দাড়ি রাখা ওয়াজিব কেন?

প্রশ্ন : দাড়ি রাখা কি ওয়াজিব? ওয়াজিব হলে কেন? অথচ আয়িশা রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, মানুষের সৃষ্টিগত উপাদান দশটি। ১। গোঁফ কাটা ২। দাড়ি দীর্ঘ করা ৩। মেসওয়াক করা ৪। নাকে পানি দেয়া ৫। নখ কাটা ৬। হস্তগিঁট ধৌত করা ৭। বগলের লোম উপড়ানো ৮। তলপেটের লোম মুণ্ডন করা ৯। পরিমিত পানি ব্যবহার করা ১০। কুলি বা কুলকুচা করা। (সহীহ মুসলিম, হাদিস-৬২৭)। এ হাদীসে উল্লিখিত সৃষ্টিগত দশটি বিষয়ের মধ্যে নয়টি বিষয়ই সুন্নাত হিসেবে পরিগণিত। সে হিসেবে দাড়ি রাখাও সুন্নাত হওয়ার কথা। একই বিষয়ভুক্ত নয়টি বিষয় সুন্নাত হবে আর একটি বিষয় ওয়াজিব হবে-এমন ব্যবধান হবে কেন? অন্য হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, দাড়িকে দীর্ঘ করো এবং গোঁফকে খাটো করো। (সহীহ বুখারী, হাদীস-৫৮৯২)। এ হাদীসে দাড়ি রাখা ও গোঁফ কাটাকে বিধানগত দিক থেকে একই পর্যায়ের ঘোষণা করা হয়েছে। কারণ উভয় বিষয় সম্বন্ধে হাদীসটিতে নির্দেশনাসূচক বক্তব্য এসেছে। সুতরাং বিধানগত দিক থেকে দুটির মাঝে তারতম্য হবে কেন? বিশুদ্ধ ইসলামী দলীলের আলোকে জানতে চাই।

উত্তর : দাড়ি পৌরুষত্বের প্রতিক। পৃথিবীর শুরু যুগে দাড়ি মুণ্ডনের প্রচলন ছিল না। দাড়ি মুণ্ডনের ইতিহাস খুব বেশি পুরনো নয়। প্রায় সব ধর্মেই শ্মশ্রুমণ্ডিত ব্যক্তিকে জ্ঞান ও প্রজ্ঞার অধিকারী ভাবা হতো। পৌরুষত্ব ও মর্যাদার অধিকারী ভাবা হতো। খ্রিস্টপূর্ব ৪০০ শতাব্দিতে সৈন্যদেরকে দাড়ি মুণ্ডনের মাধ্যমে শাস্তি দেয়া হতো। ভারত উপমহাদেশে ব্যভিচারী পুরুষকে দাড়ি মুণ্ডনের মাধ্যমে ব্যভিচারের শাস্তি প্রদান করা হতো। খ্রিস্টপূর্বে ১০০ শতাব্দিতে রাষ্ট্রপ্রধানগণ দার্শনিকদেরকে রাষ্ট্র বিরোধী দর্শন প্রচারের দায়ে দাড়ি মুণ্ডনের মাধ্যমে শাস্তি প্রদান করতেন।

ইতিহাস নিরীক্ষণে দেখা যায়, পৃথিবীর অধিকাংশ মনীষী মানুষগুলো শ্মশ্রুমণ্ডিত ছিলেন। একটি সূত্র মতে খ্রিস্টপূর্ব ৪ শতাব্দিতে আলেকজান্ডার এর সময় থেকে দাড়ি কাটার প্রথম প্রচলনের সূচনা হয়। আলেকজান্ডার তার সৈন্যদেরকে দাড়িকাটার নির্দেশ প্রদান করেন। যাতে শত্রুপক্ষ তাদের দাড়ি ধরে হেনস্তা করতে না পারে। তার রাজত্ব যেহেতু পৃথিবী ব্যাপী ছিল তাই দাড়ি কাটার এ অদ্ভুত রীতিটি ধীরে ধীরে পৃথিবী ব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। অন্য একটি সূত্র মতে অগ্নিপূজকগণ অগ্নিপূজার সুবিধার্থে দাড়ি মুণ্ডন প্রথার সূচনা করে।

ইসলামী শরীয়া মতে দাড়ি রাখা ওয়াজিব। কারণ এ ব্যাপারে হাদীসে নির্দেশনামূলক বক্তব্য এসেছে।

নির্দেশনামূলক কিছু হাদীস নিম্নরূপ

১. আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তোমরা মুশরিকদের সাথে বিরুদ্ধাচরণ করো এবং দাড়ি দীর্ঘ করো ও গোঁফ কর্তন করো। আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রাযি. যখন উমরা কিংবা হজ্জ করতেন তখন মুষ্টিবদ্ধ দাড়ি ধরতেন এবং মুষ্টি বহির্ভূত উদ্বৃত্ত দাড়ি অংশ কর্তন করতেন। (সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৫৮৯২)

২. আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তোমরা গোঁফ ছোট করো এবং দাড়ি বড় হতে দাও। (সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৫৮৯৩)

৩. পারস্য সম্রাটের দুজন দূত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট উপস্থিত হল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লক্ষ্য করলেন, তারা তাদের দাড়ি মুণ্ডন করেছে এবং গোঁফ বড় রেখেছে। এই কুৎসিত চেহারা দেখে তিনি অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে নিলেন এবং বললেন, তোমাদের জন্য দুর্ভোগ! কে তোমাদের এমন করতে বলেছে? তারা উত্তর দিল, আমাদের প্রভু (কিসরা) বলেছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তবে আমার প্রভু আমাকে আদেশ করেছেন যেন দাড়ি ছেড়ে দেই এবং গোঁফ ছেঁটে রাখি। (মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবাহ, হাদীস নং ৩৭৭৮১, তাবাকাতে ইবনে সাদ ১/৪৪৯, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া ২/৬৩৯)

প্রশ্নে উপস্থাপিত প্রথম হাদীস সম্বন্ধে কথা

নিশ্চয়ই দাড়ি রাখা মানুষের সৃষ্টিগত প্রাকৃতিক বিষয়। তবে বিধানগত দিক থেকে দাড়ি রাখার বিষয়টি সৃষ্টিগত অন্যান্য প্রাকৃতিক বিষয়গুলোর সমগোত্রীয় নয়। কারণ অন্যান্য হাদীসে দাড়ি রাখার ব্যাপারে সুস্পষ্টভাবে নির্দেশনামূলক বক্তব্য এসেছে। যেগুলো পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। সুতরাং দাড়ি রাখাকে মেসওয়াক করা, নাকে পানি দেয়া ও নখ কাটার মত সুন্নাত মনে করার অবকাশ নেই। উসূলে ফিকহের মতে ফে’লে আমর (নির্দেশনাসূচক ক্রিয়া) সাধারণত ওয়াজিব তথা আবশ্যকীয় বিধানের নির্দেশ করে।তবে প্রেক্ষাপট ও পূর্বাপর বিবেচনায় কখনো কখনো উত্তম ও নিছক বৈধতারও নির্দেশ করে।       

প্রশ্নে উপস্থাপিত দ্বিতীয় হাদীস সম্বন্ধে কথা

গোঁফ কাটা নিছক সুন্নাত নয়; বরং ওয়াজিবও বটে। ঠোঁট অতিক্রম করে গেলে সে গোঁফ রাখা হারাম ও নিষিদ্ধ। সুতরাং এক্ষেত্রে গোঁফ কাটা শুধু সুন্নাতই নয়; বরং ওয়াজিব। হাদীসে গোঁফ কাটার ব্যাপারে কঠিন ধমকি এসেছে। যায়েদ বিন আরকাম রাযি.থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি গোঁফ খাটো করে না সে আমার দলভুক্ত নয়। (সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং-২৭৬১)

অর্থাৎ যে ব্যক্তি ঠোঁট অতিক্রম করে গেলেও গোঁফ কাটে না সে আমার দলভুক্ত নয়। যে গোঁফ ঠোঁট অতিক্রম করেনি শুধু সে গোঁফ কর্তন করা সুন্নাত। সব ধরনের গোঁফ কর্তন করাই সুন্নাত নয়। সুতরাং এ দৃষ্টিকোণ থেকে দাড়ি রাখা ও গোঁফ কর্তন করা উভয়টিই ওয়াজিব পর্যায়ভুক্ত। এ জায়গাটিতে বিধানগত দিক থেকে উভয়টির মাঝে কোন ব্যবধান নেই।

সারকথা, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাড়ি রেখেছেন। তাই দাড়ি রাখা সুন্নাত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাড়ি রাখতে নির্দেশ দিয়েছেন। তাই দাড়ি রাখা ওয়াজিব। আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাড়ি মুণ্ডন করতে নিষেধ করেছেন। তাই দাড়ি মুণ্ডন করা হারাম।

সূত্রসমূহ

(১) عن ابن عمر عن النبي صلى الله عليه وسلم قال خالفوا المشركين وفروا اللحى وأحفوا الشوارب وكان ابن عمر إذا حج أو اعتمر قبض على لحيته فما فضل أخذه.

(সহীহুল বুখারী, হাদীস নং ৫৮৯২)

(২) عن ابن عمر رضي الله عنهما قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم انهكوا الشوارب وأعفوا اللحى. 

(সহীহুল বুখারী, হাদীস নং ৫৮৯৩)

(৩) عن أبي هريرة قال قال رسول الله صلى الله عليه و سلم جزوا الشوارب وأرخوا اللحى خالفوا المجوس.

(সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৬০)

(৪) عن ابن عمر عن النبي صلى الله عليه و سلم قال أحفوا الشوارب وأعفوا اللحى.

(সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৫৯)

(৫) عن زيد بن أرقم أن رسول الله صلى الله عليه وسلم قال: من لم يأخذ من شاربه فليس منا.

(সুনানে তিরমিযী; হাদীস নং ২৭৬১)

(৬) ودخلا على رسول الله – صلى الله عليه وسلم- وقد حلقا لحاهما وأعفيا شواربهما فكره النظر إليهما وقال: ويلكما من أمركما بهذا؟ قالا: أمرنا ربنا – يعنيان كسرى- فقال رسول الله- صلى الله عليه وسلم- : ولكن ربي أمرني باعفاء لحيتي وقص شاربي.

(মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবাহ; হাদীস ৩৭৭৮১, তাবাকাতে ইবনে সাদ ১/৪৪৯,আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া২/৬৩৯)

(৭) فحصل خمس روايات، اعفوا، واوفروا، وارخوا، وارجوا، ووفروا، ومعنا ها كلها تركها على حالها، هذا هوالظاهر من الحديث الذي يقتضيه الفاظه، وهوالذي قاله جماعة من أصحابنا وغيرهم من العلماء.

 (শরহে নববী লি মুসলিম ১/১২৯)

(৮) وقص اللحية من صنع الأعاجم وهو اليوم شعار كثير من المشركين كالأفرنج والهنود ومن لا خلاق له في الدين من الطائفة القلندرية.

(মিরকাতুল মফাতীহ; ২/৮৪ আশরাফিয়া)

(৯) وموجبه الوجوب لاالندب والإباحة والتوقف سواء كان بعدالحظر أوقبله لانتفاء الخيرة عن المامور بالأمر بالنص أي إنما قلنا موجبه الوجوب لانتفاء الاختيار عن المامورين المكلفين بالأمر بالنص.

(নুরুল আনওয়ার ২৭,২৮ পৃ.)

(১০) نيز جب امر وجوب کے لئے ہوتا ہے اور اعفواللحی ميں بالاتفاق وجوب پر محمول ہے، قصوا الشوارب ميں کس قرينہ کی وجہ سے وجوب نہيں ليا گيا کہ جملہ فقہاء قصوا الشوارب کے سنت ہونے کے قائل ہيں،  وجوب کا کو ئی   قائل نہيں․․․․․․․․․․اور حديث احفوا الشوارب سے شوارب کو کٹوانا ايساہی واجب ہے جيسے ڈاڑہی کو چھوڑنا ،مجھےکہيں ياد نہيں کہ فقہاء نے  اسکاوجوب کا انکار کياہے،البتہ تعامل صحابہ سے يابں بھی ايک حد ثابت ہے کہ اس سے زا‎ئد کا کٹوانا واجب ہے،اس سے کم رہتے ہوئے گنجائش ہے،اور وہ حد لبوں کا حصہ اسفل ہے.

(জাওয়াহিরুল ফিকহ ৭/১৭৬,১৭৭)

(১১) اس پانچويں حديث سے يہ بھی معلوم ہواکہ مونچھيں  اوراسی طرح ڈاڑھی منڈانا اور کترانا  حرام اور گنا‏ہ کبيرہ ہے، کيونکہ آں حضرت صلی اللہ عليہ وسلم کسی گناہ کبيرہ پرہی ايسی وعيد فرما سکتےہيں کہ ايسا  کرنيوالا  ہماری جماعت ميں سےنہيں ہے.

(ইখতিলাফে উম্মত আওয়ার সিরাতে মুস্তাকীম;১৮৩পৃ.)

(১২) مٹھی سے زيادہ ڈاڑھی کترانا جائز ہے.

(ইমদাদুল ফাতাওয়া;৪/২২০)

كتبه

ريحان محفوظ

المتدرب بدارالافتاء(السنة الثانية)

لمعهد البحوث الإسلامية،محمد بور، داكا،১২০৭

পোস্টটি লাইক ও শেয়ার করুন।

একটি মন্তব্য লিখুনঃ

Your email address will not be published. Required fields are marked *