগ্রহ প্রকাশ করলেন।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
হযরত মুদীর সাহেব হুযূর দা.বা. সফরের সপ্তাহ-দশদিন আগে আমাদেরকে নিয়ে বসলেন এবং আমাদের সফর বিষয়ে কিছু আলোচনা করলেন। মা’হাদের অতীতের ইলমী সফরগুলো যে সকল পর্যটন এলাকায় হয়েছিল, সেগুলোর কথাও আলোচনা করলেন। হুযূর বললেন, যে সকল জায়গায় আমরা গিয়েছি তার মধ্যে কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকতই আমাদের কাছে বেশী ভালো লেগেছে। বার বার সমুদ্র সৈকতে যেতে মনে চায়। এরপর হুযূর বললেন, তোমরা সেন্টমার্টিনে যেতে চাও, শোনেছি। সমুদ্রপথে জাহাযে চড়ে সেন্টমার্টিনে আসা-যাওয়াটাই মূল আনন্দের। বিশাল সমুদ্রের মাঝ দিয়ে নৌযানে চড়ে সেন্টমার্টিনে যাওয়ার সময় সমুদ্রের যে উত্তাল ঢেউ এবং সমুদ্রের যে সুন্দর পরিবেশের সৃষ্টি হয় সেটাই এখানে মূল আনন্দ ও উপভোগের বিষয়। হুযূরের কথাগুলো শুনে হৃদয় যেন সেন্টমার্টিনের প্রতি আরো ব্যাকুল হয়ে উঠছিলো। পরক্ষণেই হুযূর বললেন, আমরা তো মুরুব্বী উস্তাদদেরকে নিয়ে সফরে যাবো। তো মুরুব্বীদেরকে নিয়ে সেন্টমার্টিনের উদ্দেশ্যে যাতায়াত করাটা সুবিধা হবে বলে মনে হচ্ছে না। কারণ যে জাহাযে করে সেন্টমার্টিনে যাওয়া হয় তাতে যাতায়াতের পুরো সময় ধরে গান-বাদ্য বাজতে থাকে। আর যুবক-যুবতীদের পর্দাহীনতার কারণে চোখের হেফাযত করা দুরূপ ব্যাপার হয়ে উঠে। তো এমন পরিবেশে যাওয়া সমীচিন না। তা ছাড়া আমাদের সফরের অন্যতম একটি উদ্দেশ্য হলো ঐ অঞ্চলের বড় বড় মাদরাসাগুলোর এবং উলামায়ে কেরামের যিয়ারত লাভ করা। তাদের কাছ থেকে ফুয়ূয ও বারাকাত অর্জন করা। সেন্টমার্টিন যাতায়াতে যে সময় লেগে যাবে তাতে মাদরাসাগুলোর যিয়ারত আর সম্ভব হবে না।
মুদীর সাহেব হুযূর দা.বা. পরামর্শের মাধমে সিদ্ধান্ত নিলেন যে, আমরা কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে এবং চট্টগ্রামের কয়েকটি মাদরাসায় ইলমী সফর করবো।
হযরত মুদীর সাহেব হুযূরের এ সিদ্ধান্তে আমরাও একমত হয়ে গেলাম। সত্যি বলতে কি! তখন সেন্টমার্টিনে যাওয়ার বিষয়টি নাকচ হওয়ায় সাময়িক একটু মনক্ষুণ্ন হলেও এভেবে ভালো লেগেছে যে, আসাতিযায়ে কেরাম আমাদেরকে নিয়ে একটি গুনাহমুক্ত সফর করতে চাচ্ছেন। এমন সুযোগ কি আর আসবে! তাই আমরা মন থেকেই সিদ্ধান্তটি মেনে নিলাম।
আমরা বুঝতে পারছিলাম, আমাদের ইলমী সফর সন্নিকটে এসে এসেগেছে। দিন যত গড়াচ্ছিল সব দিক থেকে সফরের প্রস্তুতিও সমতালে চলছিল। উস্তাদগণ যানবাহনের ব্যবস্থা করছেন। কক্সবাজারে গিয়ে আমরা কোন হোটেলে থাকবো? সফর সংক্রান্ত যাবতীয় বিষয় হযরত মুদীর সাহেব হুযূর, খুলনার হুযূর ও রাজশাহীর হুযূর দা.বা. ব্যবস্থা করছেন। আমরাও মানসিক প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। আমরা টুকিটাকি সফরসামগ্রীর তালিকা প্রস্তুত করলাম। ক’দিনের মধ্যেই আমাদের ইলমী সফরের দিন-তারিখ নির্ধারণ হলো ২৫ রবীউস সানী সোমবার দিবাগত রাত থেকে ২৭ রবীউস সানী বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত মোট আড়াই দিন। সফরে আমরা সাথী হবো মোট ত্রিশজন। মা’হাদের ছয়জন উস্তাদ, ইফতা বিভাগের ১৯ জন তালাবা, একজন কমিটিসদস্য এবং দু’টি হাইস ও একটি নোয়ার ড্রাইভারসহ আমরা এই মোট ত্রিশজন সফর সঙ্গী। আসা-যাওয়াসহ দুইদিন তিনরাত আমাদের সফর হবে। কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত দর্শন ও চট্টগ্রামের বড় কয়েকটি মাদরাসা ও সেখানকার উলামায়ে কেরামের যিয়ারত আমাদের ইলমী সফরের উদ্দেশ্য।
২৫ রবিউস সানী। দিন তারিখ তো আগেই ঠিক করা হয়েছে। দেখতে দেখতে আমাদের কাঙ্ক্ষিত দিনটি চলেই এলো। ইশার পর আমাদের মা’হাদ প্রাঙ্গনে দুটি হাইস ও একটি নোয়া গাড়ী উপস্থিত হলো। আমরা ইশার নামাযের পর ইলমী সফরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা করবো। আমরা কে কোন গাড়ীতে চড়বো হযরত মুদীর সাহেব দা.বা. তা লিখিতভাবে নির্ধারণ করে দিলেন। আল্লাহর কী ফায়সালা, মুদীর সাহেব হুযূরের এ বণ্টন দেখে আমরা সবাই খুশী হলাম।
দিকনির্দেশনা মজলিস
মুদীর সাহেব হুযূর সংবাদ পাঠালেন কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি এবং হযরত নাযেম সাহেব হুযূর দা.বা. আমাদেরকে নিয়ে বসবেন এবং ইলমী সফরের জরুরী হিদায়াত ও গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা পেশ করবেন।
হযরত মুদীর সাহেব দা.বা. এর হিদায়াতী বয়ান
উস্তাদগণ অল্প সময়ের মধ্যেই উপস্থিত হলেন। প্রথমে হযরত মুদীর সাহেব সংক্ষিপ্ত কিছু কথা বললেন। যা ভাবছিলাম তাই হলো, হুযূর আমাদের কাছ থেকে সফরের সুন্নাতসমূহ শুনলেন। আরো বিশেষভাবে শুনলেন সফরের দু‘আগুলো। হুযূর আমাদের কাছ থেকে সফরে যানবাহনে চড়ার দু‘আটি শুনে বললেন, আমি এ দু‘আটি তাহকীক করেছি। তো এতে وكَابَة المنظر এর স্থলে وكَآبَةالمنظر হবে। হুযূর আরো বললেন, সফরের মাঝে যাত্রা বিরতির পর যখনই আমরা গাড়ীতে উঠবো তখনই এ দু‘আ পুনরায় পড়ে নিবো। এতে নেকী আরো বৃদ্ধি পাবে ইনশাআল্লাহ। এরপর হুযূর আমাদের সহজের জন্য বলে রাখলেন, প্রথমে যারা গাড়ীর পিছনের সিটে বসবে, সফরে মাঝে আমরা তাদেরকে সামনের সিটে নিয়ে আসবো এবং যারা প্রথমে সামনের সিটে বসবে তাদেরকে মাঝের ও পিছনের সিটে বসাবো। তোমাদের সুবিধার জন্য আমরা এমনটা করবো। হুযূরের একথায় আমাদের মনের সাহস বেড়ে গেলো। মনের সংশয় কেটে গেলো। আমাদের গাড়ীতে সফরের শুরুতে যে তিন ভাই পিছনের সিটে বসে ছিলেন সফরের একদম শেষ পর্যন্ত তারা পিছনেই ছিলেন। সফরের বিভিন্ন পর্যায়ে আমরা তাদেরকে বলেছি, ভাই আপনারা সামনে আসেন, এখন আমরা পিছনে বসি। কিন্তু তাদের অভিব্যক্তি ছিল এমন যেন তাদের পিছনের সিটেই ভালো লাগছে। যাক ভাইদের ভালো হলে আমাদেরও ভালো। আমরা তিনজন হাইসের মাঝের সিটে ছিলাম। আমাদেরও আপন সিটে ভালো লাগছিলো। এরপর হযরত মুদীর সাহেব হুযূর বললেন আমি কিছু কথা বললাম এখন নাযেম সাহেব হুয়ূর তোমাদের ইলমী সফরের মূল হিদায়াতী বয়ান করবেন। হুযূর আরোও বলে গেলেন, সবাইকে সফরনামা লিখতে হবে।

হযরত নাযেম সাহেব হুযূর দা.বা.-এর দিকনির্দেশনা
আমাদের মা’হাদের প্রিয় নাযেম সাহেব হুযূরের কথা ও হিদায়াতী বয়ান শুনে হৃদয় খুব বিগলিত হলো। হবেই তো হৃদয়ের কথা যে হৃদয় গ্রহণ করে। এবারের ইলমী সফরে নাযেম সাহেব হুযূরকে আমরা পাচ্ছিনা বলে খুব আফসো হল। হুযূরের বয়ান শুনে আমারা ইলমী সফরের প্রতি আরো অনুপ্রাণিত হলাম। হিদায়াতী বয়ানে হুযূর যে জরুরী কথাগুলো বলেছিলেন, তার কিছু নিম্নরূপ :
১. মা’হাদ তার সূচনালগ্ন থেকেই দারুল ইফতার তালিবুল ইলমদের জন্য এ ইলমী সফরের ব্যবস্থা রেখেছে। তাই এ ব্যবস্থাপনার জন্য মা’হাদের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা প্রয়োজন।
২. الراحلة العلمية তথা ইলমী সফরে নতুন নতুন বিষয় জানা হবে। সফরের পরতে পরতে বহু নতুন বিষয় সামনে আসবে। মানুষের সাথে মেলা মেশা হবে। বহু মানুষের বহু চিত্র সামনে আসবে। অনেক কিছু উপলব্ধ হবে। তো সেগুলো থেকে যেন আমরা কিছু না কিছু শিক্ষা অর্জন করতে পারি।
৩. এ ইলমী সফরে আল্লাহ তা‘আলার অনেক কুদরত দেখা হবে। তো জাগ্রত চেতনা নিয়ে সেগুলো উপভোগ করতে হবে। নিজের অনুভূতিকে জাগ্রত করতে হবে। আরো অনেক মানুষ সেখানে শুধুই বিনোদনের জন্য যাবে। তো আমরাও যেন তাদের মত উদাস না থাকি। শুধু বিনোদন না করি; বরং আল্লাহর স্মরণ যেন হৃদয়ে তখনো জাগরূক থাকে সে বিষয়ে সবিশেষ যত্নবান হই। শুরু থেকে শেষ অবধি পুরো সফরটা যেন ইলমী সফর হয় সি দিকে বিশেষ খেয়াল রাখি।
৪. সফর হলো কষ্টের জিনিস। আর কষ্টের সময় মানুষ চেনা যায়। হাদীসে এসেছে, السفر قطعة من النار। সফর হল জাহান্নামের একটি টুকরা। হুযূর আরো বললেন,السفر هو الكشف، الإسفار তো তোমরা পরস্পর সাথী। এখানে তোমরা মাদরাসার পরিবেশে আছ। নিজ বাড়ির মতোই সবকিছু তোমাদের অনুকূলে। কিন্তু এখন তোমরা যাচ্ছো সফরে। সফরে বের হওয়ার পর বিভিন্ন অবস্থার সম্মুখীন হতে পারো। কষ্টের মুহূর্তও আসতে পারে। তখন যেন অপর ভাইকে, অপর সাথীকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। অন্যকে অগ্রাধিকার দেওয়ার মানসিকতা যেন থাকে। কারণ তখন সাথী তোমাকে চিনে নিবে। হুযূরের এ কথা শুনে খুব ভয় হলো। আল্লাহ যেন আমাদের সবাইকে ঈছারের সাথে সারা জীবন থাকার তাওফীক দান করেন, আমীন।
৫. গুনাহ যেন না হয়, নেকী যেন হাসিল হয়। সেখানে গুনাহের পরিবেশ থাকবে। কারণ ওগুলো পর্যটনকেন্দ্র। সব ধরণের মানুষেই সেখানে আসতে পারে। তো নজরের হিফাযত যেন হয়।
৬. সফরের যিনি আমীর বা যিম্মাদার হবেন তাকে যেন মান্য করা হয়। আমীরকে না বলে কোথাও যাবেনা। কোথাও গেলে অবশ্যই আমীরকে জানিয়ে তার অনুমতি সাপেক্ষে যাবে।
৭. মোবাইল নিয়ে যাবে না। মা’হাদে তোমরা যেমন কানূন মেনে চলেছো, সফরেও সে কানূন বহাল থাকবে। সেখানেও কেউ মোবাইল নিয়ে যাবে না।
৮. পুরা সফরে দু‘আর সাথে থাকবে। আল্লাহ যেন বিপদাপদ থেকে সবাইকে হিফাযত করেন, সে জন্য দু‘আ করবে। তোমরা তো মা’হাদের সর্বোচ্চ বিভাগের তালিবে ইলম, তোমরা সকলই সফরে যাচ্ছো। তোমাদের সাথে উস্তাদরাও যাচ্ছেন। মা’হাদের বড় এবং প্রধানতম একটা অংশ এখন সফরে যাচ্ছে। তো এদের কোনো দুর্ঘটনা হওয়া মানে অনেক বড় কিছু। তাই আল্লাহকে স্মরণে রাখতে হবে। দু‘আর সাথে থাকা কাম্য।
সর্বশেষ হুযূরও বলে দিলেন, সবাইকে অবশ্যই অবশ্যই ইলমী সফরনামা লিখতে হবে। সফর চলাকালীন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য টুকে রাখার জন্য সাথে নোটবুক রাখবে, যাতে সফরনামা লেখার সময় নিজের সংগৃহীত তথ্যসমূহ থেকে সহযোগিতা নেওয়া যায়।
কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাদের গাড়ী কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাবে। আসলে আমাদের ইলমী সফরের প্রস্তুতি হিসেবে সব ধরণের আনুষ্ঠানিকতাই চলছিলো। কিন্তু কেন যেন আমার মধ্যে সফরের কোনো আনন্দ-অনুভূতি জাগ্রত হচ্ছেনা। কেমন যেন আমি সবার দেখাদেখি সফরের প্রস্তুতি নিয়ে যাচ্ছি। যেন নিষ্প্রাণ দেহটাকে পরিচালনা করছি। কেন এমন হচ্ছে কিছই বুঝে উঠতে পারছিনা। গত সপ্তাহে বাড়ীতে গিয়ে ছিলাম। সবাইকে আমাদের এ সফর সম্পর্কে জানিয়ে ছিলাম। সবাই বেশ উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু কই, আমি এত নিস্তেজ হয়ে গেলাম কেন? আমার ভিতরে সফরের উদ্যমতা আসছে না কেন। সবার মধ্যে কত চাঞ্চল্য পরিলক্ষিত হচ্ছে। কাউকে আমার বিষয়টি যে বলবো, সে ফুরসতও মিলছেনা। সবাই যে এখন সফরের জন্য উদগ্রীব।
হযরত মুদীর সাহেবের রুমে বসে আমাদের তিন গাড়ীর ড্রাইভার ভাই রাতের খাবার খাচ্ছেন। একজন ড্রাইভার হযরত মুদীর সাহেবের সাথী। তারা একই সাথে রাহমানিয়ায় তাইসীর-মীযান পড়েছেন। পরবর্তীতে তার পড়াশোনার আর সুযোগ হয়নি। এরপর থেকে তিনি গাড়ী চালান। বহু বছরের অভিজ্ঞ গাড়ী চালক তিনি। আমাদের গাড়ীর ড্রাইভার সাহেবের সাথে কথা হলো। তিনি বললেন, চট্টগ্রামের পাহাড়ী অঞ্চলে এখন অনেক কুয়াশা পড়ে। অতি কুয়াশার কারণে সামনের দিকে স্পষ্ট দেখা যায় না। তাদের খাবার শেষে হযরত মুদীর সাহেব আমাদেরকে গাড়ীতে উঠতে বললেন। সবগুলো গাড়ীর সামনে ও পিছনে ‘মা’হাদুল বুহুসিল ইসলামিয়ার ইলমী সফর’ শিরোনামে ছোট ব্যানার লাগানো হয়েছে। পূর্ব থেকে সংগৃহীত এক লিটারের অনেকগুলো পানির বোতল এবং অনেকগুলো বিস্কুটের প্যাকেট গাড়ীতে উঠানো হলো। মা’হাদের মুখপত্র বাতায়ন-এর একাদশ সংখ্যার কয়েকটি কপিও গাড়ীতে রাখা হয়েছে। মা’হাদের পক্ষ থেকে এগুলো উলামায়ে কেরামকে হাদিয়া প্রদান করা হবে। গাড়ীতে উঠার সময় লক্ষ করলাম, মা’হাদের কিতাব বিভাগের কয়েকজন তালিবুল ইলম গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। জানি না, কী তাদের মনের অভিব্যক্তি! এতটুকু তো বুঝা যায়, হয়ত তাদেরও আমাদের মত ইলমী সফরে যেতে মনে চাচ্ছে। হয়ত তাদের আগ্রহ আমাদের চে’ বেশী হবে। তবে এটিই নিয়তির চিত্র। কেউ আগে, কেউ পরে। কেউ সুখে, কেউ দুঃখে। তাই আমাদের কর্তব্য, নির্ধারিত সময়ের জন্য সবর করা আর উপযুক্ত সময়ের জন্য শোকর করা। আলহামদু লিল্লাহ।

শুরু হল পথ চলা
আমরা বিসমিল্লাহ বলে গাড়ীতে আরোহণ করলাম। ভালোভাবে আসন গ্রহণ করে তিনবার আল্লাহু আকবার বললাম। এরপর জানবাহনে আরোহণ ও সফরের দু‘আ উচ্চস্বরে পাঠ করলাম। আমরা মা’হাদ প্রাঙ্গন থেকে গাড়ীতে উঠলাম ৯ জন। ৯ জনের একজন হলেন হযরতওয়ালা মুদীর সাহেব হুযূর দা.বা.। আমাদের সামনের গাড়ী ছেড়ে দিয়েছে। আমাদের গাড়ীও এখন ছেড়ে দিবে। কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের উদ্দেশ্যে! হয়ত সারা রাত আমাদেরকে যাত্রাপথে থাকতে হবে। আল্লাহ চাইলে ভোর-সকালে সমুদ্র সৈকতে আমাদের গাড়ী থামবে। রাত এখন ১০টা ২৬মিনিট। আমাদের গাড়ীতে ড্রাইভার সাহেব আরোহন করলেন। ধীরে ধীরে তার গাড়ী চালনা শুরু করলেন। একটু সামনে অগ্রসর হতেই গাড়ী যখন ডানে-বামে মোড় নিচ্ছিলো তখন স্পষ্ট অনুভব করছিলাম, হৃদয়ের বদ্ধ দুয়ার যেন এতক্ষণে ইলমী সফর অভিমুখে মোড় নিলো, হৃদয় যেন উন্মুক্ত হলো। আনন্দের আতিশয্যে পাশের সিটের সাথীদেরকে মুখ ফুটিয়ে বলেই ফেললাম তখনকার হৃদয়ের অনুভূতির কথা। বসিলা গার্ডেন সিটি এফ ব্লকের ০৮ নম্বর রোড থেকে আমাদের গাড়ী আঁকাবাঁকা রোড পাড়ি দিয়ে ৪০ ফিটে গিয়ে থামলো এবং এখান থেকে মা’হাদের কমিটি সদস্য হযরত মাওলানা মাসূম বিল্লাহ সাহেব দা.বা. আমাদের গাড়ীতে উঠলেন। হযরত মুদীর সাহেব হুযূরের পরামর্শে তিনি সামনে ড্রাইভারের পাশের সিটে বসলেন। মাশাআল্লাহ, তাকে ঐ আসনে মানানসই মনে হচ্ছিল। এবার গাড়ী চলবে নির্বিঘ্নে দুর্বার গতিতে, যদি পথে জ্যামে না পড়ে। কারণ, ঢাকা শহর বলে কথা। কী দিন, কী রাত, সবই সমান। আমাদের ভাগ্য ভালো ছিল। বেশি সময় লাগল না ঢাকা শহর পার হতে। গাড়ী চলছে। ঢাকা শহর ছাড়ার আগে আগে একবার গাড়ী থামল এবং পথিমধ্যে হযরত মুদীর সাহেবের পরামর্শে মাওলানা মাসূম বিল্লাহ সাহেব গাড়ী থেকে নেমে সবার জন্য চিপস, চানাচুর জাতীয় শুকনো খাবার কিনলেন। তিনি গাড়ীতে উঠে ড্রাইভারসহ সাবার মাঝে বণ্টন করে দিলেন।
আমাদের গাড়ী আবার চলা শুরু করল তার গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। আমাদের সাথে আরো গাড়ীও ঢাকা শহর ত্যাগ করছে। ধীরে ধীরে রাস্তায় গাড়ীর স্যাংখা কমতে লাগল। রাস্তা ফাঁকা ফাঁকা মনে হচ্ছে। দেখতে দেখতে আমরা মেঘনা ব্রিজ পাড় হয়ে গেলাম। ব্রিজ পাড় হয়ে কুমিল্লার দাউদকান্দি থানার এক্সপিড সি.এন.জি পাম্পে এসে রাত ১২টায় গাড়ী থামল। এখানে এসে দেখি আমাদের আরেকটি গাড়ী দাঁড়িয়ে আছে। সাথীরা গাড়ী থেকে নেমে আমাদের আপেক্ষা করছেন। খুলনার হুযূর সে গাড়ীর যিম্মাদার। ভালো লাগল সাথীদের দেখে। ভালো তো লাগবেই! এখন যে আমরা আমাদের আবাসন থেকে দূরে, বহু দূরে আছি। মানুষ তার মাতৃভূমি থেকে যত দূরত্বে অবস্থান করে, তার কাছে পাওয়া স্বদেশের মানুষের সাথে হৃদয়ের টান তত বাড়ে! এই অনুভূতি শুধু আমার একার নয় বরং; এ অভিজ্ঞাতা অনেকের। আমরা প্রয়োজন সেরে নিলাম। উযূ-এস্তেঞ্জার জন্য ভালো ব্যবস্থা রয়েছে। সেই সাথে রয়েছে নামায আদায়ের সুন্দর ব্যবস্থা। যেহেতু আমাদের আরেকটি গাড়ী এসে এখনও পৌঁছায়নি তাই হযরত মুদীর সাহেব হুযূর বললেন, এসময়ের মধ্যে আমরা তাহাজ্জুদের নামায পড়ে নিতে পারি। উযূ করে দু’তলায় আমরা তাহাজ্জুদের নামায পড়লাম। তাহাজ্জুদের পরে হুযূর হারুন ভাইকে সূরা মুায্যিম্মল থেকে পড়তে বললেন। ভাই কয়েক আয়াত তিলাওয়াত করলেন। اِنَّ نَاشِئَةَ اللَّيْلِ هِيَ اَشَدُّ وَطْئًا وَاَقْوَمُ قِيلًا এই আয়াতের অর্থ ও ব্যাখ্যা করলেন হুযূর। এরপর সংক্ষিপ্ত মুনাজাত হল। এরই মাঝে আমাদের আরেকটি গাড়ী এসে উপস্থিত হল। ঐ গাড়ীতে ছিলেন মুফতী ইবরাহীম হাসান সাহেব ও মাওলানা সুহাইল সাহেব দা.বা.। আমরা নীচে চলে এলাম। সফরে বের হওয়ার পরে উস্তাদে মুহতারাম মুফতী ইবরাহীম হাসান সাহেবকে এখানে প্রথম দেখলাম। আহ, কতনা নূরানী তিনি! সাদা পোশাকে হুযূরকে যেন আরো শুভ্র-উজ্জ¦ল মনে হল। হুযূরের হাতে ছিল কালো লাঠি। হুযূরও একটু হাঁটাহাঁটি করলেন। হুযূরকে দেখে খুব ভালো লাগলো।
গাড়ীতে উঠার নির্দেশ এলো। রাত তখন ১টা। আমরা গাড়ীতে চড়লাম। একে একে তিনটি গাড়ীই চলতে শুরু করল। রাস্তা মসৃণ, গাড়ীর চাকা আরো মসৃণ। অন্ধাকার রাতে গাড়ী তার নিজস্ব আলোতে বেশ দ্রুত এগিয়ে চলছে গন্তব্যপানে। কিছুদূর যেতেই হযরত মুদীর সাহেব দা.বা. জিজ্ঞাসা করলেন, গাড়ীতে আরোহণের দু‘আ কে কে পড়েছো? আমরা অনেকে ফেল করলাম। হুযূরের একথা শুনে যারা আগে দু‘আ পড়িনি তারা পড়ে নিলাম। মনে মনে খুব লজ্জিত হলাম। কিছুক্ষণ আগেই তো মা’হাদে বসে হুযূর আমাদের কাছ থেকে সফরের দু‘আ শুনেছেন এবং অন্যান্য সুন্নাতের মুযাকারা করেছেন। এত তাড়াতাড়ি তা ভুলে গেলাম! এ যেন আমাদের জন্য আদর্শ পিতার উত্তম তরবিয়াত (দীক্ষা)। আনন্দঘন এমন মুহূর্তে সাধারণত সুন্নাতের প্রতি খেয়াল থাকে না। হয় অতি আনন্দ-উৎফুল্লতার কারণে কিংবা অতি ব্যস্ততার কারণে! হুযূর আমাদেরকে উদাসিনতার ঘোর থেকে জাগ্রত করলেন, সতর্ক করলেন। পুরো ইলমী সফরেই হুযূর আমাদেরকে বারবার স্মরণ কারিয়ে দিয়েছেন আমলের কথা এবাং সতর্ক করেছেন গুনাহের ব্যাপারে। আলহামদু লিল্লাহ, আমারা এমন উস্তাদদের তত্ত্বাবধানে ইলমী সফরে আসতে পেরে ধন্য ও কৃতজ্ঞ।
হযরত মুদীর সাহেব আরো বললেন, আচ্ছা, আমরা ফিকহের কিতাবে একটি মাসআলা পড়েছি। যখন যানবাহন শহরের বাহিরে চলতে থাকে তখন আরোহী চাইলে যানবাহন যেদিকে চলছে সেদিকে ফিরেই নফল নামায পড়তে পারে। তাইনা? আমরা উত্তরে বললাম, জ্বী, আমরা এ মাসআলা পড়েছি। হুযূর বললেন, তাহলে যাদের উযূ আছে তারা মাসআলাটির উপর আমল করতে পারি। আমার কাছে খুবই আশ্চর্য লাগল। আমরা এই মাসআলা কিতাবে পড়েছি ঠিক, কিন্তু তখন মাথায় ছিলো যে, এ মাসআলা আগের যুগের উট-ঘোড়া-গাধা ইত্যাদি চতুষ্পদ জন্তুর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। এ মাসআলা যে আজকের যুগের আধুনিক যানবাহনের ক্ষেত্রেও প্রজোয্য হবে তা মাথায়ই আসেনি। হুযূর নামায শুরু করে দিলেন। হুযূরের দেখাদেখি আমাদের আরো অনেকে আরামদায়ক সিটে বসে বসে দিব্বি নফলের নিয়ত বেঁধে ফেললেন। বেশ তো! সফর-সালাত সবই একসাথে চলছে! একবার ভাবলাম এ মুহূর্তে আসলে আমরা কোন দিকে যাচ্ছি ? দক্ষিণ দিকে, না উত্তর দিকে, নাকি পূর্ব দিকে?
রাত এখন গভীর। চারিদিক নিথর নিস্তব্ধ। মহাসড়ক শুধু ব্যস্ত। লক্ষ্য করছিলাম, অনেকেরই চোখে ইতিমধ্যে ঘুম নামক জিনিসটি চলে এসেছে। এই তো মোবারক ভাই আমাদের সামনের সিটে বসে ঘুমের ঘোরে দীর্ঘ পথ পারি দিয়ে ফেলেছেন। আরো অনেকেই ঘুমের কোলে ঢলে পড়েছেন। আমি কিন্তু সজাগ। আজ দেখবো কতক্ষণ সজাগ থাকতে পারি। অন্ধাকারে পথের দু’পাশের কিছু দেখা যাচ্ছে না। শুধু দেখা যাচ্ছে পথের গাড়ীগুলো। দীর্ঘ পথ অতিক্রম করার পর পিছনের সিট থেকে আবূ বকর ভাই বললেন, আমরা শীতাকুণ্ডে চলে এসেছি। আহ! কত শুনেছি এ জায়গার কথা। এখানকার পাহাড়-ঝর্ণার কথা। উঁকিঝুঁকি করছিলাম কোনো পাহাড় এখান থেকে দেখা যায় কিনা? কিন্তু বিদঘুটে অন্ধকারে কিছুই দৃষ্টিগোচর হল না। যাক, সব আশা তো আর একসাথে পূরণ হবার নয়! আমি চেষ্টা করছি জাগ্রত থাকতে। কারণ আমার কাছে গাড়ীতে ভ্রমণ একটি স্বতন্ত্র আনন্দ এবং উপভোগের বিষয়। হোক তা রাতে কিংবা দিনে। বরং ক্ষেত্রবিশেষে রাতের সফরই বেশি আনন্দদায়ক। পাশের সবাই মাথা ঢুলাচ্ছে ঘুমের ঘোরে। আামদের পিছনের সিটে দেখি মাশাআল্লাহ তিনজনে সটান হয়ে ঘুমাচ্ছে। মাঝে মাঝে কাউকে অবশ্য জাগ্রত দেখা যায়। গতকাল আমরা মাদরাসায় ছিলাম। কোনো জার্নি হয়নি। তাই সাহস করছিলাম আজকেম রাতে জাগরণ করব। কিন্তু রাতের সফরে এতক্ষণে বেশ জার্নি হয়ে গেছে। যদিও এ গাড়ীতে সফর খুব আরামদায়ক মনে হচ্ছে। কিন্তু সফর বলে কথা! সফর যে জাহান্নামের কষ্টেরই একখণ্ড। তাইতো সফরকালে ইসলামে এত সুযোগ সুবিধা দেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে আমাদের গাড়ী ডানে মোড় নিয়ে নদীর পার্শস্থ রাস্তা দিয়ে কর্ণফুলী টানেল অভিমুখে রওয়ানা করেছে। আমার ভয় করছে। এখন যদি কিছু হয়ে যায়, কী অবস্থা হবে? কে আমাদের সাহায্যে এগিয়ে আসবে? রাস্তা একদম ফাঁকা। মানুষজন তো দূরের কথা, তেমন গাড়ীঘোড়ারও দেখা নেই। রাস্তা বেশ মসৃণ। এত সুন্দর পথ যদি দিনের বেলা হত তাহলে কতইনা সুন্দর দেখাত। সামনের সিটে বসে মাওলানা মাসূম বিল্লাহ সাহেব ফোনের ক্যামেরা চালু করে রাস্তার ভিডিও নিচ্ছেন। এখন আমরা অধিকাংশই জাগ্রত। এ যে উপভোগ করার মত পথ। সাইফুল ইসলাম ভাই বললেন, ঐ যে ডান দিকে মিটিমিটি আলো দেখা যাচ্ছে। ওগুলো জাহাজের আলো। আমিও লক্ষ করছি— একটু একটু দেখা যাচ্ছে। কিন্তু কুয়াসার কারণে স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছেনা। দেখতে দেখতে আমরা কর্ণফুলী টানেল চলে এলাম। টানেলের এ পাশটা বেশ চমৎকার। আমাদের আগে নোয়া গাড়ী চলে গিয়েছে। এখন আমাদের হাহস দু‘টি এক সাথে চলছে। কর্ণফুলী টানেলের আগে আমাদের গাড়ী থামিয়ে দেওয়া হলো। কারণ টানেলে এক দিকের গাড়ী চলাচল করে। এখন আমাদের অপেক্ষায় থাকতে হবে বিশ মিনিট। ও পাশের কিছু গাড়ী এপাশে আসবে, পরে আমাদেরকে ছাড়বে। তখন আমরা ওপাশে যাবো। এ টানেল সম্পর্কে আগে কখনো শুনিনি। এ টানেলটি নদীর নীচ দিয়ে তৈরী। হয়ত নদীর অনেক নীচের ভূগর্ভ দিয়ে এ টানেল তৈরী হয়েছে। বিশ মিনিট অপেক্ষার পরে ওখানাকার কর্মরত ব্যক্তিরা আমাদেরকে গাড়িতে উঠতে বললো এবং গাড়ী ছাড়তে বললো। আমাদের গাড়ী সচল হলো। আমরা টানেল অতিক্রম করছি। একদম ফাঁকা, তবে গাড়ী বাহিরের খোলা রাস্তার মত দ্রুত বেগে চলছেনা। টানেলের ভিতর সুন্দর লাইটিংয়ের ব্যবস্থা রয়েছে। টানেল পার হতে আমাদের সময় লাগলো পাঁচ মিনিটের মত। আমাদের গাড়ী চলছে। আমিও কখনো ঘুমিয়ে যাচ্ছি। আবার জেগে উঠছি। ইচ্ছা করেও জেগে থাকতে পারছিনা। ক্লান্তি চলে এসেছে। মাঝে মাঝে সাথে থাকা বিস্কুট, চিপ্স আর পানি খাচ্ছি। গাড়ীর এসি চলছে ঠিক, কিন্তু তাতে যেন হচ্ছে না। মাঝে মাঝে আমার ডান পাশের ছোট গ্লাসটি ফাঁকা করে দিচ্ছি। তাতে ভিতরে ভালোই বাতাস আসে। ড্রাইভার আল আমীন ভাই বললেন, এসির পাওয়ার বাড়িয়ে দিলে বাহিরের কুয়াশার কারণে গাড়ীর সামনের গ্লাস ঘেমে যাচ্ছে। তাই এসি বন্ধ না করলেও তার পাওয়ার কমিয়ে রাখতে হচ্ছে। আমাদের গাড়ীর ড্রাইভার সাহেবের জন্য খুব মায়া হলো। বেচারা আমাদেরকে নিয়ে দ্রুত বেগে গাড়ী হাঁকিয়ে শুধু সম্মুখপানে চলছেন। আমরা ঘুমিয়ে-জেগে রাত পার করছি। কিন্তু তিনি! তিনি সজাগ-সচেতন! তার একার অসচেতনতা আমাদের সকলের জন্য বড় বিপদ বয়ে আনতে পারে! দেখতে মনে হয়, বেশ উদ্দমতার সঙ্গেই ড্রাইভ করে যাচ্ছেন।
ঘুমে-নির্ঘুমে ভোর হয়ে গেলো। ফজরের সময় আমরা চট্টগ্রামের পটিয়া থানার শাহ আমানত সি.এন.জি স্টেশনে পৌঁছলাম। গাড়ী থেকে নেমে দেখি পুরো এলাকা শুভ্র কুয়াশা ঘেরা। সুন্দর লাগছে এখানকার পরিবেশ। তবে প্রচুর কুয়াশা পড়লেও শীত নেই তেমন। এখানেও উযূ-ইস্তিঞ্জার প্রয়োজন সারার ব্যবস্থা রয়েছে। আমরা ইস্তিঞ্জা-উযূ করে দু’তলায় নামাযের জায়গায় ফজরের নামায আদায় করলাম। নামাযের পর সবাই নীচে চলে এলাম এবং গাড়ীতে চড়লাম। গাড়ী এখন আমাদেরকে নিয়ে সরাসরি কক্সবাজার নিয়ে যাবে। গাড়ী চলছে। ভোরের আলো ততক্ষণে একটু একটু করে ছড়িয়ে পড়েছে। সাথীরা এখন সবাই সজাগ। এখন বোধ হয় আর কেউ ঘুমাবে না। কিছুদূর যাওয়ার পর হযরত মুদীর সাহের দা.বা. বললেন, এখান থেকে উঁচু উঁচু টিলা নজরে পড়বে। আমি খুব চেষ্টা করছিলাম, গাড়ীর ভিতর থেকে উঁকি দিয়ে টিলাগুলো দেখতে। বেশ কিছু টিলা নযরে পড়লো আমাদের। ইয়া বড় বড় টিলা। কীভাবে রাস্তার পাশে লালমাটির টিলাগুলো দাঁড়িয়ে আছে। কতদিন এভাবে দাঁড়িয়ে থাকবে? আল্লাহ যতদিন চাইবেন ততদিন। হুযূর আরো বললেন,
‘আমরা এদিকে দাওরের জামা‘আতে এসেছিলাম। সে জামা‘আতে ছিলেন হযরত মাওলানা রফীকুল্লাহ আল-মাদানী রহ., হযরত খুলনার হুযূর দা.বা. ও হযরত মাওলানা বুরহানুদ্দীন সাহেব দা.বা.। আমাদের জামা‘আত কক্সবাজারের কয়েকটি জায়গায় মেহনত করেছিলো।’
পথে রেলপথ দৃষ্টিগোচর হলো। এটাই কক্সবাজার অভিমুখী নতুন রেলপথ। রেলপথের দূরত্ব এখান থেকে বেশী নয়। আমাদের এ ইলমী সফরের জন্য প্রাথমিক পর্যায়ে এ রেলপথেই আসার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু আমাদের নির্ধারিত তারিখের রেলে টিকেট না থাকায় গাড়ীর ব্যবস্থা করা হয়েছে। সবই আল্লাহর ফয়সালা। প্রায় ১১ ঘণ্টার দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে সকাল ৯টার দিকে আমরা পৌঁছে গেলাম আমাদের জন্য পূর্ব থেকে বুকিং দেওয়া হোটেল ক্রাউন পার্কে। আমাদের ৩০জন সফরযাত্রীর জন্য ৬টি রুম দেওয়া হয়েছে। আমাদের ছয়জনকে হোটেলের ৪র্থ তলায় একটি কামরা দেওয়া হলো। কামরাটি বেশ সাজানো গোছানো ও পরিপাটি ছিলো। আরাম করার জন্য উত্তম বিছানার ব্যবস্থা রয়েছে। রেডিমেড বেডে শুয়ে যেতে মনে চাইলো। এদিকে আমাদের সকালের নাস্তা এখনো হয়নি। তাছাড়া সৈকতে একটু যেতেও মনে চাচ্ছে।
যাক, আশা অনুযায়ী ব্যবস্থা। হযরত মুদীর সাহেব ও হযরত খুলনার হুযূর দা.বা. এর সাথে আমরা সকালের নাস্তার জন্য বাহিরের খাবার হোটেলে চলে গেলাম। উস্তাদদ্বয় হোটেল ম্যানেজারের সাথে যোগাযোগ করে আমাদেরকে ভিতরে ঢুকতে বললেন। আমরা নাস্তার টেবিলে বসে গেলাম। নাস্তা প্রস্তুত হতে একটু বিলম্ব হচ্ছিল। এর মাঝে মুদীর সাহেব হুযূর আমাদের থেকে খাবারের সুন্নাত শুনলেন। নাস্তা পরিবেশন করা হলো। আমাদের ক্ষুধা পেয়েছে মোটামুটি। রুটি, পরোটা, মুগডাল আর ডিম ভাজির নাস্তা বেশ ভালোই লাগলো।

স্বপ্নের সমুদ্র সৈকতে
নাস্তার পর্ব শেষ। মুদীর সাহব ও খুলনার হুযূর আমাদেরকে বললেন, তোমরা এখন সমুদ্র দেখতে অল্প সময়ের জন্য যেতে পারো। আমাদের ইচ্ছাও এমন। হুযূর বললেন, এখান থেকে সুগন্ধা বিচ কাছেই। তোমরা হেঁটেই যেতে পারবে। আমার পায়ে ব্যথা, আমি আর খুলনার হুযূর রিক্সায় আসছি। আমরা একসাথে হাঁটতে হাঁটতে সৈকতে পৌঁছে গেলাম। সমুদ্রের যত কাছাকাছি হচ্ছি, ভিতরের আবেগ-অনুভূতি যেন আরো বেড়ে যাচ্ছে। দেখতে পেলাম, অনেকে ভিজা কাপড়ে ফিরছেন। বুঝাই যায়, তারা সৈকতে নেমেছিলো। আনন্দ যে আর ধরে না! মনে চায় দৌড়ে গিয়ে সাগড়ে অবগাহন করি! জীবনে এই প্রথম দেখা সমুদ্র সৈকত। আল্লাহু আকবার! এত সুন্দর! এত বড় ঢেউ!! শত শত মানুষ সমুদ্রের তীরে। কেউ দাঁড়িয়ে আছে, কেউ সমুদ্রে নেমেছে, কেউ হাঁটু পানিতে, কেউ কোমর পানিতে, কেউ বা বুক পানিতে। কেউ আবার টায়ার নিয়ে ভাসছে, সাঁতার কাটছে। আমার তখনকার অনুভূতি কেমন ছিলো, মনে নেই। শুধু এতটুকু মনে পড়ছে, কখন যেন আমিও পানিতে নেমে পড়েছি। বড় বড় ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে সমুদ্র তীরে। এখানে তো কোনো ঝড়-বাতাস নেই, তাহলে এই ভর দুপুরে কোত্থেকে এ ঢেউ আসছে!? সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহী! তীর থেকে বহু দূরে ঢেউ দেখা যায়, আবার নিমিশেই থৈ থৈ পানির মাঝে মিশে যায়। শুধু বুঝা যায়, বিশ ত্রিশ হাত দূর থেকে ঢেউ ওঠে তীরে এসে আছড়ে পড়ছে। ঢেউ আসার পর পানি যখন আবার সমুদ্রগর্ভে চলে যায়। পানি যেন নিজের সাথে সবকিছু নিয়ে যেতে চায়। আমাদের পায়ের নীচের বালুও চলে যাচ্ছে। শুনেছি, সমুদ্রের পানি লবণাক্ত হয়, অভিজ্ঞতা নেওয়ার জন্য অঞ্জলি দ্বারা একটু পানি তুলে মুখে দিলাম। লবণাক্ততা কাকে বলে! মনে হলো অর্ধ গ্লাস পানিতে একমুঠো মোটা দানার লবণ মিশানো হয়েছে। আর সেই পানি আমি মুখে নিয়েছি। আমরা সবাই পানিতে নেমে পড়েছি। ঢেউ এসে এসে পরনের কাপড় ভিজিয়ে দিচ্ছে। ভালো লাগছে, মনে চাচ্ছে আরো অগ্রসর হই। কিন্তু না এখন কেউ গোসল করবেনা। গোসল পরবর্তীতে হবে। হযরত মুদীর সাহের দা.বা. বললেন, কুরআান ও হাদীসে সমুদ্র ও ঢেউ সংক্রান্ত যে আয়াত ও হাদীস বর্ণিত হয়েছে, সেগুলো স্মরণ করো। হুযূর কুরআনের আয়াত পড়লেন, وَاِذَا الْبِحَارُ سُجِّرَتْ (আর যখন সাগরগুলিকে স্ফীত করা হবে), وَاِذَا الْبِحَارُ فُجِّرَتْ (এবং যখন সাগরসমূহকে উদ্বেলিত করা হবে)। আরো বললেন, সমুদ্রের নীচে অগ্নিশিখা রয়েছে। কিয়ামতের আগে তা বেরিয়ে আসবে আর সমুদ্রের পানি তখন স্ফীত হবে, উথলে উঠবে। সমুদ্র তখন আর স্থির থাকবে না। হুযূর সমুদ্র সংক্রান্ত হাদীসও শুনালেন। আমরা সমুদ্রের কোল ঘেঁষে হাঁটাহাঁটি করছিলাম। সমুদ্রের বহু চিত্র দেখা হলো।
এখন আমরা হোটেলে চলে যাবো। বিকেলের দিকে আবার আসবো সমুদ্র তীরে। অটো যোগে আমরা হোটেলে পৌঁছলাম। এবার ঘুম হবে কক্সবাজারের মাটিতে। আলহামদুলিল্লাহ খুবই প্রশান্তির একটা ঘুম হলো। যোহরের নামাযের আগে মুদীর সাহেব হুযূর দা.বা. আমাদের ডাকলেন। হযরত মুদীর সাহেবের রুম ছিলো সপ্তম তলায়। সেখান থেকে আমাদেরকে আমলের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়ার জন্য বরাবর আমাদের কামরায় এসেছেন। جزاهم الله احسن الجزاء فى الدارين، امين
৭ম তলায় আমাদের কাফেলার তিনটি রুম ছিল। উস্তাদগণ ও গাড়ীর ড্রাইভারগণ সেখানে ছিলেন। ৪র্থ তলায় আমরা ইফতার ছাত্র ভাইয়েরা ছিলাম। আমরা যোহরের নামায কসর পড়লাম। নামাযের পর আমাদেরকে নীচে গাড়ীর সামনে যেতে বলা হলো। আমাদের তিনটি গাড়ীই হোটেলের আন্ডারগ্রাউন্ডে পার্কিং এ। আমরা ত্রিশজন গাড়ীতে উঠলাম। এখন আমরা কোথায় যাচ্ছি! হ্যাঁ, দুপুরের খাবার গ্রহণের জন্য হোটেলে যাচ্ছি। হোটেল বেশী দূরে নয়। খাবার গ্রহণের পর আমরা যেহেতু হিমছড়ি পাহাড়ের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হবো, তাই এখন গাড়ী নিয়ে বের হচ্ছি। কলাতলীর হোটেল তাজ-বে রেস্তোরাঁ এন্ড বিরিয়ানি হাউসে পৌঁছে গেলাম। আমাদের খাবার পরিবেশনের জন্য চেয়ার-টেবিলগুলো লম্বা করে মুখোমুখি সাজানো হয়েছে। আমরা হাত ধুয়ে চেয়ারে বসে গেলাম। খাবারের থালা, গ্লাস, পানির বোতল পরিবেশন করা হলো। খাবার আসতে একটু বিলম্ব হচ্ছিলো। উস্তাদদের খাবার টেবিল একটু দূরে। হযরত মুদীর সাহেব উঠে এলেন আমাদের এখানে। হারুন ভাইকে তিলাওয়াত করতে বললে তিনি তিলাওয়াত করলেন। এরপর হুযূর মুবারক ভাইকে খাবার সংক্রান্ত আয়াত তিলাওয়াত করতে বললেন। মুবারক ভাই তিলাওয়াত করলেন। আমাদের বৈঠক তখন নূরানী বৈঠকে পরিণত হলো। এমন শুভ্র-সুন্দর বৈঠক আর কোথায় পাবো। হুযূর ঐ আয়াতগুলোর অনুবাদ ও ব্যাখ্যা করলেন। এর পর খানার সুন্নাতের মুযাকারা করলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই খাবার প্রস্তুত প্রস্তুত হয়ে এলো। খাবার পরিবেশন শুরু হলো। ভাত, সমুদ্রের রূপচাঁদা মাছ, আট ধরণের ভর্তা, ডাল, সালাত। দুপুরবেলা একি ভর্তা দিচ্ছে! খেয়ে দেখি ভালোই লাগছে। শুঁটকির ভর্তাও ছিলো তাতে। রূপচাঁদার তরকারীটা বেশ স্বাদের হল। নাম তার রূপচাঁদা কেন? মানুষ কেন এমন নাম দিয়েছে, জানি না। আমার মনে হয় মাছটিকে আল্লাহ বিশেষ রূপ-লাবণ্য দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। তাই মানুষ একে রূপচাঁদা বলে। আমাদের খাবারের পর্ব সম্পন্ন হলো। খাবারের পর বিশেষ মসলা গ্রহণ করলাম। যা হজমের জন্য বেশ সহায়ক।

হিমছড়ির শীর্ষচূড়ায় শুভ্র কাফেলা
খাবার খেয়ে আমরা গাড়ীতে আরোহণ করলাম। এখন পরবর্তী পর্যটন কেন্দ্রে যাবো। এবার আমরা যাবো সাগরের তীরে অবস্থিত হিমছড়ি পাহাড়ে। আমাদের গাড়ী রওয়ানা হলো। সুগন্ধা বিচ থেকে হিমছড়ি পাহাড় ১০/১২ কিলোমিটারের পথ। আমাদের গাড়ী চলছে দুর্বার গতিতে। কিছুক্ষণ পর শুরু হলো উঁচু উঁচু টিলা। যাওয়ার পথে ডানে সমুদ্র, আর বামে টিলাগুলো নযরে পড়লো। আল্লাহু আকবার! কত না বড় সমুদ্র! আমাদের এই সমুদ্র সৈকতকে বলা হয় বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত। আছরের নামাযের আগে আগে আমরা হিমছড়ি পাহাড়ে পৌঁছলাম। মসজিদের জামা‘আতে আছরের নামায আদায় করলাম। নামায শেষে পাহাড়ে উঠবো। হযরত খুলনার হুযূর দা.বা. আমাদের জন্য টিকেটের ব্যবস্থা করলেন। ভাবনার জগতে একটু বিচরণ করলাম, আসার পথে তো কত টিলাই দেখতে পেলাম। তো মানুষ এটিকে কেন বিনোদন কেন্দ্রের জন্য বেছে নিয়েছে! এত সুন্দর ব্যবস্থাপনা তৈরী করেছে। এই পাহাড়কে কেন্দ্র করে কেন এত ব্যবস্থপনা! আসলে আল্লাহ তা‘আলাই তো মানুষের জন্য এ পাহাড় এই সমুদ্র সৃষ্টি করেছেন। উপরে নীচে কত দোকান-পাট গড়ে ওঠেছে। পাহাড়ের উপরে উঠার জন্য ঢালাই করা সিঁড়ি তৈরী করা হয়েছে। সিঁড়ির একপাশ ব্যবহার করে পর্যটকরা উপরে উঠছে। একই সিঁড়ির আরেক দিক ব্যবহার করে নীচে নামছে। আমাদের উপরে উঠতে বেশী কষ্ট হলো না; বরং আনন্দ চিত্তেই অল্প সময়ে উপরে উঠে পড়লাম। মুদীর সাহেব হুযূর বললেন, আমরা আরেকটু উপরে উঠে সমান জায়গায় সবাই দাঁড়াবো। আমরা আরো উপরে উঠলাম এবং মোটামুটি সমান জায়গায় দাঁড়ালাম। এবার হুযূর পাহাড়-ঝর্ণা, নদী-সাগর ও আসমান-যমীন সংক্রান্ত আয়াতগুলো তিলাওয়াত করতে বললেন। মুবারক ভাই ও হারুন ভাই তিলাওয়াত করলেন। হারুন ভাই একটির পর একটি আয়াত তিলাওয়াত করছিলেন। আমরা তো পাহাড়ের উপরেই দাঁড়িয়ে আছি। এখান থেকে সমুদ্র দেখা যায়। সমুদ্রের বিশালতা এখান থেকে কিছুটা অনুভব করা যায়। পঠিত আয়াতগুলোর মর্ম কিছুটা যেন প্রত্যক্ষভাবেও অনুভূত হলো। হারুন ভাইয়ের কন্ঠস্বর থেকেও যেন সেই অনুভূতির প্রকাশ ঘটছে। সবাই গভীরভাবে তিলাওয়াত শ্রবণ করছেন। পাহাড়ে আরোহণকারী অনেক পর্যটককে আমাদের তিলাওয়াতের প্রতি মনোযোগী হতে দেখা গেলো। কেউ কেউ দূর থেকে দাঁড়িয়ে তেলওয়াত শুনছেন। অনেকে আমাদের পাশ দিয়ে তাদের চলার গতি ধীর করে দিয়েছেন। বুঝা যায়, এমন পরিবেশে তারাও কুরআনের তেলওয়াত শুনতে আগ্রহী। তিলাওয়াত সমাপ্ত হলো। হযরত মুদীর সাহেব হুযূর দা.বা. তিলাওয়াতকৃত আয়াতগুলোর সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা করলেন। এরপর হুযূর বললেন, তোমরা চাইলে আরেকটু উপরে উঠতে পারো। তবে কেউ একাকী হয়ে যাবে না, কয়েকজন একসাথে যাবে। মাওলানা সুহাইল সাহেব তোমাদের জিম্মাদার। আমরা আরো অগ্রসর হলাম। অনেকে জিজ্ঞাসা করছে, আমরা কোথা থেকে এসেছি? বললাম, ঢাকার মুহাম্মাদপুর থেকে। তারা মাশাআল্লাহ বললেন। আরেকটু অগ্রসর হওয়ার পর সমুদ্র স্পষ্ট দেখা গেলো। আরো স্পষ্ট দেখা গেলো পড়ন্ত বিকেলের অস্তগামী সূর্যটা। এখানে দাঁড়িয়ে পর্যটকরা সূর্যাস্ত দেখে। আর একটি গুনাহের কাজ করে। তারা এখানে সেলফি তোলে। আল্লাহ আমাদেরকে এমন গুনাহের কাজ থেকে হেফাযত করেছেন। আলহামদু লিল্লাহ। আমরা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে অস্তগামী সূর্যটাকে দেখলাম। প্রাণভরে দেখলাম সমুদ্রের বিশালতা। আহ, কে জানে, আবার কবে এখানে আসা হবে! নাহ, আনন্দঘন মুহূর্তে এমন চিন্তা মাথায় না আনি। এখন বরং প্রকৃতির মাঝে যতটা মিশে যেতে পারি ততই অর্জন! পাহাড়ের চারিদিক দেখতে চেষ্টা করলাম। মনে চায় আরো অগ্রসর হই। কিন্তু সাধারণ পর্যটকরা এ পযন্তই উঠছে, সামনে কাউকে দেখা গেলো না তেমন। আরো কিছুক্ষণ অবস্থান করে আমরা হিমছড়ি পাহাড় থেকে নীচে নেমে এলাম। হিমছড়ি ঝর্ণার কথা তো আমার স্মরণেই ছিলো না। আসেম ভাই বললেন, ঐ যে ঐদিকে অনেকে যাচ্ছে ঝর্ণা দেখতে। আপনারাও যেতে পারেন। মানে তিনি ঝর্ণা দেখে ইতিমধ্যে চলেও এসেছেন। আমরা কয়েক জন ঝর্ণার কাছে গেলাম। সুবহানাল্লাহ! এখানে পাহাড়ের সৌন্দর্য ঝর্ণার চে’ কম নয়! এখান থেকে পাহাড়ের উঁচ্চতা স্পষ্ট বুঝা যায়। সুউঁচ্চ পাহাড় দাঁড়িয়ে আছে আল্লাহর হুকুমে। এপাহাড় তো মাটিরই হবে, কীভাবে অনড় দাঁড়িয়ে আছে! ঝর্ণা অভিমুখী হলাম। উঁচু স্থান থেকে ঝর্ণার সুশীতল পানি নেমে আসছে। ঐ তো ইমরান ভাই শীতল পানির স্পর্শ গ্রহণ করছেন! দেখলাম, বোতলেও ঝার্ণার পানি নিচ্ছেন তিনি, তার অনুভূতি এখন অন্যরকম! আমরা ক’জন ঝর্ণার প্রবাহিত পানিতে নামলাম। প্রচণ্ড ঠাণ্ডা পানি। একারণে হয়ত এঝর্ণার নাম রাখা হয়েছে হিমছড়ি! এবার আমরা সমুদ্রপাড়ে যাবো। পাহাড়-ঝর্ণাকে বিদায় জানালাম। চলে আসার পথে সুন্দর সুন্দর দোকান-পাট দেখা গেলো। দোকানদাররা আমাদেরকে ডাকছে আর বলছে, দোকানে ভালো ভালো আচার আছে! ঐসব আচারের প্রতি আমার বিন্দুমাত্র আগ্রহও নেই। আমার নজর পড়লো দোকানে সাজিয়ে রাখা সামুদ্রিক শামুক-ঝিনুকের উপর। আল্লাহু আকবার! এত সুন্দর হয় আল্লাহর কুদরত! দেখেই যেন নয়ন জুড়িয়ে যায়! এতদিন ছবিতে দেখেছি, এখন তার বাস্তবটা দেখলাম। যদিও এগুলো শামুক এবং ঝিনুকের দেহ মাত্র, ভিতরে খোকলা। সবাই চলে যাচ্ছে, আমার আরেকটু দেখে যেতে মনে চাচ্ছে। কিন্তু আমি একা কী করি। তাই সবার সঙ্গে চলার পথে যতটুকু দেখার, দেখে নিলাম।
হিমছড়ি পাহাড়ের সন্নিকটে সমুদ্র সৈকতে আমরা অগ্রসর হলাম। সূর্য ডোবার বেশী সময় বাকি নেই। সমুদ্রপাড়ে গিয়ে দেখি উস্তাদে মুহতারাম মুফতী ইবরাহীম হাসান সাহেব দা.বা. খালি পায়ে সৈকতে নেমে গিয়েছেন। হুযূর মা’যূর হওয়ায় পাহাড়ে উঠেননি। নীচে হুযূরের সাথে ছিলেন, জনাব আনীসুর রহমান সাহেব, খলুনার হুযূর এবং আমাদের আরো কয়েক সাথী। দেখতে পেলাম, হুযূর অপলক দৃষ্টিতে সূর্যাস্তের দিকে তাকিয়ে আছেন। আমি একবার হুযূরের দিকে তাকাই, একবার তাকাই সূর্যাস্তের দৃশ্যের দিকে। আল্লাহওয়ালাদের তাকানোর মত যদি আমাদের তাকানোও হয়ে যায়! আবূ সাঈদ ভাইয়ের কাছে শুনেছি, ‘আমরা পাহাড়ে উঠার পর মুফতী ইবরাহীম হাসান সাহেব দা.বা. জুতা পায়ে সমুদ্রের তীরে হাঁটছিলেন। কেউ হুযূরকে বললেন, হুযূর! জুতা ভিজে যাবে! হুযূর তখন বলেছিলেন- এত কষ্ট করে এসেছি, এখানে এসেও যদি সাগরের পানিতে না নামি তাহলে কী হয়! এরপর হুযূর চামড়ার জুতা খুলে পানিতে নামলেন।’ আবূ সাঈদ ভাই আরোও শুনালেন- ‘হুযূর হাতের আঙ্গুল দিয়ে বালু খুড়লেন এবং বালুর ভিতর থেকে শামুক বের করে পানিতে ধুইলেন। হাতে নাড়াচাড়া করে দেখলেন। এরপর আবূ সাঈদ ভাইকে দিয়ে দিলেন। এরপর হুযূর আঙ্গুলের অগ্রভাগে সমুদ্রের একটু পানি নিয়ে জিহ্বায় দিলেন।’ সুবহানাল্লাহ! আল্লাহওয়ালাদের অনুভূতিই ভিন্ন রকম! এরপর আমরা যখন সাগর তরঙ্গ উপভোগ করতে করতে আরো সামনে অগ্রসর হলাম পিছনে ফিরে দেখি হুযূরও ঢেউ উপভোগ করছেন, হুযূরের জামাও ভিজে যাচ্ছে। আর আবূ বকর ভাই তো ঢেউয়ের উপর লাফিয়ে পড়ছেন। তার কাছে ঢেউ প্রতিরোধের স্বাদই যেন ভিন্ন! আরো অনেকেই গোসলে নেমে গেলেন। দুপুরের চে’ সাগরকে এখন বেশী উত্তাল মনে হলো। কুয়াশার কারণে সূর্য এখন আর দেখা যাচ্ছে না। সূর্য ডোবার বেশী সময় বাকি নেই। ধীরে ধীরে আমরা সমুদ্র থেকে উঠে এলাম। হিমছড়ি পাহাড়ের নীচে অবস্থিত মসজিদে মাগরিবের নামায আদায় করলাম। ইমাম সাহেব বয়ষ্ক মানুষ। কিন্তু নামাযে তার তিলাওয়াত সহীহ-শুদ্ধ। নামায আদায়ের পর হযরত মুদীর সাহেব দা.বা. সকলকে একপাশে বসতে বললেন। আমরা একপাশে বসলাম। হযরত মুফতী ইবরাহীম হাসান সাহেব দা.বা. সংক্ষিপ্ত বয়ান করলেন। হামদ ও সালাতের পর, হুযূর বললেন, গতকাল আমরা কোথায় ছিলাম আর আজকে কোথায়? আমাদের সফরের উদ্দেশ্য হলো, আল্লাহ তা‘আলার এরশাদ বাস্তবায়ন করা-। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
سِيرُوا فِي الْاَرْضِ فَانْظُرُوا كَيْفَ بَدَاَ الْخَلْقَ
অর্থ : তোমরা পৃথিবীতে একটু ভ্রমণ করে দেখ, আল্লাহ কীভাবে মাখলুককে প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন।
আমরা সমুদ্রের তীরে যে জায়গায় দাঁড়িয়েছি সেখানে যিকির করেছি। আবার কখনো যদি আসি ঐ জায়গায় হয়ত আর দাঁড়ানো হবে না। সুতরাং যেখানেই দাঁড়াবো, আল্লাহর যিকির করবো। তাহলে ঐ জায়গা আমাদের ব্যাপারে কিয়ামতের দিন সাক্ষী হয়ে যাবে। দরস-তাদরীসের ফাঁকে ফাঁকে আল্লাহর কুদরত দেখার জন্য সফর করা ভালো।
বয়ান শেষে মসজিদের ইমাম সাহেব হুযূরের সাথে মুলাকাত করলেন। আহ, আল্লাহর দুই ওলীর কী আন্তরিক মুলাকাত! এমন দৃশ্য দেখলেও যে চোখ জুড়ায়! এবার আমরা হিমছড়ি থেকে ফিরে যাবো সুগন্ধা সৈকতে। আমরা রওয়ানা করলাম। সুগন্ধা বিচে পৌঁছতে বেশী সময় লাগলোনা। হুযূর বললেন, এখানে অনেক দোকান-পাট আছে। তোমরা তোমাদের পছন্দমত জিনিস কিনতে পারো। সময় এশা পর্যন্ত। আরো বললেন, সুযোগ হলে রাত্রিকালীন সমুদ্র দেখার জন্যও যেতে পারো। তবে একা কোথাও যাবেনা। আর সবাই ইশার নামায সুগন্ধা বিচ মসজিদে পড়বে। নামাযের পর আমরা গাড়ীতে একসাথে খাবার হোটেলে যাবো। এবার সবাই নিজেদের পছন্দের জিনিস কেনার জন্য মার্কেটে যাচ্ছে। আমি, সাইফুল ইসলাম ভাই ও মুবারক ভাই একসাথে দোকানে গেলাম। এখানে দৃষ্টিনন্দন নানা রকম জিনিস রয়েছে। বেশীর ভাগই সামুদ্রিক জিনিস। রংবেরঙ্গের কড়ি-ঝিনুক-শামুক। কোনোটা বড়, কোনোটা ছোট। থালার মত বড় বড় ঝিনুক দেখলাম। কাঁচের বোতলেও ঝিনুক-শামুক সাজানো আছে। মুবারক ভাই সেই যে আচারের দোকানে দাঁড়িয়েছেন ওখান থেকে অন্যত্র যাওয়ার নাম গন্ধ নেই। আচার কিনছেন তো কিনছেনই। সাইফুল ইসলাম ভাইও কিছু কিনলেন। আমার এখানে দাঁড়িয়ে থেকে কাজ নেই। দু’জনকে বললাম ভাই! আমি আশপাশের দোকানে আছি। সামনের দিকে অগ্রসর হচ্ছি আর ফ্রি ফ্রি রকমারি পণ্যের সৌন্দর্য উপভোগ করছি। আমাদের মত আরো কত পর্যটক দোকনের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। জিনিস পত্র দেখছে। এখান থেকে নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী ঝিনুক—শামুকের গায়ে খুদাই করে নাম লিখিয়ে নেওয়া যায়। সুন্দর প্রক্রিয়ায় বিক্রেতারাই এ কারুকাজ করে দিচ্ছে। আমাদের অনেকে নাম লিখিয়ে নিচ্ছে। একটি দোকানে একটি শামুকের দিকে আমার দৃষ্টি নিবদ্ধ হলো। অপলক দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ শুধু তাকিয়েই রইলাম। এত সুন্দর আর এত বড় হয় শামুক! আরো দেখলাম কড়ি-ঝিনুকের ঝাড়। কোন পর্যটক এখানে আসবে, তার পকেটে টাকা থাকবে আর সে এগুলো না কিনেই চলে যাবে, তা হবে না। তাকে কিছু না কিছু নিতেই হবে। হয় নিজের জন্য, না হয় অন্যের জন্য।
ইশার আযান হয়ে গিয়েছে। সুগন্ধা বিচের নিকটস্থ মসজিদে আমরা ইশার নামায আদায় করলাম। ইমাম সাহেবের তিলাওয়াত শুদ্ধ এবং সুমধুর! কন্ঠ শুনে বুঝা যায় যুবকের তিলাওয়াত। নামায শেষে আমরা গাড়ীতে উঠলাম। এখন আমরা খাবার হোটেলে যাবো। দুপুরের মত এখনও ‘তাজ-বে’তেই আমরা উঠলাম। দুপুরের মত করেই আমাদের জন্য চেয়ার টেবিল সাজানো হয়েছে। খাবার পরিবেশন করা হলো। কয়েক আইটেমের ভর্তা-সবজি, লইট্টা শুঁটকি ভুনা, ডাল ও চিকন চালের সাদা ভাত।

লাবনী বিচের উদ্দেশ্যে
খাবার শেষে হযরত মুদীর সাহেব হুযূর বললেন, তোমাদের কারো কোনো প্রয়োজন বাকি আছে কি না? কেনা-কাটা বা সমুদ্রপাড়ে যেতে চাইলে ১০টা পর্যন্ত সময় পাবে। আমরা হুযূরকে বলে রাত্রীকালীন সমুদ্র দেখার জন্য কয়েক জন মিলে লাবনী বিচে রওয়ানা হলাম। অটোতে ৫/৭ মিনিটে আমরা লাবনী বিচে পৌঁছে গেলাম। আমরা পাঁচজন সমুদ্রের তীরে নেমে পড়লাম। এখন সমুদ্রের গর্জন অন্যরকম। সমুদ্র যেন আমাদেরকে আকর্ষণ করছে। উপভোগ করার মত দৃশ্য! জুতা খুলে নামলাম হাঁটু পানিতে। সমুদ্র এখন দিনের বেলার চেয়ে বেশী উত্তাল ঢেউগুলো অনেক বড় বড়। মাঝ সাগরে অন্ধকারের মধ্যেও শুভ্র-সাদা ঢেউগুলো দেখা যায়। আহসান হাবীব ভাই তো বলেই ফেললেন, ‘সমুদ্র খেলা করছে’! আমি একটু তন্ময় হওয়ার চেষ্টা করছি। সাগরের পাশে দাঁড়িয়ে তন্ময় হওয়ার মাঝেও রয়েছে ভিন্ন স্বাদ, ভিন্ন অনুভূতি! হাতে সময় তো কম, নয়তো আরো থাকতে মনে চাচ্ছে সমুদ্রের তীরে। এ রাতের বেলাও অনেক মানুষ সমুদ্রে নেমেছে। আমরা চলে এলাম উপরে। আসার পথে একটু প্রবেশ করলাম শুঁটকি মার্কেটে। সুবহানাল্লাহ! কত বড় বড় শুঁটকি মাছ প্যাকেটে করে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে পর্যটক ক্রেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য। প্রথমে নযরে পড়ল বোয়াল মাছ, মাশাআল্লাহ! এর পর সুরমা মাছ, আরো কত কী মাছ! একদম ছোট চিংড়ি, কাচকি থেকে নিয়ে ইয়া বড় বড় শুঁটকিমাছ- সবই নজরে পড়ল।
মার্কেট থেকে বের হয়ে অটো যোগে হোটেলের দিকে রওয়ানা হলাম। হোটেলে পৌঁছে আমরা যে যার রুমে চলে গেলাম। রুমে এসে সাথীদের সাথে সফর বিষয়ে মতবিনিময় হল কিছুক্ষণ। খুব ভালো লাগছিল তখন। দিনটা আজ বেশ ভাল কেটেছে। উপভোগ করেছি অনেক কিছু, আলহামদু লিল্লাহ। আমরা শুয়েছি মাত্র। তবে ঘুমাইনি কেউ। এরই মাঝে মুদীর সাহেব হুযূর হাজির হলেন। আমরা বিছানা থেকে গা তুলে বসলাম। সালাম দিয়ে হুযূর আমাদের রুমে প্রবেশ করলেন। আমাদের হাল পুরছি করলেন। জিজ্ঞাসা করলেন, আচ্ছা, কে কে উযূ করে শুয়েছো? কী যে মুশকিলে পড়লাম। মানে আমি ফেল করলাম। হুযূর বললেন, শেষ রাতে তাহাজ্জুদ পড়ার চেষ্টা করো। আর সম্ভব হলে মসজিদে আমরা যেখানে ইশার নামায পড়ে এসেছি সেখানে গিয়ে ফজরের নামায পড়ো। ঐ মসজিদের ইমাম সাহেবের তিলাওয়াত সহীহ শুদ্ধ। আর যদি সম্ভব না হয় তাহলে এখানেই পড়ে নিও। আমরা ফজরের পর পরই পাটুয়ারটেক বিচে যাবো ইনশাআল্লাহ। সেখান থেকে এসে নাস্তা করে আবার ফিরতি পথে রওয়ানা করতে হবে। ফিরতি পথে চট্টগ্রামের মাদরাসাগুলো এবং সেখানকার উলামায়ে কেরামের যিয়ারত করবো ইনশাআল্লাহ। আদর্শ পিতার মত করে সফরেও হুযূর আমাদের তরবিয়ত করছেন। পুরো সফরে আমরা হুযূরের নেক ছায়ায় ছিলাম। আলহামদু লিল্লাহ। যখনই কোনো গাফলতীর ভাব চলে আসতো, হুযূর আমাদের সতর্ক করতেন। আমলের কথা স্মরণ করিয়ে দিতেন। আমাদের এই ইলমী সফরে মা’হাদের যে ছয়জন উস্তাদের ছায়াতলে ছিলাম সকলের প্রতি আমরা সন্তুষ্ট ও কৃতজ্ঞ।
সাথীদের সাথে আরো কিছু বিষয়ে কথা হলো। তখন আমাদের একটি অনুভূতি ছিলো, যদি আরেকটু সময় নিয়ে আমাদের সফরের প্রোগ্রামগুলো হতো তাহলে আরো ভালো লাগতো। যাক, আমরা ঘুমিয়ে পড়লাম। ফজরের নামায আমরা রুমেই আদায় করলাম।

পাটুয়ারটেক বিচের উদ্দেশ্যে যাত্রা
সূর্য উঠার কিছুক্ষণ পর আমরা রওয়ানা হলাম পাটুয়ারটেক বিচের উদ্দেশ্যে। রাস্তা একদম ফাঁকা! গাড়ী চলছে আপন গতিতে। পৌনে এক ঘন্টার মত সময়ের মধ্যে আমরা পৌঁছে গেলাম পাটুয়ারটেক বিচে। বিচ একদম ফাঁকা। আমরা অগ্রসর হলাম তীরের দিকে। মুফতী ইবরাহীম হাসান সাহেব দা.বা. কিছু কথা বললেন। ঐ তো বড় বড় কালো পাথর দেখা যাচ্ছে! সমুদ্রে যখন ভাটা চলে তখন পাথরগুলো জেগে ওঠে। আমরা অনেকেই পাথরের উপরে উঠে দাঁড়ালাম। ঢেউ এলে পাথরের উপরে পানি উঠে যায়। সমুদ্রের পাড়ে এখনকার পরিবেশ খুবই নূরানী মনে হচ্ছে। শুভ্র পোশাকে নূরানিয়্যাত যেন আরো ফুটে ওঠছে! আমাদের অনেকে এই সাত-সকালেই সমুদ্রের পানিতে গোসলে নেমে গিয়েছেন। ঠাণ্ডার কারণে আমার সাহস হলো না। দু’জন মানুষকে দেখা গেলো বড়শি হাতে মাছ শিকার করছে। বিস্মিত হলাম। এই উত্তাল ঢেউয়ের মধ্যে মাছ পাবে কোত্থেকে! কিন্তু না, তার খালুইতে দেখা গেলো সামুুদ্রিক কিছু মাছ। তাতে রূপচাঁদাও ছিলো। আসলে তারা রিযিকের সন্ধানে বের হয়েছে আর আল্লাহ তা’আলা তাদের বড়শিতে মাছ বাঁধিয়ে দিয়েছেন। এরই নাম রিযিক। এ বিচে আমার পছন্দের কিছু জিনিস পেলাম। এ সৈকতে সুন্দর সুন্দর অনেক ঝিনুক ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে! ঢেউয়ে ঢেউয়ে সাগরগর্ভ থেকে ঝিনুকের খলসগুলো তীরে চলে আসে। আর মানুষ তা কুড়িয়ে নেয়। কত না কারুকার্যের জিনিস তৈরী হয় এগুলো দ্বারা। কত অলঙ্কার বানানো হয় এর মাধ্যমে। ভাবছি, এখান থেকে কিছু কুড়িয়ে নিবো। এরই মাঝে দেখি আব্দুল মাজীদ ভাই আমার ইচ্ছাটা কাজে পরিণত করে ফেলছেন। আমিও কুড়াচ্ছি। মনে পড়লো পবিত্র কুরআনের একটি আয়াত- وَتَسْتَخْرِجُوا مِنْهُ حِلْيَةً تَلْبَسُونَهَا (আর যাতে তোমরা সমুদ্র থেকে অলঙ্কারাদি আহরণ করতে পারো যা তোমরা [নারীরা] ভূষণরূপে পরিধান কর। —সূরা নাহল; আয়াত ১৪) আরো অনেকে ঝিনুক কুড়াচ্ছেন। কৌতুহল নিয়ে একটু বালু তুললাম, দেখি বালুর নীচেও সুন্দর সুন্দর ঝিনুক। কয়েকটি নিলাম। দেখ গেলো, ঢেউয়ের সাথে কিছু কিছু ঝিনুক পাড়ে চলে আসছে। সারা দিন তাহলে এভাবে কত ঝিনুক উঠে আসে! স্থানীয় একজনকে দেখতে পেলাম, সেও বেশ অনেকগুলো কুড়িয়েছে। ওদিকে অনেকে গোসলে নেমেছে। মুবারক ভাইও নেমেছেন। তবে কিনা জামাটা কালো পাথরের উপর রেখেই নেমে পড়েছেন। কখন যে ঢেউ এসে তার জামা সমুদ্রগর্ভে নিয়ে গিয়েছে, তা কেউ বলতে পারলাম না। আহ, বেচারা! যাক, এবার আমরা ফিরে যাবো হেটেলে। বিদায় সমুদ্র! তোমায় বিদায়! যুগ যুগ ধরে তোমার তীরে মানুষ আসতে থাকবে। প্রকৃতির লীলা দেখতে, ক্লান্তি- আবসাদ দূর করতে। তোমার স্রষ্টার কথা স্মরণ করতে। আমরাও এসেছিলাম, এখন আমাদের বিদায়ের পালা। মনে চায় না এখনই চলে যেতে, মন যে চায় আরো থেকে যেতে। এরই নাম জীবন। এজীবনের আনন্দ বড় সীমিত, বড় ক্ষুদ্র। পরকালের আনন্দই হবে চীর সুখ-শান্তির! যেখানে আনন্দের কোন সীমা-পরিসীমা থাকবে না। বেদনার লেশমাত্রও থাকবে না।
আমরা গাড়ীতে উঠে বসলম। গাড়ী আমাদেরকে নিয়ে চলছে সাগরের তীর ঘেঁষে। পথে-ঘাটে কত বৈচিত্রের দেখা মিললো। পথে ইনানি বিচ দেখলাম। এখানে সেনাবাহিনীর ক্যাম্পও রয়েছে। থামা হলোনা, করণ আমাদের হাতে সময় খুব কম। কিছুক্ষণ পর ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা করতে হবে। কিছু দূর পর পর পথের দু’পাশে সারি সারি সুপারি গাছ দেখা গেলো। স্থানীয় অনেকে ঝাকা ভারে সুপারি নিয়ে বসে আছেন। আমাদের গাড়ীর সামনের সিটে মাওলানা মাসূম বিল্লাহ সাহেব বসে আছেন। তিনি পান খেতে জানেন। এত সুন্দর সুপারি তার নজর ফাঁকি দিয়ে যাবে? সম্ভব নয়! গাড়ী থামানো হলো। তিনি নেমে দর-দাম করলেন। কাজ হলো না তেমন। অবশেষে বিক্রেতা যা দাম চেয়েছেন, তা দিয়েই খরিদ করলেন। আমি তার হাব ভাব দেখেই বুঝে নিয়েছিলাম দাম যাই হোক তিনি কিনবেনই। তিনি বড় সৌখিন মানুষ! কথায় আছে ‘সখের মূল্য আশি টাকা’! সখের জিনিসে দামাদামী চলে না। না ক্রেতার কাছে, না বিক্রেতার কাছে। এক ছড়া পাকা সুপারী হাতে গাড়ীতে উঠলেন। দেখতে বেশ চমৎকার লাগছে। বড় জাতের সুপারি। পেকে হলুদ হয়ে গেছে। নাহ, তিনি ঠকেননি। সখের তো একটা মূল্য অবশ্যই আছে। শুনলাম, তিনি এগুলো কিশোরগঞ্জ তারাপাশা মাদরাসার শাইখুল হাদীস ও পীরে কামেল হযরত মাওলানা আব্দুল হালীম হুসাইনী সাহেব দা.বা. কে হাদিয়া প্রদান করবেন। মাশাআল্লাহ, ভালো ইচ্ছা। আমারও কিন্তু কিনতে মনে চেয়েছিল। শুধু পকেটে কিছু পয়সা থকলেই হতো। নিজে না খাই দাদা-দাদীকে দিলে খুশিই হতেন। কিছুক্ষণের মধ্যে আমরা খাবার হোটেলে পৌঁছে যাবো। হযরত মুদীর সাহেব দা.বা. ফোনে হোটেল কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করলেন আর আমাদের ৩০ জনের নাস্তার অর্ডার দিলেন। যাতে আমাদের পৌঁছতে পৌঁছতে নাস্তাও প্রস্তুত হয়ে যায়। কয়েক মিনিটের মধ্যে আমারা হোটেলে পৌঁছে গেলাম। গরম-গরম রুটি-পরোটা, মুগডাল, সবজির নাস্তা হলো। শেষে দুধচা পরিবেশন করা হলো।
নাস্তা করে আমরা ক্রাউন পার্ক হোটেলে ফিরে এলাম। অল্প সময়ের মধ্যেই ফিরতি প্রস্তুতি নিয়ে হোটেল ছেড়ে দিতে হবে। প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম আর ভাবছিলাম, আনন্দের সময়গুলো দ্রুতই ফুরিয়ে আসে কেন!? একরাত এই রুমে ছিলাম। আবার কখনো কি এ রুমে আসা হবে! মানুষের জীবন কত সংক্ষিপ্ত। এর মাঝে সফর আরো সংক্ষিপ্ত। সবাইকে নীচে নেমে আসতে হলো। রিসিপশনে চাবি জমা দেওয়া হলো। হোটেল ভাড়া পরিশোধ করা হলো। এখন আমাদের সফরের দ্বিতীয় পর্ব শুরু হবে। প্রথমে আমরা যাবো চট্টগ্রামের পটিয়া মাদরাসার যিয়ারতে।

জামি‘আ ইসলামিয়া পটিয়া অভিমুখে
গাড়ী চলা আরম্ভ করলো। মাঝপথে এক জায়গায় গ্যাস নেওয়া হলো। যোহরের সময় আমরা পটিয়া মাদরাসায় পৌঁছলাম। পটিয়া মাদরাসার নাম আগে বহু শুনেছি। আজ প্রথম এই মাটিতে পা রাখলাম। সময় স্বল্পতার কারণে মাদরাসার পুরো পরিবেশ দেখার সুযোগ হলো না। কুতুবখানার সামনে গিয়ে একটু দাঁড়ালাম। কত বিখ্যাত এ কুতুবখানা। অনেক পুরোনো নুসখাও থাকবে এখানে। জামিয়ার এক তালিবুল ইলমের কাছে জানতে পারলাম, প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে এ কুতুবখানা খোলা হয়। জামিয়ার তালিবুল ইলমগণ এখানে এসে কিতাব মুতালা‘আ করেন। যদি সময়মত আসতে পারতাম এক নযর দেখে যেতে পারতাম কুতুবখানার নূরানী পরিবেশ। জামিয়ার পুকুর দেখতে পেলাম। বরকতের ইচ্ছা নিয়ে পুকুরের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে উযূ করলাম। জামিয়ার মসজিদে যোহরের নামায আদায় করলাম। এরপর জামিয়ার বরকতময় মাকবারায় উপস্থিত হলাম। এখানে আল্লাহর কত নেক বান্দা শায়িত আছেন। জামিয়ার প্রতিষ্ঠাতা আল্লামা আজীজুল হক রহ. এর মাকবারা এখানেই। নিকট অতীতের শাইখুল হাদীস আল্লামা আব্দুল হালীম বুখারী রহ. এর মাকাবারা দেখতে পেলাম। আমরা যিয়ারত করলাম।
আমরা গাড়ীতে উঠলাম। হযরত মুদীর সাহেব দা.বা. ঘটনা বর্ণনা করলেন। এই পটিয়া মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা মুহতামিম আল্লামা মুফতী আজীজুল হক রহ. একবার মাদরাসার বাহিরে কোথাও দীনী সফরে গিয়েছিলেন। তখন এলাকার বেদাআতীরা এই পটিয়া মাদরাসা আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়। এসংবাদ যখন মুফতীা আজীজুল হক রহ.-কাছে পৌঁছলো তখন তিনি বললেন, ওদের আগুন যত উপরে উঠেছে আমার মাদরাসা তত উপরে উঠবে। আল্লাহু আকবার! কেমন দিলের মহান পুরুষ ছিলেন তিনি! আমরা আজ স্বচক্ষে এই জামিয়া পটিয়া পরিদর্শন করলাম। মনে হচ্ছে, এটা হযরত মুফতী সাহেব রহ.-এর দু‘আর ফসল! আজ এ জামিয়ার সুনাম-সুখ্যাতি দেশব্যাপী স্বীকৃত। ওরা চেয়েছিল এ জামিয়া নির্মূল করে দিতে, আর আল্লাহ চেয়েছিলেন জামিয়াকে সমুন্নত, সুপ্রতিষ্ঠিত করতে। আর আল্লাহ যা চান তাই হয়।

এবারের গন্তব্য দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম-হাটহাজারী
এখন আমরা রওয়ানা করবো চট্টগ্রাম হাটহাজারী মাদরাসার উদ্দেশ্যে। পুরো সফরে বিশেষভাবে হযরত মুদীর সাহেব ও হযরত খুলনার হুযূর দা.বা. আমাদের আরাম ও সুবিধার প্রতি সজাগ দৃষ্টি রেখেছেন। তাদের কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি।
হযরত মুদীর সাহেব দা.বা. ফোনে স্থানীয় পরিচিতজনদের সাথে যোগাযোগ করে জানতে পারলেন এখানে ভালো খাবার হোটেল নেই। আমাদের পেটে ক্ষুধা ছিল। পরামর্শক্রমে আমাদের সংগ্রহে থাকা বিস্কুট পানি খেয়ে ক্ষুধা নিবারণ করে নিলাম।
আমাদের তিনটি গাড়ীর পরস্পর যোগাযোগ রক্ষার জন্য হযরত মুদীর সাহেব হুযূর, হযরত খুলনার হুযূর এবং হযরত রাজশাহীর হুযূর দা.বা., এ তিন জনের ফোনে সফরের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত হোয়াটস্ অ্যাপে ‘মা’হাদ ইলমী সফর ২০২৪’ নামে একটি গ্রুপ খোলা ছিল এবং প্রত্যেকের লাইভ লোকেশন অপর দু’জনকে শেয়ার করা ছিলো। এতে খুব সহজেই একে অপরের অবস্থান সম্পর্কে জানতে পারতেন। হযরত মুদীর সাহেব হুযূর গ্রুপে পরামর্শ করলেন। যেহেতু মুফতী ইবরাহীম হাসান সাহেব দা.বা. আর রাজশাহীর হুযূর দা.বা. এক গাড়ীতে ছিলেন তাই রাজশাহীর হুযূরকে বললেন, আমাদের মরুব্বী মুফতী ইবরাহীম হাসান সাহেব দা.বা.— তিনি দুপুরের খাবারের ব্যাপারে যে ফায়সালা দিবেন, সেভাবেই হবে। রাজশাহীর হুযূর গ্রুপে হযরত মুদীর সাহেব হুযূরকে জানালেন, হুযূর বলছেন ‘আগে আমরা হাটহাজারী মাদরাসায় যাবো, ওখানে পৌঁছে দুপুরের খানা হবে, ইনশাআল্লাহ।’ হুযূরের ফায়সালা সকলের পছন্দ হলো।
হযরত মুদীর সাহেবের গাড়ীতে যেহেতু আমরা ছিলাম তাই বারবার হুযূরের কথা এসে যাচ্ছে। এবার আমাদের দুপুরের খাবারের জন্য মুদীর সাহেবের ফিকির বেড়ে গেলো। ইমরান ভাই মুদীর সাহেব হুযূরকে জানালেন, গত বছর আমাদের রাহমানিয়ায় দাওরায়ে হাদীস শেষ করে এ বছর হাটহাজারী মাদরাসায় ইফতা প্রথম বর্ষে পড়ছেন, আব্দুল্লাহ তায়্যিব ভাই। সে চরওয়াশপুর মাদরাসায়ও আপনার কাছে কিতাব পড়েছে। হুযূর তাকে চিনতে পারলেন। প্রথমে ইমরান ভাই তার সাথে যোগাযোগ করলেন, তারপর মুদীর সাহেব হুযূর নিজেও ভাই আব্দুল্লাহ তায়্যিবের সাথে ফোনে কথা বললেন। হুযূর বললেন, সফরে আমরা ৩০ জন আছি। দুপুরের খানা এখনো খাওয়া হয়নি। আমরা হাটহাজারীতে এসে খাবার গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। হুযূর তাকে মাদরাসার কাছাকাছি কোনো হোটেলে যোগাযোগ করতে বললেন এবং খাবার আইটেম বলে দিলেন।
আমাদের গাড়ী চলছে হাটহাজারীর উদ্দেশ্যে। মাদরাসায় পৌঁছার কিছুক্ষণ আগে জানতে পারলাম ডান দিকে মেখল মাদরাসা। কিন্তু সময় স্বল্পতার কারণে আজ সেখানে যাওয়া হয়ত সম্ভব হবে না। আহ! ইলমী ইদারাগুলোর কত কাছে এসে গিয়েছি, কিন্তু সম্ভব হচ্ছে না একটু যিয়ারত করার। আরো জানতে পারলাম, মুফতিয়ে আযম ফয়যুল্লাহ রহ.-এর মাকবারাও এখান থেকে অনেক দূরে নয়। কিন্তু আমরাই দূরে রয়ে গেলাম তাঁর মাকবারা যিয়ারতের ফুয়ূয থেকে! জীবনের নির্মম সত্য এখানেই। কিছু আশা পূর্ণ হয়, অনেক আশা অপূর্ণ থেকে যায়!
আরো কিছুদূর অগ্রসর হওয়ার পর মুদীর সাহেব বললেন, ঐ যে হাটহাজারী মাদরাসা-মসজিদের মিনার দেখা যায়! আমরাও দেখতে পেলাম। আমাদের স্বপ্ন পূরণ হতে চলেছে। আমাদের গাড়ী মাদরাসার মেইন ফটক দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করলো। আল্লাহু আকবার! মাদরাসার বিশাল প্রাঙ্গণ। এখন আমরা আমাদের দেশের উম্মুল মাদারিসে আছি। ছোট্টবেলা থেকে কত স্বপ্ন ছিলো, এই জামি‘আয় আসবো। আজ সে স্বপ্ন পূরণ হলো। তোমার শোকর হে আল্লাহ!
গাড়ী থেকে নামতেই কিছু পরিচিত নূরানী চেহারার দেখা পেলাম। আমরা জামি‘আ রাহমানিয়া আরাবিয়ায় একই সাথে দাওরায়ে হাদীস পড়েছি, এমন চারজন সাথীর সাথে সাক্ষাত হলো। তারা এখানে দারুল ইফতায় সালে ছানীতে পড়ছেন। এই তো দেড় বছর হলো, আমরা একই সাথে হাদীসের দরসে বসেছি। সে চিত্রগুলোও মনের আয়নায় নতুন করে ভেসে উঠলো। হাদ্দাছানার গুঞ্জনধ্বনি এখনো হৃদয়ে তাজা। যে চার সাথীর সাথে সাক্ষাত হলো, হাদীসের দরসে তাদের যে ইবারত শুনতাম তাও যেন কানে বাজছে! একই সাথে ছিলাম। আজ কতজন দেশের কত প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছেন। কেউ ইলম অন্বেষণে, কেউ ইলম বিতরণে। আমরা কি হাদীসের দরসে আবার কখনো একত্রিত হবো! সোনালী দিনগুলো কি আমাদের জীবন থেকে অতীত হয়ে গেলো! আর কি ফিরে আসবে না!!
আব্দুল্লাহ তায়্যিব ভাইয়ের সাথেও সাক্ষাত হলো। তিনি খুব আন্তরিকতার সাথে আমাদেরকে গ্রহণ করলেন। হাস্যোজ্জ্বল চেহারায় যে মেহমানের সাথে সাক্ষাত করতে হয়, তা ভাইয়ের মধ্যে দেখতে পেলাম। আসলে মেহমান তার মেজবানের কাছে কী চান?! এতটুকুই তো চান!
আমরা উযূ করে জামি‘আর মসজিদে আসরের নামায আদায় করলাম। নামাযের পরে হযরত মুফতী কিফায়াতুল্লাহ সাহেব দা.বা.-এর সাথে আমরা মুলাকাত করলাম। হুযূরের সাথে মুলাকাতের জন্য আগ থেকে যোগাযোগ করা হয়েছিল। তিনি এবং আমাদের মুফতী ইবরাহীম হাসান সাহেব দা.বা. একসাথে পাকিস্তানের করাচী বানূরী টাউনে দারুর ইফতায় পড়াশোনা করেছেন। তিনি আমাদের সাথে খোশ বিনিময় করলেন। এরপর আমাদের অনুরোধে তিনি কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা করলেন। তার আলোচনার সারসংক্ষেপ এমন-
দীনের প্রেরণা হলো, দীনকে বুঝা এবং তা বাস্তবায়নের চেষ্টা করা। যতটুকু আছে তা ধরে রাখা আর যা নাই তা আনার চেষ্টা করা। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে বিষয়ে যেভাবে চিন্তা করেছেন সেভাবে চিন্তা করা। যার উপলব্ধি হবে সে সচেতন হবে। কোলের বাচ্চার তো উপলব্ধি নেই, তাই তার সচেতনতাও নেই। ঈমানের গুণসমূহ অর্জন করতে হবে। আর আমলের মূল্য নেই ঈমান ছাড়া। যেমন নফল আমলের কোনো মূল্য নেই ফরয আমল ছাড়া। ঈমানের চর্চা করতে হবে। আমাদের সিলেবাসে ঈমান বিষয়ক আরোও কিতাব থাকা দরকার। আগে ঈমানী আলোচনা বেশী ছিলো واذكر الله كثيرًا لعلكم تفلحون। আমার ফুফুকে দেখেছি, উঠতে, বসতে سبحان الله،الحمد لله،الله خير حافظًا وّهو ارحم الراحمين. বলতে থাকতেন। সেই পরিবেশ এখন কমে গিয়েছে।
আলোচনা শেষে আমাদের জন্য হালকা নাস্তা পরিবেশন করা হলো। মাগরিবের ওয়াক্ত হওয়ার বেশী সময় বাকি নেই। এদিকে আমরা এখনো দুপুরের খাবার খাইনি। আব্দুল্লাহ তায়্যিব ভাই আমাদেরকে মাদরাসার পার্শ্বস্থ হোটেলে নিয়ে গেলেন। তিনি আগেই এ হোটেলে ৩০ জনের খাবারের অর্ডার দিয়ে ছিলেন। মুরগী, ঢেড়শ ভাজি, ডাল ও সাদা ভাত পরিবেশন করা হলো। খাবার আইটেম যেমনই হোক, স্বাদে ছিলো বেশ। সবাই খানা খেয়ে মাগরিবের নামায আদায় করলাম জামিয়ার মসজিদে। নামাযের পর আমাদেরকে একটু সময় দেওয়া হলো। আমরা মাদরাসার আঙ্গিনা ঘুরে ঘুরে দেখছি। মেশকাত-দাওরার দরসগাহ দেখলাম। দাওরায়ে হাদীসের দরস তখনো শুরু হয়নি। দারুল ইফতায় প্রবেশ করে মুতালা‘আর পরিবেশ দেখে ভালো লাগলো। বহু কিতাবের সমাহার এখানে। দুর্লভ অনেক কিতাবও থাকবে!
মাতবাখের সামনে গেলাম এক ফাঁকে। এ মাতবাখের কথা কতনা শুনেছি ছোট বেলা থেকে। এখানকার ডাল-ভাতের কথা শুনেছি কত! এখন আমি সেই মাতবাখেরই সামনে দাঁড়িয়ে আছি। এ জামিয়ার কত তালিবে ইলম এ মাতবাখের ভাত-ডাল খেয়ে বড় আলেম হয়ে এখন দেশ-বিদেশে ইলমে নববী বিতরণ করছেন।
এরপর জামি‘আর মাকবারায় উপস্থিত হলাম। নিকট অতীতের কিছু পরিচিত আলেমে দীনের কবর দেখতে পেলাম। এখানে এসে কবরবাসীকে বড় আপন মনে হলো। আল্লামা শাহ আহমাদ শফী রহ., আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী রহ., মুফতী আব্দুস সালাম চাটগামী রহ., আল্লামা ইয়াহয়া রহ. প্রমুখ বুযুর্গানে দীন এ মাকবারায় সমাহিত। মাটির উপরে তাদের মাকবারার পরিবেশ যেন শান্ত-প্রশান্ত দেখালো, আল্লাহ যেন মাটির নীচেও তাঁদেরকে জান্নাতুল ফিরদাউসের পরম সুখের নিদ্রায় রাখেন-আমীন! আমরা সূরা-কালাম ও দু‘আ-দরূদ পড়ে বিশেষভাবে তাঁদের উদ্দেশ্যে সওয়াব রেসানী করলাম। আসতে মনে চায় না, তবু চলে আসতে হলো। হাটহাজারী মাদরাসায় অধ্যয়নরত আমাদের এই চার-পাঁচ জন সাথী আমাদেরকে আন্তরিকতার সাথে সময় দিয়েছেন। অনেক কষ্টও করেছেন আমাদের জন্য। সাথীদের কাছ থেকে বিদায় নিলাম। আমরা গাড়ীতে চড়লাম।

জামেয়া রশীদিয়া ফেনী অভিমুখে
আমাদের গাড়ী এখন যাত্রা করবে ফেনীর জামেয়া রশীদিয়ার উদ্দেশ্যে। এখন আমরা আরেকটি স্বপ্ন পূরণের পথে অগ্রসর হচ্ছি। রাতের আঁধারে গাড়ী তার নিজস্ব আলোতে চট্টগ্রামের পাহাড়ী পথে চলছে। বিদঘুটে অন্ধকারেও আকাশের শুভ্রতা কিছুটা অনুমান করা যায়। পাহাড়ের বুকে গাড়ী চলছে। দিনের বেলা হলে পাহাড়ের সৌন্দর্য উপভোগ করা যেতো। গাড়ীর ভিতর থেকেও চেষ্টা করছিলাম পাহাড়ের উচ্চতা অনুমান করতে! পাহাড়ী রাস্তায়ও আমাদের গাড়ী তিনটি দুর্বার গতিতে ছুটে চলছে। ড্রাইভারত্রয় বেশ দক্ষ, গাড়ী চালনা দেখেই বুঝা যায়। যেহেতু বিগত দু’মাস পূর্বে আকস্মিক বন্যায় ফেনীর কিছু রাস্তা-ঘাট ভেঙ্গে গিয়েছে, তাই জামেয়া রশীদিয়ায় সহজে পৌঁছার জন্য পরিচিত রাহবারের প্রয়োজন ছিলো। মা’হাদের ইফতা বিভাগের প্রক্তন তালিবুল ইলম মাওলানা সাইফুদ্দীন ভাইয়ের সাথে হযরত মুদীর সাহেব ও হযরত খুলনার হুযূর দা.বা. যোগাযোগ করলেন। তিনি কুমিল্লা চৌদ্দগ্রামের এক মাদরাসায় ইলমে দীনের খেদমতে নিয়োজিত আছেন। তিনি আমাদের রাহবারী করার জন্য প্রস্তুত হয়ে গেলেন। তাকে নির্দিষ্ট একটি স্থানে থাকতে বলা হলো। আমাদের গাড়ী ওখানে পৌঁছলে হযরত মুদীর সাহেব দা.বা. তাকে নিজের সিটের পাশে বসালেন। হুযূর বললেন, কিছুদিন আগে কুমিল্লা-ফেনীতে বন্যাদুর্গত ভাইবোনদের খেদমতে মা’হাদ পরিবার ত্রাণসামগ্রী বিতরণে এসেছিলো তখন সাইফুদ্দীনও বিতরণ কাজে সহযোগিতা করেছিল। তিনি আমাদেরকে রাহবারী করে ফেনী রশীদিয়ায় নিয়ে গেলেন। এই যে আমরা ইলমে দীনের বড় বড় মারকায ও সেখানকার উলামায়ে কেরামের যিয়ারত করতে পারছি, এটা আমাদের জন্য বড়ই খোশনসীব! নিজেদের জন্য বড় সৌভাগ্যের বিষয় মনে হলো। এমন নূরানী পরিবেশে কিছু সময় বিচরণ করতে কার মনে না চায়? আমাদের গাড়ী জামেয়ার সামনে চলে এসেছে। দায়িত্বশীলদের সাথে যোগাযোগ করে আমরা ভিতরে প্রবেশ করলাম। সুবহানাল্লাহ! এত বড় ইলমী কানন!! ছবিতে যেমন দেখেছি তার চে’ বড় মনে হলো। আমরা অগ্রসর হচ্ছি আর জামেয়ার রাত্রিকালীন মনোরম পরিবেশ অবলোকন করছি। তালিবে ইলমরা উঁচু আওয়াযে পড়াশোনা করছে। অনেকের মাথায় পাগড়ী। মাশাআল্লাহ! দূর থেকেই বুঝা যায়, পড়াশোনায় বেশ মনোযোগী তারা। তিন দিকে জামেয়ার বড় বড় ভবন। জামেয়ার প্রাঙ্গনে বিশালায়তনের পুকুর। পুকুরের চতুর্দিকে সিঁড়ি তৈরী করা হয়েছে। যদি জানতে পারতাম, কেন এত বড় পুকুরের ব্যবস্থাপনা! অবশ্যই সন্তেুাষজনক উত্তর পেতাম। কিন্তু সে সুযোগ আমার হয় নি। অবশ্য রশীদিয়ার ছাত্রভাইদের সাথে যখন রাহমানিয়ায় পড়েছি, তখন দু’একবার তাদের কারো কাছে শুনেছি, তালিবে ইলমদেরকে পরিমিত পানি ব্যবহারে অভ্যস্ত করার লক্ষে এ পুকুরের ব্যবস্থাপনা। তাছাড়া পুকুরের দ্বারা আশপাশের পরিবেশ আরো সৌন্দর্য মণ্ডিত হয়ে উঠেছে! মাঠে রকমারী ফলফলাদির গাছ দেখতে পেলাম। গাছগুলো থেকে পাখিদের কিচিরমিচির ডাক শুনতে পাচ্ছিলাম। এত রাতেও এখানকার পাখিরা ঘুমায়নি! পাখিগুলোর ডাক শুনে মুগ্ধ হচ্ছিলাম। আমাদের দুষ্টুমন এখনো পাখি ধরতে চায়। এখানে এসে শুনলাম ভিন্নরকম কথা। এখানকার কেউ পাখিদেরকে ব্যাঘাত করে না, কষ্ট দেয় না। এক তালিবে ইলমকে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনারা পাখি ধরেন কি না? বললো, যদি ধরতাম তাহলে কি পাখি এখানে থাকতো!
যাক, জামেয়ার উস্তাদদের সাথে আগেই যোগাযোগ হয়েছে এবং আমাদের আগমনের বিষয়টি অবগত করা হয়েছে। জামেয়ার স্বনামধন্য মুহতামিম মুফতী শহীদুল্লাহ সাহেব দা.বা.-এর কামরায় আমরা উপস্থিত হলাম। খোশ বিনিময়ের পর উস্তাদে মুহতারাম মুফতী ইবরাহীম হাসান সাহেব দা.বা. মুফতী সাহেবকে অনুরোধ করলেন, আমাদের উদ্দেশ্যে যেন কিছু নসীহত পেশ করেন। হযরত মুফতী শহীদুল্লাহ সাহেব দা.বা. কিছু নসীহত করলেন। যার সারসংক্ষেপ এই-
আমাদের বাংলাদেশে ইতিপূর্বে منظم تخصص فی الفقه ছিলো না। আমাদের দেশে সুন্দর নিযাম ছিলো যে, কোনো মুফতীকে তামরীন করে দেখাতেন। এটা ছিলো উত্তম। আমরা যখন মেখলে ছিলাম তখন অনেক ফাতাওয়া লিখে মুফতী ফয়জুল্লাহ সাহেব রহ. কে দেখাতাম এবং তিনি তাসহীহ করে দিতেন। আমি তাঁকে তিন বছর পেয়েছি। এপদ্ধতিতে বাতেনী ও যাহেরী ভাবে উন্নতিও ভালো হত। মুফতী রশীদ আহমাদ লুধয়ানবী রহ.বলতেন, বাতেনকে ঠিক করা বেশী জরুরী। বরকতের বেশী গুরুত্ব রয়েছে ইলমের চেয়ে। হযরত রহ. ফাতাওয়া বিভাগে কখনো ছাত্র নিতেন আবার কখনো নিতেন না। হযরত রহ. আমাকে বাইয়াত করেছেন। তিনি সাধারণত কাউকে বাইয়াত করতেন না। তাখাস্সুসাতের অভাব নেই, কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো ইসলাহ নেই। তাখাস্সুসের চে’ ইসলাহের ফিকির বেশী হওয়া দরকার। কওমী মাদরাসায় আবাসিক থাকা কঠিন। এই নেযামের মূল লক্ষ্য হলো সোহবতের মাধ্যমে ইসলাহ করা। আমরা শিখবো, তবে এর চে’ বেশী গুরুত্বপূর্ণ হলো ইসলাহ করা। ইসলাহের বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া, এরপর ইলম ও অন্যান্য বিষয়। যাহেরী ইলমের সাথে বাতেনী ইলম অর্জন করতে হবে। আমাদের অনেক আকাবিরের মধ্যে যাহেরী ইলম ছিলো না, কিন্তু তাদের মধ্যে বাতেনী ইলম ছিলো। আহলুল্লাহর সোহবতকে গনীমত মনে করতে হবে। আমরা এর থেকে দূরে সরে গিয়ে সবকিছু হারিয়েছি। আমাদের ইলম সোহবত ছাড়া সৌরবিদ্যুতের মত।
মুফতী সাহেবের বয়ানের পর জামেয়ার কয়েকজন উস্তাদকে মা’হাদের মুখপত্র ‘বাতায়ন’ হাদিয়া প্রদান করা হলো। মুফতী শহীদুল্লাহ সাহেব দা.বা. আমাদের জন্য আপ্যায়নের ব্যাবস্থা করেছেন। আমরা জামেয়ার দারুত তাসনীফে নাস্তার দস্তরখানে শরীক হলাম। শানদার নাস্তা পরিবেশন করা হয়েছে আমাদের জন্য। বিস্কুট, চানাচুর, চিপ্স, সেমাই, সিদ্ধ ডিম, দুধচা, আরো কী যেন! আমরা নাস্তা গ্রহণ করলাম। জানতে পারলাম, জামেয়ার ১০টি ভবন তৈরী হবে জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত ১০জন সাহাবা কেরামের নামে। ভালো লাগলো বিষয়টি জানতে পেরে। আল্লাহ যেন ভরপুর তাওফীক দান করেন এবং তাতে বরাকাতের ধারা জারী রাখেন, আমীন। এই দারুত তাসনীফে বিভিন্ন শাস্ত্রের আরবী-উর্দূ বহু কিতাব দেখতে পেলাম। একজনকে জিজ্ঞাসা করে জানতে পারলাম, এটি দারুত তাসনীফ এবং এখানের অধিকাংশ কিতাবই মুফতী সাহেব হুযূরের। নাস্তা শেষে আমরা আহসান হাবীব ভাইয়ের ইমামতিতে ইশার দু’রাকা‘আত কসর আদায় করলাম। এখানে এসে মুলাকাত হলো জামি‘আর নায়েবে মুহতামিম মুফতী ফয়জুল্লাহ সাহেব দা.বা.-এর সাথে। তিনি কিছুদিন আগে ঢাকা মুহাম্মাদপুরের বসিলায় এসেছিলেন। সেই সুবাদে আমাদের মা’হাদেও তাশরীফ এনেছিলেন এবং তলাবাদের উদ্দেশ্যে নসীহত পেশ করেছিলেন। বড় হৃদয়গ্রাহী ছিলো তার নসীহতগুলো! তাঁর আচরণ-উচ্চারণে নম্রতাই প্রকাশ পায়। আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে আল্লাহওয়ালাদের থেকে নসীহত গ্রহণের তাওফীক দান করেন, আমীন। এখানে এসেও কিছু পরিচিত চেহারা দেখতে পেলাম। আমাদের জামি‘আ রাহমানিয়া আরাবিয়ার সাথী মাওলানা আশরাফ আলী (বি.বাড়িয়া) ভাইয়ে সাথে সাক্ষাত হলো। তিনি এবছর এখনে উস্তাদ হিসেবে মনোনীত হয়েছেন। আমাদের সাথীরা কতজন কত জায়গায় খেদমতে দীনে নিয়োজিত হয়েছেন। আলহামদু লিল্লাহ। জামেয়া রশীদিয়াকে বিদায় জানিয়ে গাড়ীতে উঠলাম। আশরাফ আলী ভাই গাড়ী পর্যন্ত আমাদেরকে এগিয়ে দিলেন। বিদায় নামক জিনিসটা বড় কষ্টের হয়, বিশেষত তা যদি হয় নেক লোকদের সংস্রব থেকে!

বিদায় পথের যাত্রা
এবার আমারা ফিরবো ঢাকার পথে। গাড়ী সচল হলো। আমাদের হৃদয় যেন কেমন করে উঠলো। আমরা ইলমী সফরের সমাপ্তির পথে চলে এসেছি। এবার গন্তব্যে ফেরার পর্ব! কিছুদূর যেতেই হযরত মুদীর সাহেব হুযূর দা.বা. বলে উঠলেন, এই ইলমী সফরে তোমাদের কার কেমন লাগেছ, কী তোমাদের অভিব্যক্তি? কী শিক্ষা পেলে? বলো! এখনই এমন প্রশ্নের সম্মুখীন হবো, বুঝতে পারিনি আমরা। হায় হায়, অপ্রস্তুত অবস্থায় এখন কী বলবো? অভিব্যক্তি শ্রবণ আরম্ভ হলো গাড়ীর পিছনের সিট থেকে। যাক, বাঁচা গেলো! এই ফাঁকে একটু প্রস্তুত হতে পারবো। আমীর হামযা ভাই শুরু করলেন। বেশ তো, তিনি দেখি দিব্বি বলে যাচ্ছেন! এরপর শুরু হলো হাবীবুল্লাহ ভাইয়ের অভিব্যক্তি। তিনিও দেখছি ভালোই শিক্ষা নিয়েছেন ইলমী সফর থেকে। তাহলে আমি কী শিক্ষা পেলাম! আরেকজন পরেই তো আমার অভিব্যক্তি প্রকাশের পালা। চেষ্টা করছি কিছু পয়েন্ট ধরার! কিন্তু…! যাক, লৌকিকতা আর কৃত্রিমতার গণ্ডি থেকে বের হয়ে সফরের চিত্রগুলো মনে করে করে সফরের কিছু শিক্ষা ও প্রাপ্তির কথা বলার চেষ্টা করলাম। আমাদের সকলের তখনকার অভিব্যক্তির সারসংক্ষেপ এমন ছিলো: ‘আলহামদুলিল্লাহ, আমরা উস্তাদদের কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি, উস্তাদগণ নিজেদের তত্ত্বাবধানে আমাদের জন্য ইলমী সফরের ব্যবস্থা করেছেন। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সফরটি যেন সুন্নাত তরীকায় হয়, সে জন্য উস্তাদগণও বারবার আমলের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। গাড়ীতে প্রতিবার উঠা-নামার সময় এবং গন্তব্যে পৌঁছে দু‘আ পাঠের এহতেমাম করা হয়েছে। এতে আমাদের একটি আমলী মশকও হয়েছে। পাহাড় ও সমুদ্রপাড়ে গিয়ে পবিত্র কুরআনে বর্ণিত সে সংক্রান্ত আয়াতসমূহের তিলাওয়াত, সত্যি আমাদেরকে অভিভূত ও মুগ্ধ করেছে। সৃষ্টি দেখে তখন স্রষ্টার কথা স্মরণ হয়েছে। গুনাহের পরিবেশেও যে গুনাহ থেকে বেঁচে ইলমী সফর করা যায়, তা আমরা নিজেরাই দেখতে পেলাম। সর্বপরি ইলমী সফরের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আল্লাহওয়ালাদের সাথে থেকে গুনাহ মুক্তভাবে যে আমরা ইলমী সফর সম্পন্ন করতে পারছি, সে জন্য আমরা উস্তাদদের প্রতি চির কৃতজ্ঞ।’
ইতিমধ্যে আমরা বহুদূর চলে এসেছি। আমাদের রাহবার মাওলানা সাইফুদ্দীন ভাইয়ের মাদরাসার কাছাকাছি আমরা চলে এসেছি। তিনি হুযূরকে বললেন, আমরা সবাই যেন তাদের মাদরাসায়ও একটু আসি। কিন্তু আমাদের হাতে সময় ছিলো না। তাই হুযূর দাওয়াত গ্রহণ করতে পারলেন না। তিনি আমাদের গাড়ী থেকে নেমে যাচ্ছেন। মনে হলো আমাদেরই একটি ফুল ঝরে যাচ্ছে! গাড়ী থেকে নেমে আমাদের দিকে বিদায় বিধুর দৃষ্টিতে একবার তাকালেন। বিদায়ের মুহূর্তে এত কষ্ট হয় কেন?!
আমাদের গাড়ী চলছে তো চলছেই। গাড়ী তো চলারই জিনিস! আমাদের গন্তব্য পর্যন্ত চলতে থাকবে ইনশাআল্লাহ। আমাদের সবার অভিব্যক্তি শেষ হওয়ার পর হুযূর কিছু কথা বললেন। আমাদের গাড়ী এখন চট্টগ্রামের মহাসড়কে। ঢাকাগামী মালবাহী বহু গাড়ী ইতিমধ্যে মহাসড়ক দখল করে ফেলেছে। এখানকার মহাসড়ককে ঢাকা শহরের মতই মহা ব্যস্ত মনে হলো। ঘুমে নির্ঘুমে আমরা ঢাকার অভিমুখে চলছি। মাঝপথে কয়েকবার গাড়ীতে গ্যাস নেওয়া হলো। আমরা তখন নিজেদের প্রয়োজনও সেরে নেই। যা হোক, সফরের গ্লানি সবাইকে যেন পেয়ে বসেছে। একেক জনের ঘুমের অবস্থা দেখলে তাই মনে হয়। গাড়ীর সিটে বসে আর কতক্ষণ বেরামের ঘুম ঘুমানো যায়। এখন আর রাত জাগার উদ্যমতা নেই আমার। কখন যেন ঢাকা শহরে পৌঁছে গিয়েছি ঠিক বুঝতে পারিনি। আমাদের গাড়ী মুহাম্মাদপুরে পৌঁছার পর হযরত মুদীর সাহেব দা.বা. স্বশব্দে সফর থেকে প্রত্যাবর্তনের দু‘আ পড়লেন। আমরা যারা জাগ্রত ছিলাম দু‘আ পড়ে নিলাম—

اٰيِبُوْنَ تَائِبُوْنَ عَابِدُوْنَ لِرَبِّنَا حٰمِدُوْنَ

পোস্টটি লাইক ও শেয়ার করুন।

একটি মন্তব্য লিখুনঃ

Your email address will not be published. Required fields are marked *