আহলে হাদীস উলামায়ে কেরামের নিকটও তারাবীহ ও তাহাজ্জুদ এক নামায নয়

মুফতী হাফিজুর রহমান

আমাদের সালাফী ভাইয়েরা তারাবীহ এবং তাহাজ্জুদ নামাযকে এক বলছেন এবং তা লোকসমাজে প্রচার করে চলছেন। অথচ তাদের দায়িত্বশীল আলেমগণ মনে করেন, তারাবীহ এবং তাহাজ্জুদ ভিন্ন দু শ্রেণীর নামায। এক্ষেত্রে প্রসিদ্ধ গাইরে মুকাল্লিদ আলেম মাওলানা সানাউল্লাহ অমৃতসরীর একটি আলোচনা প্রণিধানযোগ্য। মাওলানা আব্দুল্লাহ চকরালভী যখন তারাবীহ তাহাজ্জুদ নামায এক হওয়ার কথা প্রচার করতে আরম্ভ করে তখন মাওলানা সানাউল্লাহ অমৃতসরী লিখেন‘… এই সুস্পষ্ট জবাব পেয়েও ওই মৌলভী সাহেব (চকরালভী) তা মানতে রাজি হননি; বরং জবাবের ‘জবাব’ তৈরির অনেক চেষ্টা করেছেন। তার সকল চেষ্টার সারকথা এই যে, প্রথম রাতের নামায এবং শেষ রাতের নামায বস্তুত একই নামায, দুই নামায নয়। তারাবীহ যা প্রথম রাতে পড়া হয় তার অপর নাম তাহাজ্জুদ। এ কথার জবাবে এটুকু বলাই যথেষ্ট যে, এ দাবির পক্ষে কোনো দলীল নেই। বরং বিপক্ষে দলীল রয়েছে। কেননা তাহাজ্জুদ শব্দের অর্থই হলো, ঘুম থেকে জেগে নামায আদায় করা। কামূসে রয়েছে, تهجد-استيقظ অর্থ : সে ঘুম থেকে জাগ্রত হলো। ‘রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমাযানে এবং রমাযানের বাইরে এগারো রাকাআতের বেশি পড়তেন না।’ এ থেকে প্রমাণিত হয় না যে, প্রথম রাত এবং শেষ রাতের নামায একই নামায; বরং এ হাদীস থেকে শুধু এটুকুই প্রমাণ হয় যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এগারো রাকাআত নামায পড়তেন।’- সানাউল্লাহ অমৃতসরী, আহলে হাদীস কা মাযহাব : পৃ. ৯২-৯৩

অন্য দিকে রমাযান মাসে ইশার সাথে তারাবীহ নামায পড়ার পর তাহাজ্জুদ পড়া যাবে কি না এ প্রশ্নের উত্তরে ফাতাওয়ায়ে সানাইয়াতে বলা হয়েছে,

প্রশ্ন : যে ব্যক্তি রমাযান মাসে ইশার সময় তারাবীহ নামায পড়ল সে শেষ রাতে তাহাজ্জুদ নামায পড়তে পারবে কি না?

উত্তর : পারবে। কেননা তাহাজ্জুদের সময়ই হচ্ছে সুবহে সাদিকের আগে। প্রথম রাতে তাহাজ্জুদ হয় না।

প্রশ্ন : রমাযান মাসে তারাবীহ ও তাহাজ্জুদ দুই নামায থাকে, না তারাবীহ নামাযই তাহাজ্জুদের স্থলবর্তী হয়ে যায়?

উত্তর : যদি তারাবীহ প্রথম রাতে আদায় করা হয় তবে তা শুধু তারাবীহ বলে গণ্য হয়। আর শেষ রাতে পড়লে তা তাহাজ্জুদের স্থলবর্তী হয়।-সানাউল্লাহ অমৃতসরী, ফাতাওয়া সানাইয়্যাহ : ১/৬৮২-৬৫৪

উপরোক্ত প্রশ্নোত্তর থেকে যে বিষয়গুলো উপলব্ধ হয় :

১. যে ব্যক্তি প্রথম রাতে তারাবীহ পড়ে সে শেষ রাতে তাহাজ্জুদও পড়তে পারে। যেহেতু আজকাল সকল মানুষ প্রথম রাতেই তারাবীহ পড়ে থাকে তাই তাদের শেষ রাতে তাহাজ্জুদ পড়া উচিত।

২. তাহাজ্জুদের সময় হলো রাতের শেষ ভাগে।

৩. প্রথম রাতের ইবাদতকে তাহাজ্জুদের স্থলবর্তী বলা যায় না।

৪. কেউ যদি কখনো শেষ রাতে তারাবীহ পড়ে তবে তা তাহজ্জুদেরও স্থলবর্তী হবে। এ কথার আরও স্পষ্ট ব্যাখ্যা মাওলানা সানউল্লাহ অমৃতসরীর দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘তারাবীহ তাহাজ্জুদের স্থলবর্তী হওয়ার কারণে এই দুইটি এক নামায হওয়া প্রমাণিত হয় না। যেমন জুমআর নামায জোহরের স্থলবর্তী হওয়ায় জুমআ জোহর এক নামায হওয়া প্রমাণিত হয় না।’ আহলে হাদীস কা মাযহাব : পৃ. ৯৩

মাওলানা যাকারিয়া আব্দুল্লাহ অনূদিত ড. শাইখ মুহাম্মদ ইলয়াস ফয়সাল রচিত নবীজীর নামায ৩৭০-৩৭৩ তর্কের খাতিরে যদি মেনেও নেয়া হয়, বিশ রাকাআত তারাবীহ উমর রাযি. কর্তৃক প্রবর্তিত ছিল এবং এটা তার ইজতিহাদপ্রসূত বিষয় ছিল তবুও এটাকে পরিত্যাক্ত বিদাত বলে ফেলে দেবার কোনো সুযোগ নেই। কারণ, ইমাম আউযায়ী রহ. বলেন, যখন নতুন কোনো বিষয়ের অবতারণা হয় এবং সেটাকে বিশেষজ্ঞ উলামায়ে কেরাম প্রত্যাখান না করে তাহলে সেটা সুন্নত হিসেবে পরিগণিত হয়ে যায়। যেমন উমর রাযি. তারাবীহ নামাযের ক্ষেত্রে লোকজনকে একত্রিত করলেন যাতে উবাই বিন কা’ব রাযি. তাদের নিয়ে জামাতবদ্ধভাবে নামায আদায় করেন। যখন উমর রাযি. পরদিন দেখলেন, লোকজন জামাতবদ্ধভাবে তারাবীহ নামায আদায় করছে তখন বললেন, বাহ কত সুন্দর এ ব্যাপারটি! উমর রাযি. কর্তৃক জামাতবদ্ধ এ রূপকে (আভিধানিক) বিদাত বলায় কোনো আপত্তি নেই। এটা তো মূলত সুন্নত। কারণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমার তিরোধানের পর তোমরা যারা বেঁচে থাকবে তারা নানা ধরনের মতভিন্নতা দেখতে পাবে। সেক্ষেত্রে তোমরা আমার এবং আমার সত্যনিষ্ঠ সুপথপ্রাপ্ত প্রতিনিধিদের সুন্নাহ ও আদর্শকে গ্রহণ করবে। একে তোমরা আকড়ে ধরবে এবং দন্তমাড়ির সাহায্যে কামড়ে ধরার ন্যায় প্রাণপণে আকড়ে ধরবে। এবং তোমরা (ধর্মীয় বিষয়ে) নবাবিস্কৃত বিষয়াদি থেকে খুব সতর্কতার সাথে নিবৃত্ত থাকবে। কারণ প্রতিটি নব আবিস্কৃত বিষয়ই হলো বিদাত। আর প্রতিটি বিদাত হলো পথভ্রষ্টতা। (সুনানে আবুদাউদ ৪৬০৭, সুনানে তিরমিযী ২৬৭৬, মুসনাদে আহমদ ১৬৬৯২, সুনানে ইবনে মাজাহ ৪২, সহীহ ইবনে হিব্বান ৫) সুতরাং তারাবীহকে একত্রিত করা সুন্নত যা উপরোল্লিখিত হাদীসের ভাষ্যে প্রমাণিত।- হাফেজ আবুল ওয়ালীদ আলবাজী, আত তা’দীল ওয়াত তাজরীহ ১/৪৪

পোস্টটি লাইক ও শেয়ার করুন।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

একটি মন্তব্য লিখুনঃ